বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
প্রবন্ধ

কলকাতার বুকে আজও প্রশ্নের মুখে একত্রবাস

সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুসারে একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীর সাথে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে, তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সংবিধান তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১৯ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

কলকাতার বুকে আজও প্রশ্নের মুখে একত্রবাস
|একত্রবাস

এই শহরের বুকে বেড়ে ওঠা, এই শহরেই প্রথম প্রেমের স্বাদ পাওয়া। এই শহর জানে আমাদের প্রথম সবকিছু। একসঙ্গে থাকব বলে, অপেক্ষা দীর্ঘকাল। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে স্বপ্ন বুনে রাখা ছোট্ট কুঠুরিতে। একসঙ্গে থাকব বলে কত পরিকল্পনা, কত রাত জাগা গল্প। চুপচাপ আকাশের দিকে চেয়ে একসঙ্গে তারা গুনব বলে, কত বসন্ত পার করেছি দুজনে। আমাদের যাপন যেন শুভ হয়, ভাল হয় সবটুকু। মনে মনে এই প্রার্থনা করেছি খসে পড়া তারার দিকে চেয়ে। রাতের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এক যুগল শুধুমাত্র একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিল। চেয়েছিল একটা সুন্দর যাপন। কিন্তু বাঁধ সাধল একের পর এক নৈতিক প্রশ্ন, সামাজিক স্বীকৃতির হিসেব। প্রতিটা দরজা বন্ধ হতে শুরু করল। একশ বর্গফুটের ফ্ল্যাটও জুটল না কপালে। উপরন্তু ধেয়ে এল সামাজিক কটাক্ষ। এই সাংস্কৃতিক শহরে যাপনের সুখ নিমেষে উড়ে গেল। রাত নামল চুপিসারে। মুখোমুখি বসা হল না আর।

লিভ-ইন সম্পর্ক বলতে বোঝায়, যখন দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ (বা সমলিঙ্গ সঙ্গী) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও একসঙ্গে বসবাস করেন, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে। এটি একধরনের 'সহবাস' সম্পর্ক, যা বিয়ের মতো সামাজিক বা ধর্মীয় স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে না। অনেকেই এই সম্পর্ককে বিয়ের বিকল্প হিসেবে দেখেন, যেখানে স্বাধীনতা, সমতা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পায়।ভারতীয় আইন এই সম্পর্ককে অপরাধ বলে মানে না। বরং সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে এটি মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে সামাজিক বাস্তবতায় এখনও এই সম্পর্ককে অনেক জায়গায় 'অস্বাভাবিক' বা 'লুকোনো সম্পর্ক' বলেই গণ্য করা হয়, বিশেষ করে ছোট শহর বা রক্ষণশীল সমাজে। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুসারে একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীর সাথে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে, তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সংবিধান তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে। লিভ-ইন সম্পর্ক আদতে আধুনিক সময়ের ধারণা নয়, এর শিকড় প্রাচীন ভারতীয় সমাজেই পাওয়া যায়। মনুসংহিতায় বর্ণিত আট ধরনের বিবাহের মধ্যে 'গান্ধর্ব বিবাহ' ছিল প্রেমের ভিত্তিতে গোপনে সহবাসের মাধ্যমে গঠিত সম্পর্ক, যা সামাজিক বা ধর্মীয় অনুমতি ছাড়াও স্বীকৃত হতো। কিছু গবেষকদের মতে, মহাভারতে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার সম্পর্ক এই ধরণেরই ছিল। তাঁরা ভালোবেসে একসঙ্গে বসবাস করেন, সন্তান হয়, পরে সমাজ তা মেনে নেয়। এ ধরনের উদাহরণ প্রমাণ করে, প্রেম ও পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে সহবাস প্রাচীন ভারতীয় সমাজে একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। অতএব, লিভ-ইন সম্পর্ক আমাদের সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকেই এসেছে, এটি কোনও পশ্চিমি ধারণা নয়।

