বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
প্রবন্ধ

ঘাস থেকে গুড় তৈরির অভিনব প্রথার শুরু ভাগীরথীর পূর্বে

নেপিয়ার ঘাস দ্রুতবর্ধনশীল এক ধরনের ঘাস, যা নদীচর, পলিমাটি ও আর্দ্র ভূখণ্ডে খুব সহজে জন্মায়।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

ঘাস থেকে গুড় তৈরির অভিনব প্রথার শুরু ভাগীরথীর পূর্বে
|ভাগীরথীর পূর্বে

ঘাস থেকে গুড় তৈরি? তাও আজ থেকে কয়েক'শ বছর আগে? নদীর তীরে গজিয়ে ওঠা লম্বা ধরণের এক ঘাস থেকে তৈরি হল গুড়। সেই গুড়ের বিক্রির জন্য বসল হাট। সেই হাটের নামকরণ হল। ভিড় বাড়তে লাগল খদ্দেরদের। হাটে আসতে লাগল গুড়ের মহাজনেরা।মহাজনদের বিলাসিতার জন্য তৈরি হল ভাটিখানা। ভাটিখানার জন্য গুড়ের প্রয়োজন শুরু হল। বিক্রি বাড়তে থাকল গুড়ের, দেশি মদের। ভাগীরথীর পূর্ব পারে তখন গজিয়ে উঠেছে আস্ত একটা চর। সেই চর হয়ে উঠেছে বাণিজ্য ক্ষেত্র। নৌকা করে দূর দূরান্ত থেকে লোকেরা আসতে শুরু করল, সেই নামহীন জনপদের চরে। সেই চরে বিক্রি হতে শুরু করল, নেপিয়ার ঘাস থেকে তৈরি গুড়। সেই সময়, এই গুড় তৈরির পদ্ধতি ছিল এক অভিনব আবিষ্কার। যে আবিষ্কার সময়ের মায়াজালে চাপা পড়ে গিয়েছে। সময়ের তালে হারিয়ে গিয়েছে গুড়ের হাট। গঙ্গার তীরে গড়ে উঠেছে পাঠ শিল্প। তবুও নেপিয়ার ঘাস থেকে তৈরি গুড়ের গল্প এখনও ভেসে বেড়ায় ভাগীরথীর পূর্ব পারে।

