আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স দুনিয়া বদলে ফেলতে পারে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআই বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির স্থাপন করবে, যা মানব ইতিহাসকে আরও তরান্বিত করবে। আমাদের দৈনন্দিক জীবনে এআই এমন একটি মাধ্যম হয়েছে উঠেছে, যাকে ছাড়া আমরা এখন একপাও হাঁটি না। ডায়েট চার্ট এআই করে দিচ্ছে। রাতে কতক্ষণ ঘুমানো ভাল, এআই বলে দিচ্ছে। দাঁত মাজার ব্রাশেও এআই। খাওয়ার তৈরির কুকারেও এআই। প্রেশার মাপার মেশিনেও এআই। সবজায়গায় এখন এআই-এর দাপট। সেই এআইকে পিএইচডির থিসিস লেখার কাজে কি ব্যবহার করা যেতে পারে? অনেকে বলেন, এআই পড়াশুনাটার বারোটা বাজিয়ে দিল। অনেকে দাবি করেন, এআই যদি প্রাথমিক স্তরে তথ্য খোঁজা, তথ্য যাচাই এবং লেখার কাজ করে দিতে পারে, তাহলে শিক্ষার জন্য সেটা অশনিসংকেত। আবার অন্যদিকে অনেকে আধুনিক সময়ের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে মনে করেন, এআইকে আটকালে সেটা হিতে বিপরীত হবে। কারণ আমরা এআইকে আটকাতে পারব না। এআইকে নিষিদ্ধ করা বোকামি হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ গবেষণার জগতে এমন এক প্রযুক্তি, যা একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও আশঙ্কা দুইয়েরই নাম। পিএইচডি গবেষণার মতো দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ায় এআই গবেষকদের কাজকে যেমন সহজ করেছে, তেমনই মৌলিকতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও তুলেছে। ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই বিতর্ক এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখনও পর্যন্ত এআই ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনও আইন না থাকলেও, গবেষণার সততা রক্ষার ক্ষেত্রে University Grants Commission (UGC)–এর 'Academic Integrity and Prevention of Plagiarism Regulations, 2018' ই প্রধান নির্দেশিকা। এই নিয়ম অনুযায়ী অন্যের লেখা বা ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য। ফলে এআই-এর সাহায্যে তৈরি লেখা যদি স্বীকৃতি বা ঘোষণা ছাড়া জমা দেওয়া হয়, তবে সেটিও একইভাবে নিষিদ্ধ হিসেবে ধরা হতে পারে। এই কারণেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এআইকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে তাকে কেবল সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলছে। 'All India Council for Technical Education (AICTE)'–এর মতো সংস্থা ব্যবহারের স্বচ্ছ ঘোষণা বাধ্যতামূলক করার দিকে জোর দিচ্ছে। এআই-এর ইতিবাচক দিকগুলি অস্বীকার করার উপায় নেই। গবেষণার প্রাথমিক ধাপে সমীক্ষা তৈরি, তথ্য সংক্ষেপ করা, রেফারেন্স সাজানো, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বা ভাষা সম্পাদনার মতো কাজে এটি সময় ও শ্রম অনেকটাই বাঁচায়। বিশেষত ভারতীয় গবেষকদের জন্য, যাঁদের অধিকাংশই ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন, এআই ভাষাগত সহায়তা দিয়ে লেখাকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে পারে। বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ, কোডিং বা গ্রাফ তৈরির মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজেও এআই কার্যকর । ফলে গবেষক যান্ত্রিক কাজের বদলে বেশি সময় দিতে পারেন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও চিন্তায়। এই দিক থেকে এআই গবেষণার দক্ষতা বাড়ায় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, রাজ্যেশ্বর সিংহ বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, ' আমি বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করেছি। আমি কিছু কিছু ইংরেজি চিঠিপত্তর লেখার কাজে এআইকে ব্যবহার করে থাকি। এইটুকুই, কিন্তু এর বাইরে আমার লেখার মৌলিকতা যেন নষ্ট না হয়, সেই বিষয়েও লক্ষ্য রাখি। তেমনি পিএইচডি থিসিসে ডেটা সংক্রান্ত খোঁজার কাজে এআইয়ের সাহায্য নেওয়া যেতেই পারে কিন্তু তা বলে গোটা কাজটা এআই দিয়ে লেখানোর কোনও মানে নেই। তাহলে তো গোটা কাজের কোনও মূল্য থাকব।'এআই মূলত নেটে থাকা তথ্যের পুনর্গঠন করে, তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা বৌদ্ধিক অবস্থান নেই। ফলে এআই নির্ভর লেখা প্রায়ই সাধারণ, গড়পড়তা ও ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। আরও বড় সমস্যা হল প্ল্যাজিয়ারিজমের ঝুঁকি। এআই অজান্তেই পূর্বপ্রকাশিত লেখার সঙ্গে মিল রেখে কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা গবেষক যাচাই না করলে সরাসরি একাডেমিক অপরাধে পরিণত হতে পারে। অতিরিক্ত নির্ভরতা গবেষকের নিজস্ব লেখার দক্ষতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তখন গবেষণা হয়ে দাঁড়ায় মেশিন-নির্ভর সংকলন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এআই তৈরি অংশ যদি গোপন রাখা হয়, তবে গবেষণার বৌদ্ধিক মালিকানা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন ওঠে, থিসিস তখন আর সম্পূর্ণভাবে গবেষকের ব্যক্তিগত কাজ থাকে না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রফেসর চিন্ময় গুহ এই বিষয়ে জানালেন, ' এআই এমন একটা দুনিয়া সৃষ্টি করবে, যেখানে নিমেষে সবকিছু হয়ে যাবে। এআই কখনও ক্লান্ত হয় না মানুষের মতো ফলে সে এমন কিছু তৈরি করে দেবে যা গবেষণার মৌলিকতাকেই নষ্ট করে দেবে। আমার এই বিষয়ে একেবারেই মত নেই। গবেষণার কাজে এআই না ব্যবহার হলেই ভাল।' বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হিমাদ্রী লাহেড়ির বক্তব্য, ' আমি একেবারেই এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে। এআই এমন কিছু করতে ফেলতে পারে যা ভবিষ্যতের জন্য ভাল নয়। অন্তত গবেষণার মতো মৌলিক কাজে এআইয়ের ব্যবহার না হলেই ভাল।'


