তথ্য বিজ্ঞানীরা হলেন এমন পেশাজীবী, যারা বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করে অর্থপূর্ণ প্যাটার্ন, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রবণতা খুঁজে বের করেন।
আদিত্য ঘোষ
১৩ আগস্ট, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ
|প্রতীকী ছবি
তথ্য বিজ্ঞানীরা সমাজের অদৃশ্য গোয়েন্দা হয়ে উঠেছেন। যাদের কাজ একটা পুরু, পেশিবহুল সমাজের খোলনলচেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট সংস্থাকে খতিয়ান দেওয়া। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে সংস্থা বাজারের গতিবিধি বুঝে নির্দিষ্ট পথে চলবে বা বিশেষ প্রোডাক্ট তৈরি করবে । অর্থাৎ তথ্য বিজ্ঞানীরা এখন সামজের এমন এক কাঠামো হয়ে উঠেছেন, যাদের তথ্যের উপর ভিত্তি করছে তৈরি হচ্ছে আগামীর ভবিষ্যৎ। শুধু তাই নয়, তারাই এখন এই সমাজের অদৃশ্য গোয়েন্দা, যাদের তৈরি খতিয়ান ভেদ করে দিতে পারে অনেক অজানা রহস্য।
তথ্য বিজ্ঞানীরা হলেন এমন পেশাজীবী, যারা বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা বিশ্লেষণ করে অর্থপূর্ণ প্যাটার্ন, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রবণতা খুঁজে বের করেন। তারা পরিসংখ্যান, গণিত, প্রোগ্রামিং এবং বাস্তব জগতের জ্ঞান একত্র করে প্রাথমিক তথ্যকে এমন তথ্যে রূপান্তর করেন, যা ব্যবসা, প্রযুক্তি বা নীতিনির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সহজভাবে বলতে গেলে, তারা সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্প পড়ে ফেলতে পারেন।বর্তমান সময়ে এই পেশার চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, কারণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্যের বিপুল সঞ্চয় হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, অনলাইন কেনাকাটা, মোবাইল অ্যাপ, ব্যাঙ্কিং লেনদেন, এমনকি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য,সবকিছু থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন ডেটা তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের প্রসার এই পেশাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এক তথ্য বিজ্ঞানী সমাজমাধ্যমে নিজের নাম রেখেছেন 'সি কোডস এক্স'। শুনলে মনে হবে কোনও পেশাদার গোয়েন্দা। আদতে গোয়েন্দা এবং তথ্য বিজ্ঞানীদের কাজ অনেকটা একই গোত্রের। ডেটা সায়েন্টিস্টদের আধুনিক যুগের অদৃশ্য গোয়েন্দা বলা যেতে পারে, কারণ তারা দৃশ্যমান জগতের বাইরে থেকে মানুষের আচরণ, অভ্যাস ও সিদ্ধান্তের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করেন। একজন গোয়েন্দা যেমন বিচ্ছিন্ন প্রমাণ জুড়ে একটি ঘটনার পূর্ণচিত্র তৈরি করেন, তেমনই ডেটা সায়েন্টিস্ট বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত তথ্য যেমন অনলাইন ক্লিক, অনুসন্ধান ইতিহাস, লোকেশন ডেটা, সমাজ মাধ্যমের বিভিন্ন তথ্য, কেনাকাটার ধরণ একত্রিত করে মানুষের আচরণের প্যাটার্ন নির্ণয় করেন। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একজন মানুষের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের মাত্র কয়েকশো ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করেই তার ব্যক্তিত্ব, পছন্দ এমনকী রাজনৈতিক প্রবণতাও যথেষ্ট নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব। এই কারণেই আজকের দিনে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলি ব্যবহারকারীর পছন্দ আগেভাগেই বুঝে কনটেন্ট বা প্রোডাক্ট সাজেস্ট করতে পারে, আবার ব্যাঙ্ক ও ফিনটেক সংস্থাগুলি গ্রাহকের লেনদেন বিশ্লেষণ করে প্রতারণার সম্ভাবনা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
এখানেই ডেটা সায়েন্টিস্টদের কাজ কেবল প্রযুক্তিগত সীমার মধ্যে আটকে থাকে না।এটি এক গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে পরিণত হয়। তথ্য বিজ্ঞানী মিসেস 'সি কোডস এক্স' মিডিয়াম নামক এক প্ল্যাটফর্মে দেখিয়েছেন, যারা ঋণ শোধ করতে পারে না এবং যারা নিয়মিত ঋণ শোধ করে, তাদের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। বাইরে থেকে এটি বোঝা কঠিন, কারণ এখানে বহু মানুষের আচরণ, আর্থিক অবস্থা ও সিদ্ধান্ত জড়িয়ে থাকে। কিন্তু একজন তথ্যবিজ্ঞানী এই সমস্যাকে ভেঙে তথ্যের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন। তিনি দুটি আলাদা গোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করে পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেন, এই পার্থক্যটি সত্যিই অর্থবহ নাকি কেবলই কাকতালীয়। এর ফলে ধরা পড়ে যায়, কোন আয়ের স্তরে ঝুঁকি বেশি, কোন ধরনের ব্যয় বা আচরণ ভবিষ্যতে সমস্যার ইঙ্গিত দেয় কিংবা কোন প্যাটার্ন বারবার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তথ্যবিজ্ঞানীর কাজ কেবল সংখ্যার হিসেবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি সেই সংখ্যার ভেতর থেকে বাস্তব জীবনের কারণ খুঁজে বের করেন।কেন এই পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, এর পিছনে কোন সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব কী হতে পারে। অর্থাৎ, তিনি শুধু কী হচ্ছে তা নয়, বরং কেন হচ্ছে সেটিও ব্যাখ্যা করেন। এই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ব্যাঙ্ক বা প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয়, কাকে ঋণ দেওয়া নিরাপদ, কোথায় ঝুঁকি বেশি, কিংবা কীভাবে নীতিতে পরিবর্তন আনা দরকার। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়াই ঘটে নীরবে, মানুষের অজান্তে। তাই বলা যায়, তথ্যবিজ্ঞানীরা চোখে দেখা ঘটনাকে নয়, তার পিছনের অদৃশ্য সত্যকে অনুসন্ধান করেন। এই কারণেই তারা আধুনিক যুগের অদৃশ্য গোয়েন্দা।
প্রতীকী ছবি
এই তথ্য বিজ্ঞানী আরও একটি কেসে দেখিয়েছেন, একটি ক্যান্সার ডেটাসেটে টিউমারের আকার, গঠন, ঘনত্বের মতো অনেক তথ্য থাকে, যেগুলো সাধারণভাবে দেখে বোঝা কঠিন। কোন লক্ষণগুলো ক্যান্সারের সঙ্গে বেশি জড়িত এবং কোন প্যাটার্ন বিপদের ইঙ্গিত দিতে পারে। ফলে তিনি শুধু রোগ ধরা পড়ার পর বিশ্লেষণ করেন না, বরং আগেই বুঝতে পারেন কোথায় ঝুঁকি রয়েছে। হয়ত আগামীতে তিনি নিখুঁত ভাবে বলে দিতে পারবেন, কোন প্রেম টিকবে, কোন প্রেম ভাঙবে। অথবা কোন ভালবাসায় কতটা গভীরতা আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য তথ্য বিশ্লেষণের মধ্যে তিনি দেখিয়েছেন, টাইটনিক জাহাজে কাদের বাঁচার সম্ভবনা কতটা ছিল। এই সময়ের গোয়েন্দারা আর ট্রেঞ্চ কোট পরে অন্ধকার গলিতে ঘোরেন না। তারা নিঃশব্দে অবস্থান করেন পর্দার আড়ালে, অ্যালগরিদম আর সংখ্যার গভীরে ডুবে। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি থেমে যাওয়া, প্রতিটি অদেখা দ্বিধাই তাদের কাছে হয়ে ওঠে সূক্ষ্ম সূত্র। সেই বিচ্ছিন্ন সূত্রগুলো একে একে জুড়ে তারা নির্মাণ করেন আমাদের জীবনের এক অদৃশ্য কেস ফাইল যেখানে আমরা কখনও অভিযুক্ত, কখনও সাক্ষী, আবার কখনও কেবল একটি নিঃশব্দ ডেটা পয়েন্ট, যার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আমাদের না-বলা, অজানা গল্প।
ট্যাগসূচী:#datascience#datascientist#newworld
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ
লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার
পাঠকের মন্তব্য (0)
মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev
Modern Full-Stack Architecture • React & Next.js Ecosystem