সাদা ধবধবে কুকুর ছানাটার নাম লুবু। এই কুকুরছানার মালকিন তাকে ছেলের মতো করে আগলে রাখে। আদর, যত্ন, থেকে শিক্ষা দেওয়া কোনও কিছুরই খামতি রাখে না। আবার উড়োজাহাজে চড়ে কোথাও গেলে সে একজন যাত্রীর মর্যাদা পায়। তার জন্যও টিকিট কাটা হয়। শুধু তাই নয়, লুবুকে উড়োজাহাজে নিয়ে যেতে গেলে আগে থেকে বিমানসংস্থার অনেক ফিরিস্তি পূরণ করতে হয়। এর পাশাপাশি তার খাওয়াদাওয়ার জন্য বিশেষ পুষ্টিগুণের দিকে নজর দেওয়া হয়। অসুখে লুবুর জন্য ঠিক করা থাকে একজন ফিজিশিয়ন। যে মোটামুটি লুবুকে বোঝে। তার কী কী ধরণের অসুখ হতে পারে, সেই খতিয়ান তিনি আগে থেকে হিসেব কষে রেখেছেন। বছরে দু'বার রক্তপরীক্ষা থেকে বিভিন্ন ভ্যাক্সিনের তারিখ সবই থাকে সেই ফিজিশিয়নের নখদর্পণে। একদম মানুষের মতো। আজকাল নবপ্রজন্ম সন্তান নেওয়ার পরিবর্তে কুকুর বা বিড়ালকেই সন্তানরূপে পালন করতে চাইছেন। তাকে তাদের ছেলেমেয়ের মতো বড় করতে চাইছেন। সবই যখন প্রায় মানুষের মতো হয়ে উঠছে, তাহলে সেই তালিকা থেকে জীবনবিমা কেন বাদ যাবে? সম্প্রতি ভারতে কুকুর এবং বিড়ালদের জন্য জীবনবিমা করা হিড়িক লেগেছে। সমীক্ষা বলছে, পোষ্য প্রাণীর চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ এত বেড়ে গিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই জীবনবিমা করার ফলে একবারে অত টাকার ধাক্কা কিছুটা সামলানো গিয়েছে।
কুকুর-বিড়ালের জীবনবিমা চিকিৎসা, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে মালিককে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার একটি আধুনিক ব্যবস্থা। ইউরোপ ও আমেরিকায় বহু বছর ধরেই এই প্রথা চালু, তবে ভারতে এটি তুলনামূলকভাবে নতুন ধারণা। বর্তমানে বেশকিছু বেসরকারি বিমা সংস্থা কয়েকটি পোষ্যপ্রাণীর জন্য জীবনবিমা দিচ্ছে। সাধারণত ২ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী কুকুর বা বিড়ালের জন্য বিমা করা যাবে এবং বার্ষিক প্রিমিয়াম প্রায় ৩০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে হবে। তবে বিমার পরিমাণ প্রাণীর জাত, বয়স এবং আপনি কী ধরণের কভারেজ নেবেন তার উপর নির্ভর করে। বিমার অর্থ সাধারণত ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ল্যাব্রাডর, হাস্কি, পার্সিয়ান বিড়ালের ক্ষেত্রে বিমার পরিমাণ কয়েক লক্ষ টাকাও হতে পারে।বিমার প্রিমিয়াম বা বার্ষিক খরচ সাধারণত কভারেজের ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে হয়। অর্থাৎ, যদি বিমার পরিমাণ ৫০,০০০ টাকা হয়, তাহলে প্রতি বছর প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তবে প্রজাতি, বয়স, এবং পূর্ববর্তী রোগের ইতিহাস অনুযায়ী এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এই বিমার আওতায় নানা ধরনের কভারেজ থাকে যেমন শুধু দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা আঘাতের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আবার বিমাতে চিকিৎসা খরচ, অপারেশন, হাসপাতালে ভর্তি, এমনকি ভ্যাকসিনেশন বা পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারের খরচও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আপনার প্রিয় কুকুর বা বিড়াল হারিয়ে গেলেও এই বিমা আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেবে। দুটি কুকুর বা বিড়ালের মধ্যে মারপিট করে আহত হলেও এই বিমার অর্থ পাওয়া যাবে। আপনার পোষ্য চুরি হয়ে গেলেও বিমার অর্থ পাবেন। কোনও গাড়ি দুর্ঘটনায় বা বিমান দুর্ঘটনায় পোষ্য আহত বা মৃত্যু হলেও বিমা আপনাকে ক্ষতিপূরণ দেবে। একদম মানুষের মতো। তবে পোষ্য মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিমাকারী সংস্থাগুলি সম্পূর্ণ বিমার অর্থ প্রদান করে, তবে তার জন্য পশুচিকিৎসকের সার্টিফিকেট ও মৃত্যুর কারণ জমা দিতে হবে। সমীক্ষা বলছে দুর্ঘটনা-জনিত মৃত্যুর দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, কিন্তু বয়সজনিত বা অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘ হয়। ভারতে পোষ্য বিমা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারণের পথে। ২০২৪ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৬৯৫.৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ কোটি টাকা এবং বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩৩ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৩,৪৪৭.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এই সময়কালে বার্ষিক বৃদ্ধির হার ধরা হচ্ছে প্রায় ১৯ শতাংশের কাছাকাছি। বর্তমানে দেশের শহুরে অঞ্চলে, বিশেষত মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ে বিমার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সমীক্ষা বলছে, এখন একজন ভারতীয় পোষ্য মালিক গড়ে মাসে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন পোষ্যের যত্নে যার মধ্যে খাবার, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ই অনেককে পোষ্য বিমাকে আর্থিক সুরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভাবতে বাধ্য করছে।