নেপিয়ার ঘাস দ্রুতবর্ধনশীল এক ধরনের ঘাস, যা নদীচর, পলিমাটি ও আর্দ্র ভূখণ্ডে খুব সহজে জন্মায়। আখের মতোই এই ঘাসের কাণ্ডে শর্করাযুক্ত রস থাকে, যদিও তার পরিমাণ ও স্বাদ আখের তুলনায় কম এবং কিছুটা তেতো। উনিশ শতকের গ্রামবাংলায়, বিশেষ করে ভাগীরথী ও তার শাখা নদীঘেঁষা চরের এলাকায়, বারবার বন্যা, ভাঙন ও মাটির লবণাক্ততার কারণে আখচাষ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতিতে নেপিয়ার ঘাস ছিল মানুষের এক বড় ভরসা। কম যত্নে, অল্প সময়ে এবং অনাবাদি জমিতেও এই ঘাস বেড়ে উঠত। খাদ্যসংকট বা দুর্ভিক্ষের সময় শর্করার বিকল্প উৎস হিসেবে নেপিয়ার ঘাস ব্যবহারের চিন্তাই জন্ম দিয়েছিল এক অভিনব লোকপ্রযুক্তির।নেপিয়ার ঘাস থেকে গুড় তৈরির পদ্ধতিও ছিল আখের গুড়ের মতোই, তবে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। পরিণত নেপিয়ার ঘাস কেটে ছোট ছোট টুকরো করে, ঘানিতে পিষে তার রস বের করা হত। সেই রস ছেঁকে বড় কড়াইয়ে দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়া হত। ফুটতে ফুটতে রসের ওপর যে ময়লা বা কালচে অংশ ভেসে উঠত, তা সরাতে ব্যবহার করা হত চুনের জল বা কিছু বনজ উপাদান। দীর্ঘ সময় জ্বাল দেওয়ার ফলে রস ঘন হয়ে এলে তা নামিয়ে ছাঁচে ঢালা হত। ঠান্ডা হলে সেই ঘন রস শক্ত হয়ে গুড়ের আকার নিত। স্বাদে ও গন্ধে এই গুড় আখের গুড়ের মতো সুগন্ধি না হলেও, এটি ছিল কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য শর্করার উৎস। নেপিয়ার ঘাস থেকে গুড় তৈরির পদ্ধতিটি নিঃসন্দেহে অভিনব, কারণ এটি বাংলার প্রচলিত গুড় উৎপাদনের ধারার বাইরে গিয়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্ভিদকে শর্করার উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ঐতিহাসিকভাবে বাংলায় গুড় বলতে আখ বা খেজুরনির্ভর উৎপাদনকেই বোঝানো হত। সেই প্রেক্ষিতে এক ধরনের ঘাসের কাণ্ডে সঞ্চিত রস থেকে গুড় তৈরি করার ভাবনাই ছিল ব্যতিক্রমী। এই ধারণা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিবিদ্যা বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের লোকজ অভিজ্ঞতা ও সংকটকালীন প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া জ্ঞান। আখের চাষ যেখানে অনিশ্চিত হয়ে পড়ত, সেখানে নেপিয়ার ঘাসের মতো দ্রুতবর্ধনশীল ও কম যত্নসাধ্য উদ্ভিদকে কাজে লাগানো ছিল গ্রামীণ সমাজের সৃজনশীল অভিযোজনের স্পষ্ট নিদর্শন।এই অভিনবত্ব আরও স্পষ্ট হয় প্রযুক্তিগত দিক থেকে। নেপিয়ার ঘাস থেকে গুড় তৈরিতে নতুন কোনো যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করা হয়নি। বরং আখের গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত ঘানি, কড়াই ও ছাঁকনির মতো পরিচিত সরঞ্জামকে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন কাঁচামালের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে একই প্রযুক্তি ভিন্ন উপাদানের ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হয়ে ওঠে।

উত্তর ২৪ পরগণার সুখচরে প্রথম এই ঘাস থেকে গুড় তৈরি হয়েছিল। সেই চরের তীরে বসতে শুরু করেছিল গুড়ের হাট। সেই সুখচরে দেখাদেখি বর্তমান নৈহাটির গরিফা জুটমিলের সন্নিকটে বসতে শুরু করল অস্থায়ী গুড়ের হাট। লোকে নাম দিল নতুন হাট। এই হাটে যেমন আখ, খেজুর গুড় পাওয়া যেত তেমনি নেপিয়ার ঘাস থেকে তৈরি গুড়ও পাওয়া যেত। ধীরে ধীরে এই হাট জনপ্রিয় হতে শুরু করল। দূরদূরান্ত থেকে গুড়ের মহাজনরা এই হাটে এসে গুড়ের কদর করতে লাগল। তখন এই চরের নাম ছিল মাঝিপাড়া। এখানে সপ্তাহে দু'দিন হাট বসলেও, এই হাটের কদর বাড়তে থাকে অন্য কারণে। এই মাঝিপাড়া ঘাটে বেশ কয়েকটি ভাটিখানা ছিল। সেই ভাটিখানায় মদ তৈরিতে গুড়ের প্রয়োজন বাড়তে থাকল। ফলে একটি ব্যবসার স্বার্থে, অন্য ব্যবসা লাভজনক হতে শুরু করল। লোকের ভিড় বাড়ল। গুড় কিনতে আসা মহাজনেরা এখানে দু'একদিনের জন্য তাঁবু ফেলল। গুড়, মদ দুটোই বিক্রি হতে শুরু করল। ভাগীরথী নদী ছিল উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলার প্রধান অর্থনৈতিক পথ। সুখচর ও মাঝিপাড়ার চরে উৎপাদিত আখ, খেজুর এবং নেপিয়ার ঘাসের গুড় নৌকো করে নিয়মিত পৌঁছে যেত কলকাতায়। সেই সময় কলকাতা শুধু প্রশাসনিক রাজধানী নয়, ছিল পূর্ব ভারতের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার ও আন্তর্জাতিক বন্দর। ফলে নৈহাটির গুড় শহরের বাজারে ঢুকেই বৃহত্তর বাণিজ্যচক্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ত।

