বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
প্রবন্ধ

গবেষণার টেবিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আশীর্বাদ না অশনিসংকেত

সবজায়গায় এখন এআই-এর দাপট। সেই এআইকে পিএইচডির থিসিস লেখার কাজে কি ব্যবহার করা যেতে পারে? অনেকে বলেন, এআই পড়াশুনাটার বারোটা বাজিয়ে দিল।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

২২ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

গবেষণার টেবিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আশীর্বাদ না অশনিসংকেত

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স দুনিয়া বদলে ফেলতে পারে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআই বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজির স্থাপন করবে, যা মানব ইতিহাসকে আরও তরান্বিত করবে। আমাদের দৈনন্দিক জীবনে এআই এমন একটি মাধ্যম হয়েছে উঠেছে, যাকে ছাড়া আমরা এখন একপাও হাঁটি না। ডায়েট চার্ট এআই করে দিচ্ছে। রাতে কতক্ষণ ঘুমানো ভাল, এআই বলে দিচ্ছে। দাঁত মাজার ব্রাশেও এআই। খাওয়ার তৈরির কুকারেও এআই। প্রেশার মাপার মেশিনেও এআই। সবজায়গায় এখন এআই-এর দাপট। সেই এআইকে পিএইচডির থিসিস লেখার কাজে কি ব্যবহার করা যেতে পারে? অনেকে বলেন, এআই পড়াশুনাটার বারোটা বাজিয়ে দিল। অনেকে দাবি করেন, এআই যদি প্রাথমিক স্তরে তথ্য খোঁজা, তথ্য যাচাই এবং লেখার কাজ করে দিতে পারে, তাহলে শিক্ষার জন্য সেটা অশনিসংকেত। আবার অন্যদিকে অনেকে আধুনিক সময়ের মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে মনে করেন, এআইকে আটকালে সেটা হিতে বিপরীত হবে। কারণ আমরা এআইকে আটকাতে পারব না। এআইকে নিষিদ্ধ করা বোকামি হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ গবেষণার জগতে এমন এক প্রযুক্তি, যা একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও আশঙ্কা দুইয়েরই নাম। পিএইচডি গবেষণার মতো দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়ায় এআই গবেষকদের কাজকে যেমন সহজ করেছে, তেমনই মৌলিকতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও তুলেছে। ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই বিতর্ক এখন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখনও পর্যন্ত এআই ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনও আইন না থাকলেও, গবেষণার সততা রক্ষার ক্ষেত্রে University Grants Commission (UGC)–এর 'Academic Integrity and Prevention of Plagiarism Regulations, 2018' ই প্রধান নির্দেশিকা। এই নিয়ম অনুযায়ী অন্যের লেখা বা ধারণা নিজের নামে ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য। ফলে এআই-এর সাহায্যে তৈরি লেখা যদি স্বীকৃতি বা ঘোষণা ছাড়া জমা দেওয়া হয়, তবে সেটিও একইভাবে নিষিদ্ধ হিসেবে ধরা হতে পারে। এই কারণেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এআইকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে তাকে কেবল সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলছে। 'All India Council for Technical Education (AICTE)'–এর মতো সংস্থা ব্যবহারের স্বচ্ছ ঘোষণা বাধ্যতামূলক করার দিকে জোর দিচ্ছে। এআই-এর ইতিবাচক দিকগুলি অস্বীকার করার উপায় নেই। গবেষণার প্রাথমিক ধাপে সমীক্ষা তৈরি, তথ্য সংক্ষেপ করা, রেফারেন্স সাজানো, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বা ভাষা সম্পাদনার মতো কাজে এটি সময় ও শ্রম অনেকটাই বাঁচায়। বিশেষত ভারতীয় গবেষকদের জন্য, যাঁদের অধিকাংশই ইংরেজিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন, এআই ভাষাগত সহায়তা দিয়ে লেখাকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিতে পারে। বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ, কোডিং বা গ্রাফ তৈরির মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজেও এআই কার্যকর । ফলে গবেষক যান্ত্রিক কাজের বদলে বেশি সময় দিতে পারেন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও চিন্তায়। এই দিক থেকে এআই গবেষণার দক্ষতা বাড়ায় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, রাজ্যেশ্বর সিংহ বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, ' আমি বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করেছি। আমি কিছু কিছু ইংরেজি চিঠিপত্তর লেখার কাজে এআইকে ব্যবহার করে থাকি। এইটুকুই, কিন্তু এর বাইরে আমার লেখার মৌলিকতা যেন নষ্ট না হয়, সেই বিষয়েও লক্ষ্য রাখি। তেমনি পিএইচডি থিসিসে ডেটা সংক্রান্ত খোঁজার কাজে এআইয়ের সাহায্য নেওয়া যেতেই পারে কিন্তু তা বলে গোটা কাজটা এআই দিয়ে লেখানোর কোনও মানে নেই। তাহলে তো গোটা কাজের কোনও মূল্য থাকব।'এআই মূলত নেটে থাকা তথ্যের পুনর্গঠন করে, তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা বৌদ্ধিক অবস্থান নেই। ফলে এআই নির্ভর লেখা প্রায়ই সাধারণ, গড়পড়তা ও ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। আরও বড় সমস্যা হল প্ল্যাজিয়ারিজমের ঝুঁকি। এআই অজান্তেই পূর্বপ্রকাশিত লেখার সঙ্গে মিল রেখে কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা গবেষক যাচাই না করলে সরাসরি একাডেমিক অপরাধে পরিণত হতে পারে। অতিরিক্ত নির্ভরতা গবেষকের নিজস্ব লেখার দক্ষতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তখন গবেষণা হয়ে দাঁড়ায় মেশিন-নির্ভর সংকলন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এআই তৈরি অংশ যদি গোপন রাখা হয়, তবে গবেষণার বৌদ্ধিক মালিকানা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন ওঠে, থিসিস তখন আর সম্পূর্ণভাবে গবেষকের ব্যক্তিগত কাজ থাকে না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রফেসর চিন্ময় গুহ এই বিষয়ে জানালেন, ' এআই এমন একটা দুনিয়া সৃষ্টি করবে, যেখানে নিমেষে সবকিছু হয়ে যাবে। এআই কখনও ক্লান্ত হয় না মানুষের মতো ফলে সে এমন কিছু তৈরি করে দেবে যা গবেষণার মৌলিকতাকেই নষ্ট করে দেবে। আমার এই বিষয়ে একেবারেই মত নেই। গবেষণার কাজে এআই না ব্যবহার হলেই ভাল।' বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হিমাদ্রী লাহেড়ির বক্তব্য, ' আমি একেবারেই এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে। এআই এমন কিছু করতে ফেলতে পারে যা ভবিষ্যতের জন্য ভাল নয়। অন্তত গবেষণার মতো মৌলিক কাজে এআইয়ের ব্যবহার না হলেই ভাল।'

