এই শহরের বুকে বেড়ে ওঠা, এই শহরেই প্রথম প্রেমের স্বাদ পাওয়া। এই শহর জানে আমাদের প্রথম সবকিছু। একসঙ্গে থাকব বলে, অপেক্ষা দীর্ঘকাল। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে স্বপ্ন বুনে রাখা ছোট্ট কুঠুরিতে। একসঙ্গে থাকব বলে কত পরিকল্পনা, কত রাত জাগা গল্প। চুপচাপ আকাশের দিকে চেয়ে একসঙ্গে তারা গুনব বলে, কত বসন্ত পার করেছি দুজনে। আমাদের যাপন যেন শুভ হয়, ভাল হয় সবটুকু। মনে মনে এই প্রার্থনা করেছি খসে পড়া তারার দিকে চেয়ে। রাতের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এক যুগল শুধুমাত্র একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিল। চেয়েছিল একটা সুন্দর যাপন। কিন্তু বাঁধ সাধল একের পর এক নৈতিক প্রশ্ন, সামাজিক স্বীকৃতির হিসেব। প্রতিটা দরজা বন্ধ হতে শুরু করল। একশ বর্গফুটের ফ্ল্যাটও জুটল না কপালে। উপরন্তু ধেয়ে এল সামাজিক কটাক্ষ। এই সাংস্কৃতিক শহরে যাপনের সুখ নিমেষে উড়ে গেল। রাত নামল চুপিসারে। মুখোমুখি বসা হল না আর।
লিভ-ইন সম্পর্ক বলতে বোঝায়, যখন দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ (বা সমলিঙ্গ সঙ্গী) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও একসঙ্গে বসবাস করেন, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে। এটি একধরনের 'সহবাস' সম্পর্ক, যা বিয়ের মতো সামাজিক বা ধর্মীয় স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে না। অনেকেই এই সম্পর্ককে বিয়ের বিকল্প হিসেবে দেখেন, যেখানে স্বাধীনতা, সমতা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পায়।ভারতীয় আইন এই সম্পর্ককে অপরাধ বলে মানে না। বরং সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে এটি মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে সামাজিক বাস্তবতায় এখনও এই সম্পর্ককে অনেক জায়গায় 'অস্বাভাবিক' বা 'লুকোনো সম্পর্ক' বলেই গণ্য করা হয়, বিশেষ করে ছোট শহর বা রক্ষণশীল সমাজে। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুসারে একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীর সাথে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে, তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। এটি তার ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সংবিধান তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে। লিভ-ইন সম্পর্ক আদতে আধুনিক সময়ের ধারণা নয়, এর শিকড় প্রাচীন ভারতীয় সমাজেই পাওয়া যায়। মনুসংহিতায় বর্ণিত আট ধরনের বিবাহের মধ্যে 'গান্ধর্ব বিবাহ' ছিল প্রেমের ভিত্তিতে গোপনে সহবাসের মাধ্যমে গঠিত সম্পর্ক, যা সামাজিক বা ধর্মীয় অনুমতি ছাড়াও স্বীকৃত হতো। কিছু গবেষকদের মতে, মহাভারতে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার সম্পর্ক এই ধরণেরই ছিল। তাঁরা ভালোবেসে একসঙ্গে বসবাস করেন, সন্তান হয়, পরে সমাজ তা মেনে নেয়। এ ধরনের উদাহরণ প্রমাণ করে, প্রেম ও পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে সহবাস প্রাচীন ভারতীয় সমাজে একেবারে অনুপস্থিত ছিল না। অতএব, লিভ-ইন সম্পর্ক আমাদের সাংস্কৃতিক পরম্পরা থেকেই এসেছে, এটি কোনও পশ্চিমি ধারণা নয়।
কলকাতা, ভারতীয় সংস্কৃতি ও চিন্তার পীঠস্থান হিসেবে গণ্য।সেখানেও আজকের দিনে লিভ-ইন সম্পর্ক এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে আধুনিক যুবসমাজের একাংশ যেখানে বিবাহের বাইরে থেকে একসঙ্গে থাকার স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের রক্ষণশীলতা ও আইনি অস্পষ্টতা তাঁদের বারবার মুখ থুবড়ে ফেলছে।আরবান রিলেশিনশিপ ট্রেন্ড রিপোর্ট ২০২৩(Urban Relationship Trend Report 2023)–এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ১৪.৬% মানুষ বর্তমানে বা অতীতে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৬১% হলেন কর্মজীবী যুবক-যুবতী, ২৭% উচ্চশিক্ষার ছাত্রছাত্রী, এবং বাকি অংশ মূলত ফ্রিল্যান্স বা ক্রিয়েটিভ পেশায় যুক্ত। অধিকাংশ যুগল (প্রায় ৭০%) এই সম্পর্ককে দেখছেন একটি দায়িত্বশীল সহবাস হিসেবে, যেখানে বিয়ের আগে একে অপরকে বোঝার সুযোগ থাকে, আর্থিক ও আবেগগত অংশীদারিত্ব গড়ে ওঠে। তবে বাস্তবতা মোটেও সহজ নয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কলকাতায় লিভ-ইন দম্পতিদের ৭২%-এর বেশি মানুষ বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে প্রতারণা, প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি বা সরাসরি অস্বীকৃতির মুখে পড়েছেন। বাড়িওয়ালারা প্রাথমিকভাবে ফ্ল্যাট দেখালেও, যখন জানতে পারেন সম্পর্কটি বৈবাহিক নয়, তখন প্রায়শই বলেছেন 'আমরা বিয়ে না হওয়া ছেলে-মেয়েকে ফ্ল্যাট দিই না।' অনেক সময় লিভ-ইন দম্পতিরা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মিথ্যা বিবৃতি দিতে বাধ্য হন।কোনো গণ্ডগোল হলে পুলিশি সহায়তাও সব সময় মেলে না। অনেক থানায় প্রথমেই প্রশ্ন তোলা হয়, 'আপনারা বিয়ে করেছেন তো?' না বললে অনেকে অভিযোগ নিতে চান না। কলকাতার বিভিন্ন সভ্য এবং প্রগতিশীল এলাকা বলে বিবেচিত অংশে কোনও অবিবাহিত যুগলকে বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এক যুগল তাঁদের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে বাড়ির মালিক প্রথমে তাঁদের পরিচয়পত্র দেখার পরে তাঁদের পরিবার পরিজনের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁরা কেন একসঙ্গে বিয়ে না করে থাকতে চাইছে সেই বিষয়েও বহু প্রশ্ন করা হয়। সবশেষে তাঁদের ধর্ম এবং খাদ্যভাস নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে সমস্যা এখানে শেষ নয়, খোদ কলকাতার বুকে তাঁদের রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একদল লোক এসে যুগলদের পরিচয় দেখতে চান। তাঁদের খাদ্যভাস এবং ধর্ম নিয়েও বেশ জিজ্ঞাসাবাদ করে। শুধু তাই নয়, তাঁরা কোন দেবতার উপসনা করবে সেই নিয়েও দেওয়া হয় বিরাট ফিরিস্তি। এই ঘটনা খোদ কলকাতার! যে শহরটা জানে আমাদের প্রথম সবকিছু। যে শহরের অলিগলি নিয়ে আঁকা আমাদের ক্যানভাস। যে শহরের বুকে যাপন এখন সুখকর নয় উপরন্তু একসঙ্গে থাকা এখন সমাজের চোখে বিদ্রুপের।