কলকাতার বাজারে এই গুড়ের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু মিষ্টান্নকারদের দোকানে। শহর ও শহরতলির অসংখ্য ভাটিখানা, দেশি মদ প্রস্তুতকারক এবং খাদ্যসংরক্ষণকেন্দ্রে গুড় ছিল অপরিহার্য কাঁচামাল। কলকাতা থেকে এই গুড় নদী ও রেলপথে ছড়িয়ে পড়ত হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ ও মদ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা এই পণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। এই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পাশাপাশি নৈহাটির গুড় পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিল ঔপনিবেশিক বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও।
সেই সময়ে সুখচরে ধীরে ধীরে চিনির উৎপাদন শুরু হতে থাকল। চিনির কারখানা গড়ে উঠতে লাগল। অন্যদিকে নৈহাটির গরিফা অঞ্চলে গুড়ের হাট জনপ্রিয় হতে শুরু করল। সেই হাট পূর্ব এবং পশ্চিমে আরও বিস্তার লাভ করল। শোনা যায়, প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে ছিল সেই হাটের বিস্তার। উত্তরে ভট্টপল্লী এবং দক্ষিণে কুমারহট্ট। মাঝে নতুন হাট। সেই হাটে দুজন নামকরা মহাজন ছিলেন। একজন রামচন্দ্র শেঠ এবং অন্যজন রাজিব ঘোষ। প্রসঙ্গত এই রামচন্দ্র শেঠ নতুন হাটের উত্তররণের অন্যতম কাণ্ডারি। শুধু তাই নয়, গঙ্গার তীরে পাটশিল্পের বিস্তার লাভের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। তিনিই প্রথম ইংরেজদের মাথায় বুদ্ধি দিয়েছিলেন যে গঙ্গার তীরে পাটশিল্প ব্যবসার নতুন দিগন্ত হবে। তিনিই প্রথম ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন যে গঙ্গার পার ধরে পাটশিল্প গোটা বাংলার মানচিত্রকে বদলে দিতে পারে। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে নৈহাটি পৌরসভার স্বীকৃতি পাওয়ার পর মাঝিপাড়া অঞ্চলে গুড়কে কেন্দ্র করে নতুন হাট গড়ে ওঠে এবং ১৮৭৫–১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কাল জুড়ে এই হাট নৈহাটির আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তবে ১৯০০–১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ জুড়ে গঙ্গাতীরবর্তী চিনির কারখানার বিস্তার, আবগারি নীতির পরিবর্তন ও শিল্পভিত্তিক চিনির প্রভাব, পাট শিল্পের কারখানা গড়ে ওঠার ফলে গুড়ের বাজার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং নতুন হাট ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় নেপিয়ার নামক ঘাস থেকে গুড় তৈরির পদ্ধতি। সেই সময় এই পদ্ধতি ছিল এক অভিনব আবিষ্কার। তবুও সেই অভিনব প্রথা কোনওদিন প্রচারের আলোয় আসেনি। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষের আখড়া ছিল নতুন হাট। সেই হাটের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভাগীরথী। রেখে গিয়েছে কত কত অজানা ইতিহাসের সূচী।

ট্যাগসূচী:#Naihati
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev