উনি জীবনটা স্রেফ জীবনের মতো করে খাতায় টুকে গিয়েছেন
তিনি জীবনটাকে সহজ করে দেখেছিলেন। চোখের সামনে থাকা সামান্য উপাদানও তাঁর কাছের হয়ে উঠেছে।
আদিত্য ঘোষ
১৪ আগস্ট, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ
|জীবনানন্দ দাস
তুমি আবদার করে বললে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা শুনবে। তখন মধ্যরাত। তোমার জেটল্যাগ তখনও কাটেনি। আমি বরাবরই ছাপোষা, তাই মধ্যরাতেই জীবনের সব জটিল চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। সেইহেতু রাত জাগার অভ্যেসটা বরাবরই। অনেক ভেবে চিন্তে বনলতা সেন শোনালাম। তুমি একটু চুপ থেকে বললে, এটা তো শুনেছি। নতুন কিছু বলো। আমি একটু ভেবে বললাম, তোমাকে তবে রূপসী বাংলার রূপটা দেখায়। কথাগুলো শেষ করার আগেই তুমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললে, 'নতুন কিছু প্লিজ'! আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার কাছে জীবনানন্দ দাশ সবসময়ই নতুন। সর্বদা সতেজ এবং সবুজ। তবুও তোমার জন্য নির্জন স্বাক্ষর পড়লাম। তুমি চুপ করে শুনলে। তারপর কবিতার শেষ তিনটে লাইন বারবার আওড়ে যাচ্ছিলে-
'আমি চ’লে যাবো—তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ’রে সেইদিন পৃথিবীর ’পরে;
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।'
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ' তুমি কি সত্যি চলে যাবে?' তুমি উত্তর দিলে না। আবার মনে মনে একই লাইন আওড়ে যেতে লাগলে। জীবনানন্দ আসলে একটা নেশা, একবার ধরলে ছাড়ে না। যদিও তোমার বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে জীবনানন্দ বেমানান। তোমার সঙ্গে রাস্কিন বন্ড, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ারথ, জন কেটস, ভারজিনা উলফ অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িত। বাংলার খেতে না পাওয়া কবি কবে যে তোমার প্রিয় হয়ে উঠল, সে বলা মুশকিল। তবুও তোমার মধ্যবয়সে এসে এইটুকু বুঝলে যে জীবনানন্দ দাশকে নিয়েও সৌজন্য প্রকাশ হয়, এইটুকু জেনেও শান্তি পেলাম। তুমি আবার বায়না জুড়লে আরও একটা কবিতা শোনাও। তারপরে তোমাকে সহজ শুনিয়েছিলাম। সহজ শোনার পরে তুমি আরও চুপ হয়ে গিয়েছিল। তখন ফেব্রুরারি। বসন্তের প্রমাদ একটু একটু করে আমাদের নেশাগ্রস্ত করে তুলেছে।
' তুমি শুধু একদিন,—এক রজনীর;–
মানুষের—মানুষীর ভিড়
তোমারে ডাকিয়া লয় দূরে,কত দূরে—
কোন্ সমুদ্রের পারে,–বনে—মাঠে কিম্বা যে-আকাশ জুড়ে
উল্কার আলেয়া শুধু ভাসে!'
এই লাইনগুলো তোমাকে জাপটে ধরেছিল। তুমি সেই রাতে বারবার বলেছিলে এই লাইনগুলো পাঠ করে শোনাতে। কী ছিল ওই লাইনগুলোর মধ্যে? কীইবা আছে ওই লাইনগুলো মধ্যে, যা তোমাকে আরও আমার কাছে এনেছিল। তখন মাত্র কিছু টাকার মাইনের চাকরি করি। সেইটুকুর জন্য রোজ সল্টলেক ছুটে যাওয়া। আমার মাইনের সমান তোমার এক একটা সুগন্ধি বোতলের দাম। কী আশ্চর্য হতাম এই ভেবে যে আমার মতো বেয়াদপ, বিশ্রী দেখতে একটা ছেলের প্রেমে তুমি পড়লে কী করে। যদিও অনেক পড়ে উত্তর পেয়েছিলাম। বুঝেছিলাম আমার কাছে জীবনানন্দ দাশ ছিল। উনি জীবনটা স্রেফ জীবনের মতো করে খাতায় টুকে গিয়েছেন। কোনও বাড়তি উপঢৌকন দেওয়ার চেষ্টা করেননি। নিজের জন্য লিখেছেন। লেখা প্রকাশের জন্য নয়। তিনি জীবনটাকে সহজ করে দেখেছিলেন। চোখের সামনে থাকা সামান্য উপাদানও তাঁর কাছের হয়ে উঠেছে। সাদা পাঞ্জাবির আস্তিন কুনুই পর্যন্ত গুটিয়ে তিনি জীবনকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, পৃথিবীর রূপ খোঁজার আর প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি বাংলার রূপ দেখেছেন। এই একটি মানুষ বাংলার ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে তুলে ধরেছে তাঁর লেখায়। ভোরের কুয়াশা, কাঁঠালপাতা, জামবন, শঙ্খচিল, ঘুঙুর। তখন মাধ্যমিকের আগের শীতের এক সকালবেলা। বয়স ওই পনেরো কিংবা তাঁর একটু কম। শীতকালে ভোরবেলা উঠে রূপসী বাংলা কবিতাটা পড়ছি। কবিতার লাইনগুলো গায়ে বিঁধছে।
' বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে
ভোরের দোয়েলপাখি — চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম — বট — কাঠালের — হিজলের — অশখের করে আছে চুপ'
সেই প্রথম বুঝেছিলাম কবিতার প্রেম কী হতে পারে। তখন পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়েছিলাম। পরবর্তীকালে জীবনের জন্য পড়েছি, নতজানু হয়েছি তাঁর লেখনীর কাছে। শিহরিত ভোরবেলায় আজানের শব্দ ভেসে এসেছে। শীতের ভোরে ঘুম ভেঙে উঠে দেখেছি এই বাংলাকে! আহা, কী অপূর্ব। যে যাই বলুক, এই বাংলার প্রতিটা রূপ তাঁরই কলমে শ্রেষ্ঠ হয়ে ফুটে উঠেছে বারবার।
'আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়;
হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারা দিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে-ভেসে;
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে।'
সংগৃহীত
জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, ব্রিটিশ ভারতের (অধুনা বাংলাদেশ) বরিশাল শহরে। তার পিতার নাম সত্যানন্দ দাশ এবং মাতার নাম কুশুমকুমারী দাশ। তাঁর মা নিজেও একজন কবি ছিলেন এবং বিখ্যাত "আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে" লিখেছিলেন। তাই হয়ত কবিতা লেখার বীজ তাঁর রক্তেই ছিল। জীবনানন্দ দাশ এর পারিবারিক নাম ছিল মিলু। তাঁর পারিবারিক উপাধি ছিল'দাশগুপ্ত'। অথচ তিনি 'দাশ' লিখতেন। ১৯৩০ সালের ৯ মে জীবনানন্দ দাশ লাবণ্য দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ঢাকা শহরে,লাবণ্য গুপ্ত সে সময় ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। তবে তাঁর বিবাহিত জীবন বিশেষ সুখের ছিল না। নিত্যনৈমিত্তিক অভাব-অনটন ছিল তাঁদের সঙ্গী। 'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জীবনানন্দের প্রথম কবিতা কবিতা 'বর্ষা'। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরাপালক'। তিনি রবীন্দ্রনাথকে গ্রন্থের একটি কপি পাঠিয়েছিলেন। জবাবও দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাতে প্রশংসার থেকে সমালোচনাই ছিল বেশি। জবাবে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'তোমার কবিত্ববোধ আছে এতে সন্দেহ নাই। কিন্তু ভাষা প্রবৃত্তি নিয়ে এত জবরদস্তি কেন, বুঝতে পারি নে।' জানা যায় সেই সময়ের বেশ কিছু পত্রিকার সম্পাদক তাঁর কবিতা প্রকাশে অসম্মতি প্রকাশ করেন। তবু দমে যাননি জীবনানন্দ। লাগাতার লেখা চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের জন্য লিখেছেন। এই বাংলার রূপের কাছে নতজানু থেকেছেন সারাটা জীবন।
জীবনানন্দ দাশ পেয়েছিলেন 'নির্জনতম কবি','শুদ্ধতম কবি' খেতাব। ধ্যান এবং নিমগ্নতাকে জীবনানন্দ দাশ নিছক সাহিত্যচর্চার উপাদান বিবেচনা করেননি, তার জীবনচর্যার মধ্যে বিষয়গুলো ঢুকে পড়েছিল। নির্জন-একাকী, কিছুটা কুয়াশাঘেরা ছিল তাঁর জীবনযাপন। খুব কম লোকের সঙ্গে তিনি মিশেছেন। তাই তার সৃষ্টিমূলক লেখা থেকে খুঁজে নিতে হয় ব্যক্তি জীবনানন্দকে। অসংখ্য কবিতা লিখে বেশিরভাগই ট্রাঙ্কে তুলে রেখে দিয়েছিলেন। প্রেম হারিয়ে বেদনাক্লিষ্ট ছিল মনের অভ্যন্তর। অর্থনৈতিক অস্বাচ্ছন্দ্য আর দাম্পত্য-সম্পর্ক নিয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চারদিকে সমস্যার পাহাড় তৈরি করে তার জীবনটাকে থিতু হতে দেয়নি। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র জীবনানন্দের লেখালেখির শুরুটা ইংরেজিতেই, কবিতা দিয়ে। জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত তার আরও লেখার মতো ইংরেজি কবিতাগুলোও পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়নি।
'I did not know The earth was so soft Before a woman came to me And stopt.'
তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো পড়লে বোঝা যায় একটা মানুষ কতটা সহজ হতে পারে। কারুবাসনা তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ। জীবনের নিত্য ঘটনাগুলো স্রেফ লিখে গিয়েছেন। ফুটে উঠেছে নিত্য যন্ত্রণা। আবার তিনিও স্বপ্নও দেখেছেন প্রাণভরে। তিনি উপন্যাসের এক জায়গায় লিখেছেন, ' ভবিষ্যতে কোনওদিন বাংলাদেশের কোনও এক প্রান্তে একটা বাংলো তৈরি করব। চারিদিকে বাবলাগাছের ঘন নিবিড় বেড়া দিয়ে মাঠটাকে ঘিরে রাখব। কিংবা বুনো কাঠ দিয়ে...'। 'মাল্যবান' জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। প্রায় কুড়িটার মতো উপন্যাস তিনি লিখেছেন। এর মধ্যে 'জলপাইহাটি' ও 'সুতীর্থ' তাঁর সুবৃহৎ উপন্যাস। জীবনানন্দ দাশের অভ্যাস ছিল, কোনো একটি কবিতা লিখে শেষ করার পর ফেলে রাখা এবং ফিরে ফিরে পড়া ও সংশোধন করা। চূড়ান্ত রূপ তৈরি করে পত্রিকায় পাঠানো। এমনকি পত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে, ছাপা হওয়ার আগে বা পরেও তিনি সংশোধন করতেন। গল্প ও উপন্যাসের বেলায় তিনি এই কাজ করতে পারেননি। সময় ও অবকাশ মেলেনি। শুধু তাই নয়, তিনি উদাসীন ছিলেন নিজের লেখা এবং জীবন নিয়ে। পাশ দিয়ে পরিচিত কেউ হেঁটে গেল তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিতেন। তাঁর কবিতার বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি ট্রেন থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিল। পড়ে সেই পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল ঠোঙা আকারে।
তুমি আবদার করে বলেছিলে চলো বিদেশে পাড়ি দিই। তোমার পড়ার টেবিলে রাখা থাকত ফেলুদা, রাস্কিন বন্ড, রোসাবেল লাইন। তোমার জানলা দিয়ে দেখা যেত সুদূর জঙ্গল। আমি তোমাকে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতার বই উপহার দিয়েছিলাম, বলেছিলাম পড়ার টেবিলে রেখো। কিন্তু লাগেজের দোহাই দিয়ে তুমি সেই বই নিয়ে যাওনি। ফেলে রেখে গিয়েছিলে নৈহাটির বাড়িতে। বেচারা কবি বেঁচে থাকতেও সম্মান পেল না, মরে গিয়েও না। তবে আক্ষরিক অর্থে তিনি মারা যাওয়ার পর পাঠকরা বুঝেছেন তিনি আসলে একটা গোটা পৃথিবী ছিলেন। যে পৃথিবী নিজেতে নিমগ্ন ছিল। তবে তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা মুনিত নানা মত। কেউ বলে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন আবার কেউ কেউ দুর্ঘটনার তত্ত্ব খাঁড়া করে। তবে শোনা যায় তিনি নাকি ট্রামে চাপা পড়ে মারা যাবেন এইরকম দৈববানী পেয়েছিলেন! তবুও তাঁর যাওয়ার পড়ে যা পড়ে আছে সেই দিয়ে আরও কয়েকটা শতাব্দী কেটে যাবে। প্রেমে পড়লেও জীবনানন্দ দাশ, প্রেম ভাঙলেও তিনি। প্রচণ্ড মনখারাপে অথবা জ্বরে তিনি আমাদের ওষুধ। তুমি বারবার বলতে এই জংলা দেশ ছেড়ে চলে আসতে তোমার কাছে। সত্যি বলতে মন চাইনি। তখনও বাবা বেঁচে। ইচ্ছে হলে হয়ত আসতেই পারতাম। তখন সবে বসন্তের শুরু। তুমি একদিন জেদ করে বললে, আমার কাছে এসো নয়ত এই সম্পর্ক শেষ করে দাও। আমি সেদিন তোমাকে জীবনানন্দ দাশের এই কবিতাটা শুনিয়েছিলাম।
'তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও — আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের সন্ধ্যায় হিম হয়ে আসে ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে নেচে চলে-একবার — দুইবার — তারপর হঠাৎ তাহারে বনের হিজল গাছ ডাক দিয়ে নিয়ে হৃদয়ের পাশে;'
ট্যাগসূচী:#JibonanondoDas#Poem#Poet#Life
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ
লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার
পাঠকের মন্তব্য (0)
মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev
Modern Full-Stack Architecture • React & Next.js Ecosystem