রচনার অলঙ্করণ ছবি
রচনার অলঙ্করণ ছবি

আবার আমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মোহনা চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ' আজকের জ্ঞানচর্চায় এআই কোনও বিলাসিতা নয়, একটি বাস্তব টুল যেমন একদিন ছিল ক্যালকুলেটর, সার্চ ইঞ্জিন বা ডিজিটাল আর্কাইভ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া নয়, বরং নৈতিক কাঠামো তৈরি করা।'এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট হয় যে এআই নিজে ভালো বা খারাপ নয়, তার মূল্য নির্ভর করে ব্যবহারের ধরনে। সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এটি গবেষণাকে দ্রুত ও দক্ষ করতে পারে, কিন্তু শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করলে তা গবেষণার সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ণ করে। তাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হল স্বচ্ছতা ও সংযম এআই ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু তার ভূমিকা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে, আর গবেষণার মৌলিক বিশ্লেষণ ও চিন্তার দায়িত্ব থাকতে হবে মানুষের হাতেই। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষের মস্তিষ্কই থেকে যায়।এআই কেবল সেই যাত্রার সহযাত্রী, পথপ্রদর্শক নয়। নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীদীপ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ' গবেষণার মৌলিকতা নষ্ট করতে পারে এআই। আমার মনে হয় কোনওভাবেই এআইকে দিয়ে থিসিসের কাজ করানো উচিত না। তবে সীমিত ব্যবহারে আপত্তি নেই, যেমন, ভাষা ব্যবহারে রিফাইনমেন্ট আনা বা প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি। '

