অফিস প্রেমে নৈব নৈব চ! এমনই উপদেশ দিতেন বন্ধুস্থানীয় গুরুজনেরা। তবে অফিস প্রেমের অন্য রোমাঞ্চ আছে। সকলের চোখ এড়িয়ে দুই সহকর্মীর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, কথা বলা, একে অন্যের জন্য টিফিন নিয়ে আসা, একই অফিসে থেকে একে অন্যকে মেসেজ করা, ইত্যাদি বিষয়গুলোর মধ্যে চূড়ান্ত ছেলেমানুষি লুকিয়ে আছে। দিনশেষে একরাশ ভাললাগা আছে। কিন্তু ভারতে কর্মস্থলে প্রেম কতটা উপযুক্ত এবং সুদূরপ্রসারী সেই নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ছিল, আছে এবং থাকবে। সহকর্মীর প্রেমে পড়লে কাজের ক্ষতি হয়, এই অভিযোগ করেন কিছু বিশেষজ্ঞরা। আবার সহকর্মীর প্রেমে পড়লে নাকি অফিসে আসার প্রবণতা বাড়ে। সঠিক সময়ের কাজ সঠিক সময়ে হয়ে যায় এমনও মনে করেন জ্ঞানীব্যক্তিগণ। সম্প্রতি একটি চমকে দেওয়ার মতো রিপোর্ট সামনে এসেছে। অফিস প্রেমের ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের ১১টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। প্রায় ৪০% ভারতীয়রা জানিয়েছেন যে তারা সহকর্মীর সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন বা কখনও জড়িয়েছিলেন।
অফিস প্রেম মোটেও আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়। শিল্পবিপ্লবের সময় থেকেই এই অফিস প্রেমের ইতিহাস শুরু। যখন মানুষ প্রথমবার কৃষিকাজ বা ঘরোয়া ব্যবসার বাইরে বড় কারখানা, ব্যাংক, প্রশাসনিক দপ্তর ইত্যাদিতে একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করল, তখনই পুরুষ ও নারী দীর্ঘসময় পাশাপাশি থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই সম্পর্কের তৈরি হল। টাইপরাইটারের যুগে নারী টাইপিস্ট এবং সেক্রেটারিদের অফিসে প্রবেশ অফিস রোম্যান্সকে আরও প্রভাবিত করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নারীদের ব্যাপকভাবে কর্মজগতে অংশগ্রহণ অফিস রোম্যান্সকে এক নতুন দিশা দিয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শেষে কর্পোরেট কালচার, কিউবিকল অফিস, টিমওয়ার্ক আর অফিস ট্যুর, অফিস প্রেমকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলে। ২০১০-এর পর মেট্রো শহরের ব্যস্ত জীবন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও সীমিত সামাজিক মেলামেশা অফিস সহকর্মীদেরই প্রিয় বন্ধুর পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু ভারতীয় কর্মসংস্কৃতি বরাবরই গোলমেলে। বিভিন্ন সমীক্ষায় ভারতীয় কর্মসংস্কৃতির পরিবেশ ক্রশম নীচের দিকে থাকে। প্রধানত নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কাজ করার রীতি এদেশে প্রাচীন। সেই রীতি মেনে প্রায় সারাদিনই অফিসের কোনও সহকর্মীর সঙ্গে যে সখ্যতা গড়ে উঠে, সেই সখ্যতাই ক্রশম বন্ধুত্ব এবং প্রেমের দিকে নিয়ে যায়।
অফিসে সহকর্মীর সঙ্গে প্রেম এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের জায়গা। একদিকে একই পরিবেশে কাজ করার কারণে বোঝাপড়া, সাপোর্ট, মোটিভেশন সবই বাড়ে। অন্যদিকে পেশাদার সীমারেখা ভেঙে গেলে কাজের উপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। একই জায়গায় কাজ করার সুবিধা হল দু'জনই একই চাপ, টার্গেট, অফিস পলিটিক্স বোঝে। ফলে সম্পর্ক আরও গভীর হয়, টিমওয়ার্ক অনেক সময় মসৃণ হয় আর একে অন্যের উপস্থিতি কাজের পরিবেশকে হালকা করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে স্ট্রেস কমে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে, এমনকি দু'জনই ভাল পারফর্ম করতে একে অন্যকে সাহায্য করে । কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তিগত আবেগ অফিসের কাজকে ছাপিয়ে যেতে থাকে। সামান্য মনোমালিন্য বা ঝগড়াও কাজের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। সহকর্মীরা অনেক সময় পক্ষপাতের সন্দেহ করে। এতে অফিসে ভুল বোঝাবুঝি এবং অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত কাজের মান কমিয়ে দেয়। আরও বড় ঝুঁকি হল সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া।ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে গেলে প্রতিদিন একই অফিসে মুখোমুখি হওয়া কর্মক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।
একটি জনপ্রিয় সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, প্রায় ৩৬% ভারতীয় কর্মী একই অফিস বা একই কোম্পানির কারও সঙ্গে ডেট করেছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৩৭% শেষ পর্যন্ত বিয়েও করেছেন অর্থাৎ অফিস রোমান্সের একটি বড় অংশ স্থায়ী সম্পর্কে পরিণত হয়। একই সঙ্গে দেখা যায়, যারা অফিসে প্রেম করেন, তাদের ৭১% সম্পর্কটা গোপন রাখেন, কারণ অফিস পলিটিক্স ও সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝির ভয় থাকে। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০–২৫% অফিস রোমান্স ব্রেকআপে শেষ হয়। অফিস প্রেমে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে, তা আদতে ভারতীয় কর্মসংস্কৃতি ও শহুরে জীবনের এক নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। দেশের তরুণ কর্মশক্তি, যারা এখন কর্পোরেট দুনিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি তারা দিনের বেশিরভাগ সময় অফিসেই থাকে। শহুরে জীবনে পরিবার থেকে দূরে থাকা, ক্রমবর্ধমান একাকিত্ব, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানোর অভাব এইসব কারণেও অনেকেই অফিসের মানুষকেই সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। সেই সম্পর্ক ডেটিং, প্রেম, বিবাহ পর্যন্ত চলছে। এইরকম উদাহরণ আগেও ছিল। অফিসের সহকর্মীকে বিয়ে করে সুখে আছেন অনেকে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, দীর্ঘক্ষণ অফিসে থাকার ফলে ব্যক্তিগত জীবনের দৈর্ঘ্য ছোট হচ্ছে। পরিসর কমছে। তাই অফিসের মধ্যেই একটা অন্য দুনিয়া তৈরি হচ্ছে। যে দুনিয়ায় বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালবাসা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে উঠছে। যার ফলে অফিস প্রেমের সারা বিশ্বের তালিকায় ভারত দ্বিতীয়। আমাদের কর্মসংস্কৃতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ব্যক্তিগত জীবনের সময়টুকু নেই। কাজ, কাজ আর কাজ। নিয়ম বহির্ভূত কাজ। সময়ের বাইরে কাজ, ছুটির দিনে কাজ। আমরা একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরছি। সেই বৃত্তের বাইরে বেরোতে পারছি না। ভারতে অফিস প্রেম বাড়ছে সেই বিষয়ে তর্ক না করে আমাদের উচিত এটা ভাবার কেন অফিস প্রেম বাড়ছে? কেন আমাদের কর্মসংস্কৃতি আমাদের ব্যক্তিগত সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে?ভাবার সময় এসেছে। ভাবতে হবে আমাদেরই।