রোগা, ফর্সা, দাড়িওয়ালা ছেলেটা নিজের গল্প বলতে শুরু করল। ব্যথিত লাল বটফল এবং শালিখের মতো ছটফট করতে করতে বেরিয়ে এলো ধূসর স্মৃতি। গম্ভীর গলায় গল্পটা শুরু করলেও একদম শেষের দিকে তাঁর গলা শুকিয়ে গেল। চোখের কোণায় জমা হল জল। তাঁর কথায় ফিরে ফিরে দেবাঞ্জলি নামটা ভেসে উঠল। ভেসে উঠল ফিনল্যান্ড এবং নৈহাটির দুটো আকাশ। দৌড়ে এলো লুবু নামক ধবধবে সাদা পোষ্য। ছবির মতো ভেসে উঠল গল্পটা। সময় নিজের তালে এগিয়ে গেলেও, কথক ছেলেটা এখনও আটকে রয়েছে সেই গল্পের মধ্যে। এক ঘন্টার সময়সীমা কখন যে পেরিয়ে গিয়েছে, সেটা টের পাওয়া যায়নি। কথক ছেলেটির সামনে জনা দশেক লোকজন। ঘরে হলুদ আলো জ্বলছে। এসি চলছে ১৯শে। উত্তর দিকের বন্ধ জানলাটার বাইরে ছুটে চলা একটা শহর। সেই শহরের টুকরো গল্প, জয় পরাজয়ের কাব্য, হতাশা, আদর, আবদার, অভিমান এই বিরাট বাড়িটার বিভিন্ন ঘরে ফিনকি দিয়ে উঠছে।গড়ে উঠেছে মানব গ্রন্থাগার। যে গ্রন্থাগারে এক একজন ব্যক্তি একটি বই। তাঁদের জীবনের প্রতিটি দিন এক একটি পাতা। এইভাবেই তৈরি হয়ে মানব গ্রন্থাগার, এইভাবেই নিজের না বলা গল্পটা তুলে ধরা হচ্ছে অজানা মানুষদের ভিড়ে।
২০০০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে 'দ্য হিউম্যান লাইব্রেরি' নামে এক অভিনব সামাজিক উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল।এই উদ্যোগের মূল ধারণা ছিল প্রতিটি মানুষ এক একটি বই। অর্থাৎ এখানে বইয়ের বদলে একজন মানুষ তাঁর জীবনের গল্প, সংগ্রাম, মানসিক আঘাত, পরিচয় সংকট কিংবা সমাজের চোখে অন্যরকম হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সরাসরি অন্য মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেন। এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা রনি অ্যাবারগেল, ড্যানি অ্যাবারগেল এবং আসমা মুনা বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ সাধারণত ধর্ম, জাতি, পেশা, যৌন পরিচয় বা মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে একে অপরকে না জেনেই বিচার করে ফেলে। সেই কারণেই হিউম্যান লাইব্রেরির মূল স্লোগান হয়ে ওঠে, বিচার করার আগে মানুষটিকে জানুন। প্রথমবার মানব গ্রন্থগারের আয়োজন করা হয়েছিল ডেনমার্কের বিখ্যাত রস্কিল্ডে উৎসবে।যেখানে উদ্বাস্তু, মানসিক অবসাদে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রাক্তন মাদকাসক্ত, সমকামী কিংবা সমাজের চোখে বিতর্কিত পরিচয়ের মানুষ জীবন্ত বই হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন এবং পাঠকেরা তাঁদের সঙ্গে বসে কথা বলে তাঁদের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ধীরে ধীরে এই ধারণা ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগের শহুরে একাকীত্ব, সামাজিক মাধ্যমের ক্লান্তি এবং মানুষের মধ্যে আবেগিক সংযোগের অভাব এই ধরনের উদ্যোগকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এখন দ্রুত বাড়ছে। ইউনিসেফ-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, ভারতীয় তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক চাপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনে চাকরির অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের ভাঙন, একা থাকার অভ্যাস, ক্রমাগত প্রতিযোগিতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিখুঁত জীবন দেখানোর সংস্কৃতি মানুষকে ভিতর থেকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। বাঙালি সমাজেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। একসময় পাড়ার আড্ডা, যৌথ পরিবার, চায়ের দোকানের গল্প কিংবা বন্ধুমহল মানুষের আবেগের ভার সামলে দিত। এখন মহানগরের ব্যস্ততায় মানুষ ক্রমশ নিজের ভেতর গুটিয়ে যাচ্ছে। হাজার মানুষের ভিড়েও একাকীত্ব বাড়ছে, অথচ নিজের মনের কথা বলার নিরাপদ জায়গা কমে যাচ্ছে।