ভারতে যেমন পিএইচডি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে ধীরে ধীরে নীতিগত আলোচনা শুরু হয়েছে, তেমনই বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে স্পষ্ট নিয়মের মধ্যে আনতে উদ্যোগী হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বহু প্রতিষ্ঠানে এআইকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং তাকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে,কিন্তু একই সঙ্গে কঠোরভাবে বলা হয়েছে, গবেষণার বৌদ্ধিক মালিকানা সম্পূর্ণভাবে মানুষেরই হতে হবে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় University College London (UCL)–এর নীতি, সেখানে ভাষা সম্পাদনা, ব্যাকরণ সংশোধন বা কাঠামোগত সাহায্যের জন্য এআই ব্যবহার করা চলতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ অনুচ্ছেদ বা বিশ্লেষণ এই দিয়ে তৈরি করলে তা ‘academic misconduct’হিসেবে গণ্য হয়। একইভাবে University of Cambridgeস্পষ্ট জানিয়েছে, এআই কোনওভাবেই গবেষণার সহ-লেখক বা বৌদ্ধিক অবদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না অর্থাৎ থিসিসে যা থাকবে, তার দায় ও কৃতিত্ব একমাত্র গবেষকের। আমেরিকার ক্ষেত্রেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় যেমন Harvard University বা Stanford University শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বলেছে যে অঘোষিত এআই-নির্ভর লেখা প্ল্যাজিয়ারিজমের অংশ।

আন্তর্জাতিক সার্ভেগুলোতে দেখা গিয়েছে, ২০২৪-এ প্রায় ৮৬% শিক্ষার্থী তাদের পড়াশোনায় কোনও না কোনওভাবে এআই ব্যবহার করেন, যেখানে ভাষা সম্পাদনা, সারাংশ তৈরি বা তথ্য সংগঠনের মতো কাজগুলো সবচেয়ে বেশি। ভারতের কিছু ইনস্টিটিউট-ভিত্তিক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে প্রায় ৫০% শিক্ষার্থী সপ্তাহে একাধিকবার এআই টুল ব্যবহার করেন এবং প্রায় ২৩% প্রতিদিনই ব্যবহার করেন। ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার ৬৬% থেকে ৯২%-এ বৃদ্ধির মতো প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যা উচ্চশিক্ষা-জুড়ে এআই-এর গ্রহণ বেশি হওয়ার প্রমাণ দেয়। এই ব্যবহারের মধ্যে অনেকেই এআইকে ভাষাগত সহায়তা, রেফারেন্স খোঁজা বা ডেটা হেল্পের মতো সহায়ক কাজে ব্যবহার করছেন, কিন্তু তদন্ত ও মৌলিক ব্যাখ্যার মতো মূল গবেষণার অংশগুলোতে মানসম্মত মানবিক অবদানের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন। এআই গবেষণাকে দ্রুত করতে পারে, কিন্তু শর্টকাট বানাতে পারে না। স্বচ্ছতা ও সততা ছাড়া প্রযুক্তি বিপজ্জনক। তাই থিসিসে এআইয়ের ব্যবহার গোপন রাখার বদলে স্পষ্ট ঘোষণা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মৌলিক চিন্তার চর্চাই হতে পারে একমাত্র পথ। কারণ গবেষণার মূল্য ডেটায় নয়, দায়বদ্ধতায়।

ট্যাগসূচী:#ArtificialIntellegence#Research#Phd
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev