অয়ন লিখেছিল, ' তুমি কোন দৈত্যের রাজকন্যা/ কোন দেবতার গান/ অচেনা উপতক্যার/ অচেনা এক গান।' মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোনো তিনটে ছেলে তখন সদ্য গানের দল বেঁধেছিল। নাম দিয়েছিল 'ওয়েসিস'। কুটির শিল্পের মতো বাংলার ঘরে ঘরে তখন ব্যান্ড কালচার শুরু হয়েছিল। ধারণা হয়েছিল, বাংলা ব্যান্ড করা মানে, উল্টো পথে হাঁটা। প্রথাগত সবকিছুকে চ্যালেঞ্জ করা।কালো জামা, কালো পাঞ্জাবি এবং পিঠে একটা গিটার থাকলেই মনে হত এই বুঝি পৃথিবী পাল্টে ফেলতে পারব। এই যে ভাবধারা, সেই ভাবধারার প্রভাব পড়েছিল আমাদের জীবনে। আমাদের লেখায়। আমাদের গানে। উদাসী দুপুরে আমরা শুনেছিলাম ‘হলুদ পাখির’কথা। বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম ‘নীল রঙ’কেন প্রিয় ছিল। ‘গল্পের মতো ইক্সুল বাড়ি’ খুঁজে গিয়েছি কৈশোর শেষের বিকেলবেলায়। ‘বারান্দায় রোদ্দুর’ এসেছিল, গা ভাসিয়েছিলাম ‘শহরের উষ্ণতম দিনে’। এইরকমই জীবন ছিল আমাদের।
মহীনের ঘোড়াগুলি সহজ অথচ তীক্ষ্ণ ভাষায় যে গান লিখতে শুরু করেছিল সেগুলোই পরবর্তীকালে শ্রেষ্ঠ হয়ে গেল। ' পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে/স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে/ ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী/ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে/যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে/ঘুচে গেছে বেশ কাল সীমানার গন্ডি...।' সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতে চেয়েছিল মহীন। সেই সময় সদ্য ঘরে ঘরে টেলিভিশন, দেশভাগের প্রেক্ষাপটও হয়ে এই ছয় লাইনের গোচরে। কী অদ্ভুত। কী আশ্চর্য তাঁদের উপস্থাপনা। সেই সময়কালে মহীন গান শোনার ধরণ পাল্টে ফেলার চেষ্টা করেছিল। সুরে বদল এনেছিল, লেখার ধরণ পাল্টে ফেলেছিল। মহীনের গানের প্রতিটা লাইনে ছড়িয়ে আছে সমাজের কথা, জীবনের কথা, কলকাতার অলিগলির প্রসঙ্গ। অজস্র মানুষ মহীনের গানের সঙ্গে নিজের জীবনের ঘটে যাওয়ার ঘটনার মিল খুঁজে পেয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই গান হয়ত তাঁর জন্যই লেখা। তারপরেই অনেকেই মহীনের গানের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছিল। ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁদের গান শুনতে থাকল। এই যে যুক্ত হওয়া, নিজেকে গানের একটি অংশ মনে করা, এখানেই তো গানের সার্থকতা। বাংলা ব্যান্ড ‘গড়ের মাঠ’ লিখেছিল 'বাড়লে বয়েস সবাই মানুষ হয় কি/শুনলে কথা মানুষ চেনা যায় কি?' লাইনের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে আছে জীবনকে চেনার বিভিন্ন উপায়। প্রসঙ্গত এই ব্যান্ডের লেখা গান, ‘শহরের উষ্ণতম দিনে/ পিচগলা রোদ্দুরে বৃষ্টির বিশ্বাস…’ যা আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। কেন? কারণ এই গানটা জীবনের কথা বলে। যুগের পর যুগ ঘুরলেও এই গানটা জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকবে। ১৯৮৫ সালে প্রকাশ পায় বাংলা ব্যান্ড ‘নগর ফিলোমেল’এর প্রথম অ্যালবাম ‘ আমরা গান গায় সে সুরে’। দ্বিতীয় অ্যালবাম প্রকাশ পায় ১৯৯৬ সালে, ‘ স্বপ্ন নেই।‘ এই অ্যালবামের দুই শিল্পী ছিলেন ইন্দ্রজিৎ সেন এবং ইন্দ্রনীল সেন। প্রসঙ্গত এই নগর ফিলোমেলে বিখ্যাত গান ‘ বিজনের চায়ের দোকান’, ‘খুঁজে যায়’ ইত্যাদি। যে গানগুলো নাগরিক জীবনের গল্পগুলোকে ছবির মতো তুলে ধরেছিল তাদের গানে। গানের কথা, সুর, উপস্থাপনা এতই নিখুঁত ছিল যা মুহূর্তের মধ্যে বারুদের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। এক অদ্ভুত উদাসীনতা তৈরি করেছিল নগর ফিলোমেল। এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইন্দ্রজিৎ সেন, ইন্দ্রনীল সেন, রিমলি সেনগুপ্ত, ইন্দ্রাণী সেন, প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়। নগর ফিলোমেলের গান আজও শান্ত বিকেলের মতো শিহরণ জাগায় মনে।
নব্বইয়ের দশকের আগে বাংলা গানের যে বদল এসেছিল, সেই বদলে অগ্রণী ছিলেন তিন ম্যাজিশিয়ান। নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত এবং কবীর সুমন। তাঁদের গানের কথা এবং উপস্থাপনা ছিল সম্পূর্ণ প্রথাবিরোধী।এই তিন শিল্পী বাংলার সঙ্গীতজগতে যে চিহ্ন রেখে গিয়েছেন তা অপরিসীম। ১৯৯১ সালে কুট্টি মজুমদার তার কিছু বন্ধুদের নিয়ে শুরু করেছিল বাংলা ব্যান্ড 'অভিলাষা'। বাংলা রক ব্যান্ড হিসেবে সেই সময় প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল 'অভিলাষা'। ' একটা তারা/ নিঃসঙ্গ সে/ অথচ একটা তারা কত উজ্জ্বল।' গানের লাইনের প্রথম অংশ পড়লে মনে হয় শূন্যতার গভীরে হারিয়ে যাওয়ার গান। পিছনে রয়েছে প্রেমের আখ্যান। তারপরে শুরু হয় বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ। চন্দ্রবিন্দু একেবারে নিজেদের ঘরানা তৈরি করেছিল, যা আজও বহমান। স্যাটেয়ার হয়ে উঠল তাঁদের প্রধান অস্ত্র। তাঁরা লিখছিল, ' আমি আজ ভেঙে দেবো জোড়া ফুলদানি/ বড়দের টিভি খুলে খিলতি জবানী।' এমন একটা লাইন যা আট থেকে আশিকে ছুঁয়ে গেল। বাঙালি মজে গেল চন্দ্রবিন্দুর গানে। তাঁরা জীবনের না পাওয়াগুলো নিয়ে ব্যঙ্গ করল। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গ করল। তবুও হাসিমুখে, সহজ মনে মানুষ সেই গান শুনল। ভালবাসল সবটুকু দিয়ে।
ক্যাকটাস যে ঘরানার গানবাজনা শুরু করেছিল, সেখানে রক এবং স্যাটায়ার মিশে গিয়েছিল। তাঁরা বারবার বিভিন্ন রকমের গানের কথা তুলে ধরছিল এবং ধরছে। হলুদ পাখি কেন বাংলা গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে গিয়েছিল এবং আগামীদিনেও শ্রেষ্ঠ থাকবে তার পিছনে কিছুটা হলেও দায়ী গানের কথা। ' বুড়ো মাঝির নৌকায় বসে সারাটা দুপুর/যুবরাজের ঘোড়া আর রাজকন্যার নুপুর/ চলে গেল স্রোতে ভেসে/ জানি না কোন দূর দেশে'। সহজ কথা সহজ ভাবেই ছুঁয়ে গেল আপামর বাঙালিকে। যুবমসাজ মজে গিয়েছিল ' কথা ছিলো সব সবুজ শুকিয়ে যাওয়ার আগে/ আগেই দেবো অমৃতের সন্ধান/ শুধু তুমি এলে না' আবার ' তুই আমারে পাগল করলি রে' বাঙালিকে সত্যিই পাগল করে দিয়েছিল। ক্যাকটাসের লেখায় বারবার প্রথা ভাঙার চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছে। ক্যাকটাসের প্রাণপুরুষ সিধুর মতে, ' ক্যাকটাসের গান, গান লেখার জন্যই লেখা। কিছু ভেবে লেখা হয়নি। হয়ত সমসাময়িক প্রভাব আছে তবে যেটা মনে হয়েছে সেটাই লেখা হয়েছে। অনেক সময় শ্রোতারা কী ভাবছে সেটা ভেবেও লেখা হয়েছে। সেই সময় কলেজ ফেস্টের জন্য কিছু গান লেখা হয়েছে যেগুলো এখন আর চলবে । শহর ব্যান্ডের অনিন্দ্য বোসের কথায়, ' গান তো ইমোশন থেকে আসে। বেশিভাগ গানের মধ্যে প্রেম বিরহের কথা আছে। সময় বদলালেও সেই আবেগটা তো একই আছে। মাধ্যম বদলেছে, আবেগ নয়।' সত্যি তাই, এখনও ' যখন নীরবে দূরে দাঁড়াও এসে, যেখানে পথ বেঁকেছে...' আদতে একটা প্রেমের গান। যেখানে ভনিতা নেই। ‘পরথপাথর’ ব্যান্ডের 'এক ঝাঁক ইচ্ছে ডানা' এখনও বেঁচে আছে গানের কথার জন্য। যে কথা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়নি। ' ভালবাসা মানে ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি' আদতে প্রতিটা প্রেমিক প্রেমিকা, সিগারেট প্রেমীদের আপন গান।
নব্বইয়ের শেষে ফসিল্স বাংলায় রক কালচারের জোয়ার এনেছিল।ইংরেজি গানের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গান লেখা হয়েছিল। তাঁদের গানগুলো আজও বাংলা রক সমাজের আলোচনার বিষয়। ‘এই একলা ঘর আমার দেশ/ আমার একলা থাকার অভ্যেস।' খুঁটিয়ে দেখতে গেলে দেখা যাবে গানের কথায় এমন কিছু জটিল তত্ত্ব নেই অথচ আছে নিখাত মৌলিকতা, যা বাংলার যুব সমাজকে ছুঁয়ে গেল। ' নীল রঙ ছিল ভীষণ প্রিয়, তাই আজ নিলিয়ে দিও...' নীল রঙ কি এখানে যৌনতার সমার্থক? নাকি কলেজ জীবনের না হওয়া প্রেমের কথা? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেমন পরিণত হয়, ফসিল্স তাঁদের গানের কথায় বিবর্তন এনেছে।সমাজের অবক্ষয়গুলো তুলে ধরেছে গানের কথায়। হয়ত পরোক্ষভাবে, তবুও তাঁদের গানের কথায় বিবর্তন স্পষ্ট। এই সময়ের প্রায় কাছাকাছি 'ভূমি' বাংলার লোকগানকে অন্য রূপ দিয়েছিল। ‘বারান্দায় রোদ্দুর' থেকে ' লালে লালেশ্বরী' প্রতিটি গানই ছিল বাঙালির আনন্দ এবং আত্মার দোসর। বাংলার হারিয়ে যাওয়া গানকে পুনরুদ্ধার করেছিল তাঁরা। ঠিক একই সময়ে 'ক্রশওইয়ান্ডস' বাংলা রক ফিউশনের ধারা আনার চেষ্টা করেছিল। ' ও রে ও, জীবন সংগ্রামের ফাঁকে আসমানি পাহাড় ডাকে' বলে জীবনকে আরও একটু উস্কে দিয়েছিল।


