ভোরের আলো সবেমাত্র এসেছে পুবের জানালা দিয়ে। নিমগাছের ডালে দু'একটা ছোট পাখি বসে অদ্ভুত সুরে ডাকছে । যে সুরে মন ভাল করার রসদ আছে অফুরান। ভোরের বাতাসে তখন শীতের আগমনী। ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে যে মাদকতা আছে, সেই মাদকতা বুকে জড়িয়ে চুপচাপ বাইরের দিকে চেয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। যদি আরও কিছু লেখার রসদ খুঁজে পান, এই আশায় চেয়েছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর চট করে উঠে, গরম পোশাক গায়ে ছাপিয়ে চেয়ারে বসে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করলেন। বইপত্র ঘাঁটলেন। ডায়েরীর পাতা ওলটালেন। কিছু যেন খুঁজছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না। সেই না পাওয়ার বিরক্তি তাঁর চোখে মুখে স্পষ্ট। তিনি বিষণ্ণ মুখে আবার বাইরের দিকে চেয়ে রইলেন। অদ্ভুত সুরে ডাকতে থাকা পাখিটা ততক্ষণে উড়ে গিয়েছে দিকশূন্যপুরে। জীবনানন্দের চোখ স্থির। নীরবে চেয়ে আছেন দূরে। ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে গানের আওয়াজ ভেসে এলো। সে গানে ভেঙে গেল তাঁর নীরবতা। তিনি বরাবরই শান্তিপ্রিয় মানুষ। উচ্চস্বরের কোনওকিছুই তাঁর বিশেষ পছন্দ না। কিন্তু উপায় নেই। পাশের ঘরটি যে ভাড়া দিয়েছেন অর্থের চাপে। সেই ঘরের মালকিন গান পাগল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেই ঘরে গানের আসর লেগেই থাকত। আসা যাওয়া করতেন কলকাতার বাবুরা। হইহুল্লোড় তখন হয়ে উঠেছিল জীবনানন্দের দোসর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু বলতে পারতেন না কবি।
বাংলাদেশ থেকে এক মধ্যবয়সী সুন্দরী বিধবা মহিলা দুই মেয়ে নিয়ে এসে উঠেছেন জীবনানন্দের পাশের ঘরে। মহিলার নাম সুরুচি মজুমদার। তখন জীবনানন্দের আর্থিক অবস্থা বেশ সংকটপূর্ণ। তাই বাধ্য হয়েই পাশের ঘরটি ভাড়া দিয়েছেন। কিন্তু সেই ঘর ভাড়া দিয়ে পড়েছেন মহাবিপদে। সুরুচি মজুমদারের যে গানবাজনার এত মহিমা, সে তিনি শুরুতে বুঝতেই পারেনিনি। যত দিন এগিয়েছে, তত গানের পারদ চড়েছে। গানের গুঁতোয় জীবনানন্দের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তবুও তিনি নীরব থাকতে চেয়েছেন। জীবনে ঝুটঝামেলা পছন্দ করতেন না। চাইতেন সমস্ত বিতর্ক বিবাদ থেকে দূরে থাকতে। তবুও আজীবন বিতর্ক ছিল তাঁর ছায়াসঙ্গী। বারবার চাকরি বদলেছেন। ছাত্রদের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্তও করা হয়েছিল। তবুও তিনি নীরবে চলে এসেছেন। নীরবতার উপাসক ছিলেন জীবনানন্দ। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর জীবন থেকে সমস্ত নীরবতা উধাও হয়ে গিয়েছিল। পাশের ঘরের মহিলা যে সহজে বোঝার পাত্রী নয়, সে তিনি মাসখানেক বাদেই বুঝতে পেরেছিলেন। একদিন সন্ধেবেলা জীবনানন্দ সুরুচি মজুমদারের কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন, গানবাজনার শব্দ যেন তাঁর লেখার ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি না করে। মহিলা চুপ করে শুনলেন কিন্তু কিছু বললেন না। তবে গানবাজনার আসর যেমন নিয়ম করে বসত, তেমনই চলতে লাগল। ধীরে ধীরে সেই আসর বাড়তে লাগল। কবি কিছু লিখতে পারছিলেন না বেশকিছুদিন ধরে। সেই নীরবতা ভঙ্গকারীকেও তিনি কিছু বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। যদি তিনি উঠে যান, তাহলে ভাড়ার টাকাটাও আর আসবে না। সব নিয়ে পড়েছিলেন বেজায় বিপদে।
একদিন সকালে দিদি সুচরিতা দাশকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন বেহালার দিকে জমি খুঁজতে। ভেবেছিলেন এই বাড়িতে আরও একটা ভাড়া বসিয়ে দেবেন এবং বেহালার দিকে নিরিবিলিতে একটা বাড়ি কিনে নিশ্চিন্তে থাকবেন। এই বাড়িতে গানের গুঁতোয় তাঁর লেখা বন্ধ। তার উপরে মহিলা ভাড়াটিয়া। বেশিকিছু বলতেও সাহস পাচ্ছিলেন না। তাই ভেবেছিলেন কম টাকায় যেখানে হোক একটা ছোট্ট বাড়ি কিনে কাটিয়ে দেবেন। বেহালায় জমির দাম শুনে তিনি ফিরে আসেন। কিন্তু বাড়ির খোঁজ চালিয়ে যান। গড়িয়ার দিকেও জমি দেখেন। সেও তাঁর আয়ত্তের বাইরে। নিরাশ হয়েছিলেন কবি। চেষ্টা করছিলেন যদি এক কামরার ঘর কোথাও ভাড়া পাওয়া যায়। তাহলে অন্তত শান্তিতে লেখালেখি করতে পারেন। এই বাড়িতে তাঁর দমবন্ধ হয়ে আসছিল। প্রতিদিন সকালে বিষণ্ণ মুখে তাকিয়ে থাকতেন বাইরের দিকে। অবশেষে একটা ফন্দি আঁটলেন কবি। দীর্ঘটালবাহানার পরে যখন দেখলেন মৌখিক উপায়ে আর হবে না, তখন অন্য পথে হাঁটতে হবে। সেদিন বাড়ি থেকে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে পড়লেন। পথে দেখা হল এক ঘনিষ্ঠ কবির সঙ্গে। তাঁকে জীবনানন্দ দাশ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'গুণ্ডা কোথায় ভাড়া পাওয়া যায় বলতে পারো? আমার লাগবে!' কথাটা শুনে সেই ভদ্রলোক যেন আকাশ থেকে পড়লেন। যে মানুষটা সারা জীবন নীরবের উপাসনা করেছেন, ঝুটঝামেলা থেকে শতহাত দূরে থেকেছেন, সে কিনা গুণ্ডার খোঁজ করছেন? আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয়। জীবনানন্দ গোটা বিষয়টা খুলে বললেন। জানালেন যে তাঁর পাশের ঘরটা এখন বাইজি ঘর হয়ে গিয়েছে। সারাদিন গানবাজনা। লোকের আসা যাওয়া। সেই সঙ্গে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং মোচ্ছব। সব নিয়ে তিনি অতিষ্ঠ। বহুবার মৌখিক অনুরোধ করেছেন এগুলো বন্ধ করার জন্য। সেই মহিলা শোনেনি। ভাড়ার অর্থের কথা ভেবে প্রথমে কিছু না বললেও শেষে তিনি সেই ঘর খালি করে দিতে বলেন। সেই কথাও তিনি কর্ণপাত করেননি। পুলিশে গিয়েও তিনি সুরাহা পাননি। পুলিশ নাকি তাঁর অভিযোগই গ্রহণ করেনি। তাই অগত্যা গুণ্ডা লেলিয়ে ভয় দেখাতে চাইছেন।


