ঠাকুরনগর স্টেশনের দু'নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে বেড়িয়ে সিঁড়ির মুখে অপেক্ষারত যাত্রীরা কেউ কেউ চা, সিগারেট, বিড়ি খেতেন। কেউ আবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে হাল্কা হতেন। এইরকম এক শ্রাবণের দুপুরে ঠাকুরনগর স্টেশনে বইয়ের দোকানের পাশে আড্ডা দিচ্ছেন বিনয় মজুমদার।পাশে বসে শিবেন মজুমদার। বিনয় মজুমদার লক্ষ্য করলেন এক ব্যক্তি বেশ তাড়াহুড়ো করে এসে ওই সিঁড়ির পাশে মূত্র বিসর্জন করলেন। তারপরই একটু স্থির হয়ে কিছু ভাবলেন। উৎসুক গলায় শিবেন মজুমদারকে বললেন যে খাতা পেন নিয়ে আসতে। পাল্টা প্রশ্ন করতে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, মূত্রের বেগ, ভেলোসিটি ইত্যাদি খাতায় কলমে কষে দেখবেন। অর্থাৎ মূত্র বিসর্জনের সমীকরণ তৈরি করবেন। তবে আশ্চর্য হওয়ার ঘটনা ঘটে সেই দিন সন্ধেতে। বিকেল থেকেই শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই শিবেন মজুমদারের বাড়ি এসে কাঁপতে কাঁপতে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, ' আরে ভাই জলদি সেই কাগজ দাও। ওখানে সমীকরণটা ভুল করেছিলাম।' অঙ্কের বাইরে বাকি সব ছিল তাঁর কাছে বিলাসিতা।
ইঞ্জিয়ারিং পড়ার সময়েই লিখে ফেলেছিলেন তিনটে গণিতের বই। রুট অফ ক্যালকুলাস, জিওমেট্রিকাল অ্যানালিসিস এবং ইনটারপোলেশন সিরিজ। এই তিনটি বই টাইপ করে জমা দিয়ে এসেছিলেন ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে। কবিতীর্থ পত্রিকায় একজন অঙ্কের অধ্যাপক ন্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে সেই বইয়ের কিছু অংশ তুলে দাবি করেন, এ এক অভিনব আবিষ্কার। তিনি যদি কখনও সিলেবাস কমিটির সদস্য হতেন তাহলে এই ফর্মুলা অবশ্যই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতেন। লগারিদম শেখাতে শেখাতে তিনি একদিন দাবি করেছিলেন যে নিউটনের মতো তাঁর একটি চার্ট আছে, সেই চার্টের নাম বিনয় চার্ট। কোনও একটি অঙ্ক যদি নিউটনের চার্ট ধরে করলে যে উত্তর আসবে, তাঁর বিনয় চার্ট ধরে করলেও একই উত্তর আসবে। মজা করে তিনি বলতেন অঙ্কের সূত্র যে তৈরি করে, তার পাশে আবিষ্কারের নাম থাকে না। তাই তো তিনি বাধ্য হয়ে কবিতা লেখেন। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত বিনয় মজুমদারের 'আমিই গণিতের শূন্য' কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে এক সেরা সংযোজন। 'মনা আজ এসেছিল আমার কাছে' শিরোনামে একটি কবিতায় তিনি 'মোনালিসা' খ্যাত লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেছেন। কারণ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং বিনয় মজুমদার দু'জনেই কৃতী ইঞ্জিনিয়ার এবং গণিত আবিষ্কর্তা। কবি বিনয় মজুমদার ১৬টি মৌলিক উপপাদ্য রচনা করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কাব্যগ্রন্থ 'ফিরে এসো, চাকা' (১৯৬২), বাংলা সাহিত্যের প্রথম গাণিতিক পদ্য বই । এটি মূলত এক ধারাবাহিক ডায়েরি-ভিত্তিক কবিতা, যেখানে প্রতিটি কবিতা সংখ্যাবদ্ধ ও ধারাবাহিক। বিনয় মজুমদারের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর কাব্যে গণিতের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি। তিনি অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে শুধু আবেগঘন ভাষায় প্রকাশ করেননি, বরং তাদেরকে গণিতের সূত্র, উপপাদ্য ও তত্ত্বের গঠনে সাজিয়েছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা মানসিক দ্বন্দ্বকে তিনি অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন তা একটি বিশেষ সমস্যা থেকে সাধারণ সমস্যা হয়ে সূত্র বা উপপাদ্যে রূপ নিচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম অনুভূতিকেও তিনি সাধারণীকরণ করে সর্বজনীন সত্যে উন্নীত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর কবিতায় শব্দ কেবল শব্দ নয়, হয়ে ওঠে প্রতীক বা সমীকরণের উপাদান। ফলে পাঠকের কাছে তাঁর কবিতা নিছক আবেগ প্রকাশ নয়, বরং যুক্তি ও বিশ্লেষণের এক বিশেষ রূপ, যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগতও এবং সর্বজনীনও। 'ফিরে এসো, চাকা', 'অঘ্রানের অনুভূতিমালা', 'আমার ঈশ্বরীকে', 'নক্ষত্রের আলো', 'কবিতা বুঝিনি আমি', 'আমিই গণিতের শূন্য', ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা মানুষদের বক্তব্য অনুযায়ী তিনি ছিলেন গণিতের ঈশ্বর। অঙ্ক দেখা মাত্রই সমাধান করে দিতে পারতেন। বাড়ির দেওয়ালে কাঠ কয়লা দিয়ে কষতেন অঙ্ক।
একদিন টেস্ট পেপারের তিনটি অঙ্ক কিছুতেই মেলাতে পারছিলেন না শিবেন মজুমদার। তিনটি অঙ্ক রেখে দিলেন বিনয় মজুমদারের জন্য। সেদিন দুপুরে চা, অমলেট খেতে খেতে শিবেন মজুমদার তিনটে অঙ্কের বিষয়ে বললেন। একটু গম্ভীর হয়ে তিনটে অঙ্ক শুধু পড়লেন। তারপরে আয়েশ করে সিগারেটে সুখটান দিয়ে তিনটে অঙ্কের উত্তর বলে দিলেন। শিবেন মজুমদার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে। তারপরে প্রতিটা অঙ্ককে ধাপে ধাপে ভেঙে বোঝালেন এবং কষতে বললেন শিবেনকে। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল। সঙ্গে ছিল প্রখর বিশ্লেষণ ক্ষমতা। অঙ্ক দেখা মাত্রই মাথার মধ্যে কষে ফেলতেন। সহজেই বের করে দিতেন উত্তর। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বিনয় মজুমদার। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কোচিং সেন্টার ছিল। সেখানে তিনি ইংরেজি পড়াতেন। সেই কোচিং সেন্টারে বিনয় মজুমদারকে অঙ্ক শেখানোর জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন শক্তি। সেই প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করেন তিনি। একদিন গিয়েছিলেন সেখানে অঙ্ক শেখাতে। তারপরের দিন থেকে সেই কোচিং সেন্টারে আর কেউ অঙ্ক শিখতে আসেনি। এই রহস্যের কিনারা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেনি।