কলকাতা, ভারতীয় সংস্কৃতি ও চিন্তার পীঠস্থান হিসেবে গণ্য।সেখানেও আজকের দিনে লিভ-ইন সম্পর্ক এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে আধুনিক যুবসমাজের একাংশ যেখানে বিবাহের বাইরে থেকে একসঙ্গে থাকার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের রক্ষণশীলতা ও আইনি অস্পষ্টতা তাঁদের বারবার মুখ থুবড়ে ফেলছে।আরবান রিলেশিনশিপ ট্রেন্ড রিপোর্ট ২০২৩(Urban Relationship Trend Report 2023)–এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ১৪.৬% মানুষ বর্তমানে বা অতীতে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৬১% হলেন কর্মজীবী যুবক-যুবতী, ২৭% উচ্চশিক্ষার ছাত্রছাত্রী, এবং বাকি অংশ মূলত ফ্রিল্যান্স বা ক্রিয়েটিভ পেশায় যুক্ত। অধিকাংশ যুগল (প্রায় ৭০%) এই সম্পর্ককে দেখছেন একটি দায়িত্বশীল সহবাস হিসেবে, যেখানে বিয়ের আগে একে অপরকে বোঝার সুযোগ থাকে, আর্থিক ও আবেগগত অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে। তবে বাস্তবতা মোটেও সহজ নয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কলকাতায় লিভ-ইন দম্পতিদের ৭২%-এর বেশি মানুষ বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণা, প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বা সরাসরি অস্বীকৃতির মুখে পড়েছেন। বাড়িওয়ালারা প্রাথমিকভাবে ফ্ল্যাট দেখালেও, যখন জানতে পারেন সম্পর্কটি বৈবাহিক নয়, তখন প্রায়শই বলেছেন 'আমরা বিয়ে না হওয়া ছেলে-মেয়েকে ফ্ল্যাট দিই না।' অনেক সময় লিভ-ইন দম্পতিরা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মিথ্যা বিবৃতি দিতে বাধ্য হন।কোনো গণ্ডগোল হলে পুলিশি সহায়তাও সব সময় মেলে না। অনেক থানায় প্রথমেই প্রশ্ন তোলা হয়, 'আপনারা বিয়ে করেছেন তো?' না বললে অনেকে অভিযোগ নিতে চান না। কলকাতার বিভিন্ন সভ্য এবং প্রগতিশীল এলাকা বলে বিবেচিত অংশে কোনও অবিবাহিত যুগলকে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এক যুগল তাঁদের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে বাড়ির মালিক প্রথমে তাঁদের পরিচয়পত্র দেখার পরে তাঁদের পরিবার পরিজনের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁরা কেন একসঙ্গে বিয়ে না করে থাকতে চাইছে সেই বিষয়েও বহু প্রশ্ন করা হয়। সবশেষে তাঁদের ধর্ম এবং খাদ্যভাস নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে সমস্যা এখানে শেষ নয়, খোদ কলকাতার বুকে তাঁদের রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একদল লোক এসে যুগলদের পরিচয় দেখতে চান। তাঁদের খাদ্যভাস এবং ধর্ম নিয়েও বেশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। শুধু তাই নয়, তাঁরা কোন দেবতার উপসনা করবে সেই নিয়েও দেওয়া হয় বিরাট ফিরিস্তি। এই ঘটনা খোদ কলকাতার! যে শহরটা জানে আমাদের প্রথম সবকিছু। যে শহরের অলিগলি নিয়ে আঁকা আমাদের ক্যানভাস। যে শহরের বুকে যাপন এখন সুখকর নয় উপরন্তু একসঙ্গে থাকা এখন সমাজের চোখে বিদ্রুপের।

যদিও ভারতের সংবিধান ও আদালতের দৃষ্টিতে লিভ-ইন সম্পর্ক আইনত অপরাধ নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় (যেমন Indra Sarma v. V.K.V. Sarma, 2013 ও S. Khushboo v. Kanniammal, 2010) বলেছে, 'প্রাপ্তবয়স্ক দুই ব্যক্তি যদি নিজেদের ইচ্ছায় একসঙ্গে বসবাস করতে চান, তবে তা সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের মৌলিক অধিকার। এটি সহবাস বা সহ-জীবনের একটি সামাজিক রূপ, এবং এটিকে যৌন সম্পর্ক বা পতিতাবৃত্তির সমতুল্য ধরা যাবে না।' তবে এই আইন কার্যকর করতে গেলে পুলিশ প্রশাসন এবং সমাজের মধ্যে সচেতনতা জরুরি। কলকাতা পুলিশের কিছু মেট্রোপলিটন থানায় (যেমন বালিগঞ্জ, পার্কস্ট্রিট, নিউ আলিপুর) এখন লিভ-ইন দম্পতিদের অভিযোগ গ্রহণে নমনীয়তা দেখা গেলেও শহরের অন্যান্য জায়গায় সেই মনোভাব এখনও গড়ে ওঠেনি।পরিসংখ্যান আরও বলছে, লিভ-ইনে থাকা যুগলদের মধ্যে প্রায় ৪৩% মানসিক চাপ, পারিবারিক বিরোধ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সমস্যায় ভোগেন। তবু তাঁদের অনেকেই মনে করেন, এই সম্পর্ক নির্বাচনের স্বাধীনতা ও আত্মসম্মানের জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ।আধুনিক প্রজন্মের অনেকেই এখন বৈবাহিক জীবনের বদলে লিভ-ইন সম্পর্ককে বেছে নিচ্ছেন। এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ থাকে, তেমনি স্বাধীনতা ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যও বজায় রাখে। মনোবিজ্ঞান বলছে, আজকের তরুণদের মধ্যে দায়বদ্ধতা নিয়ে ভয়, পেশাগত চাপ, এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রয়োজন অনেক বেশি। তাই অনেকেই আগে একসঙ্গে থেকে সঙ্গীর স্বভাব, অভ্যাস ও মানসিকতা বুঝে নিতে চান। আরবান ইয়ুথ সার্ভে (Urban Youth Survey 2023) অনুযায়ী, শহরের ৪৮% তরুণ-তরুণী মনে করেন, 'বিয়ের আগে একসঙ্গে থাকা ভবিষ্যতের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।' তাছাড়া, লিভ-ইন সম্পর্কে আইনগত জটিলতা কম, সম্পর্ক ভাঙলেও সামাজিক বা পারিবারিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে এটি এক ধরনের পরিণত, সচেতন ও স্বাধীন সম্পর্কের রূপ হয়ে উঠছে, যা আজকের সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই। লিভ-ইন সম্পর্ক যতই আইনসম্মত ও ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হোক না কেন, সমাজ আজও একে সহজভাবে নিতে পারে না। এর প্রধান কারণ বিয়েকে ঘিরে সমাজের বহুদিনের সংস্কার ও বিশ্বাস। সমাজ মনে করে, সম্পর্কের বৈধতা শুধুই বিয়ের মাধ্যমে আসে। তাই বিয়ের বাইরের সহবাসকে তারা 'অনৈতিক' ও 'অনিয়ন্ত্রিত' বলে সন্দেহ করে। লিভ-ইন সম্পর্কের প্রতি নানা কটাক্ষ—যেমন 'চরিত্রহীনতা', 'পশ্চিমি প্রভাব', 'দায়িত্বহীন সম্পর্ক'—এই মনোভাব থেকেই জন্ম নেয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, বিয়ের আগে এক পুরুষের সঙ্গে থাকা মানেই সমাজের চোখে সম্মানহানির বিষয়।

বারবার মনে পড়ে অমৃতা প্রীতম এবং ইমরোজের কথা। ৪০ বছর পরস্পরকে ভালবেসে একত্রবাসে থেকেছেন। যেন একে অপরের আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা।শর্তহীন প্রেমে ডুবে থেকেছেন অমৃতা ও ইমরোজ। সারা বিশ্বে তাঁদের এই সম্পর্ক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। অমৃতা প্রীতম ও ইমরোজের একত্রবাস ভারতীয় সাহিত্যে প্রেম ও সহবাসের এক অনন্য উদাহরণ। অমৃতার জীবনজুড়ে সাহিত্যের মতোই মুক্তচিন্তা ছিল তাঁর সম্পর্কেও ইমরোজ ছিলেন তাঁর সঙ্গী, সহচর, এবং নীরব ভালোবাসার প্রতীক। প্রতিদিন ইমরোজ তাঁকে কবিতা শোনাতেন, চিঠি লিখতেন, পাশে থাকতেন নিঃশব্দ আশ্রয়ের মতো। তাঁদের এই লিভ-ইন সম্পর্ক প্রমাণ করে, ভালোবাসা কেবল সামাজিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকে না, বরং পরস্পরের শ্রদ্ধা, অনুভব এবং স্বাধীনতার মধ্যেই সে আপন গভীরতা খুঁজে পায়। অমৃতা প্রীতমের মতো এই শহরের বুকে কত কত আজানা যুগল প্রতিদিন তাঁদের একত্রবাসের গল্প লিখছে চুপিসারে। আবার কত কেউ সেই একত্রবাসের জন্য প্রতিনিয়ত সমাজের প্রশ্নের মুখে পড়ছে প্রতিদিন? আর কবে আমাদের মনের বদল হবে? কবে প্রশ্ন করা বন্ধ হবে? কবে কোনও স্বীকৃতি ছাড়াই পাশাপাশি থাকতে পারব?একসঙ্গে হাঁটতে পারব দিকশূন্যপুরের দিকে? যেদিন কোনও নীতি পুলিশের চোখ রাঙানির খপ্পরে পড়তে হবে না আমাদের, সেইদিনই হবে আমাদের ভাল দিন। সেইদিনই হবে আমাদের একত্রবাসের উদযাপন।
( প্রথম প্রকাশ বঙ্গদর্শন ডট কম)

ট্যাগসূচী:#liveinrelation#kolkata#stay#couple
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev