'শ্ৰীযুক্ত শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ মহাশয়
শ্রীচরণেষু
'সংস্কৃত মহাসিন্ধুর অকূলে বসে এইসামান্য বিন্দুকে সাহিত্যে উপস্থিতকরা আমার পক্ষে অতি দুঃসাহসের কাজ হয়েছে। আপনার মত সংস্কৃত সিন্ধু বিশারদ থাকতে এই কাজ আমার, মনকে প্রতি মুহুর্তে সঙ্কুচিত করছে।তথাপি আমার এই সামান্য রচনা আপনার পাদস্পর্শে ধন্য হোক,এই প্রার্থনা।' শাম্ব উপন্যাসের শুরুটা হয়েছিল এইভাবেই। ঘটনাচক্রে সমরেশ বসুর ছোট ছেলে উদিত বসু কথা প্রসঙ্গে বললেন, ' বাবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। তিনি যখন সমরেশ হয়ে লিখছেন, তখন তাঁর বসার ধরণ, লেখার ধরণ, দূরে চেয়ে থাকা দৃষ্টি এক রকম। আবার সেই মানুষটাই যখন পরক্ষণে কালকূট হয়ে লিখছেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ অন্যরকম। তখন তিনি পুরো অন্য সত্তা হয়ে যেতেন। তাঁর বসার ভঙ্গি দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেতাম'। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সমরেশ বসু এক এমন কালপুরুষ, যে নক্ষত্রের সামনে দুহাত তুলে দাঁড়ানো যায়। গভীর এক শূন্যতা ভিড় করে। জড়িয়ে ধরে অজস্র জলরাশি। সমরেশ যখন কালকূট হয়ে ওঠেন, তিনি তখন ফেলে আসেন সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষটিকে। তিনি তখন জীবনপুরের পথিক হয়ে ওঠেন, জীবনশিকারি হয়ে ওঠে তার একমাত্র পরিচয়। যে পথিক আমাদের নিয়ে যায় দিকশূন্যপুরে। ফেলে দেওয়া খড়কুটো থেকে তুলে আনেন মুক্ত। তৈরি করেন কালজয়ী উপন্যাস, শাম্ব। শাম্ব লিখতে গিয়ে তিনি শ্রীজিব ন্যায়তীর্থের সঙ্গ করেছিলেন। ততদিনে বাংলার মহাকাশে শ্রীজিব ন্যায়তীর্থ এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। সেই জ্যোতিষ্কের পদতলে বসে তিনি সৃষ্টি করলেন এমন এক মহাকাব্য যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহীরুহ হয়ে রইল।
ভারতীয় সাহিত্যে পুরাণ কেবল ধর্মীয় আখ্যান নয়, মানবসভ্যতার চিরন্তন অভিজ্ঞতার এক প্রতীকী ভাণ্ডার। যুগে যুগে সাহিত্যিকেরা এই পুরাণকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন, তাঁদের সময়ের বাস্তবতা ও সংকটকে প্রকাশ করার জন্য। কারণ পুরাণের চরিত্র ও ঘটনাগুলির মধ্যে এমন এক সার্বজনীনতা রয়েছে, যা যে কোনও যুগের মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। কালকূট ছদ্মনামে রচিত তাঁর শাম্ব উপন্যাসে এই পুরাণকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্নির্মাণ করেছেন। একটি প্রায় বিস্মৃত পুরাণচরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক মানুষের হতাশা, আত্মসংগ্রাম এবং পুনর্জাগরণের কাহিনি।মহাভারতের মূল আখ্যান অনুযায়ী, শাম্ব হলেন কৃষ্ণের পুত্র, যার ভূমিকা সেখানে অত্যন্ত সীমিত। তিনি মূলত একটি অভিশাপের ফলে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হন এবং সেই ঘটনাই তাঁর পরিচয়ের প্রধান দিক হয়ে ওঠে। কিন্তু কালকূট এই সামান্য চরিত্রটিকেই নতুন অর্থ ও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর উপন্যাসে শাম্ব আর কেবল পুরাণের চরিত্র নন, বরং তিনি হয়ে ওঠেন একজন সংগ্রামী মানুষ, যিনি নিজের ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এই পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন, মানুষ তার সীমাবদ্ধতা ও যন্ত্রণা সত্ত্বেও নিজের শক্তিতেই পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে। কালকূটকে এই ধারণা গড়তে সাহায্য করেছিলেন শ্রীজিব ন্যায়তীর্থ মহাশয়।বহুবিশিষ্ট মানুষের বর্ণনা অনুসারে, ১৯৬৮ সালের দিকে প্রায়ই সন্ধের সময় সমরেশ আসতেন ন্যায়তীর্থ মহাশয়ের কাছে। মাটিতে মাদুর পেতে বসতেন। শুনতেন মহাজ্ঞানীর থেকে পুরাণের কথা। সেই সময়ই ন্যায়তীর্থ মহাশয় শাম্ব উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে এক অদ্ভুত জীবনের গল্প ভাবতে সাহায্য করেন যা পরবর্তীতে কালকূট লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
কালকূটের উপন্যাসে শাম্বের কুষ্ঠরোগ কেবল একটি শারীরিক ব্যাধি নয় বরং একটি গভীর প্রতীক। এই রোগ মানুষের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপমান এবং মানসিক ভাঙনের প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হয়। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে শাম্ব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, কিন্তু তিনি এই অবস্থাকে মেনে নেন না। বরং শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ আত্মঅনুসন্ধান ও আত্মসংগ্রামের পথচলা। সূর্যদেবের আরাধনার উদ্দেশ্যে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা আসলে নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কারের এক প্রতীকী প্রচেষ্টা। এই যাত্রা কেবল রোগমুক্তির জন্য নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক গভীর মানসিক প্রক্রিয়া।এই উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেবতাদের মানবিক রূপায়ণ। কালকূট দেবতাদের অলৌকিক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখাননি, বরং তাঁদেরও মানুষের মতো দুর্বলতা, ক্রোধ ও ঈর্ষার দ্বারা প্রভাবিত হতে দেখিয়েছেন। কৃষ্ণের অভিশাপ কিংবা নারদের ষড়যন্ত্র,এসব ঘটনাকে লেখক এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে দেবতাদেরও মানুষের মতো আবেগপ্রবণ ও সীমাবদ্ধ সত্তা হিসেবে মনে হয়। এর ফলে পুরাণের চরিত্রগুলি এক নতুন বাস্তবতা লাভ করে এবং পাঠকের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। ন্যায়তীর্থ মহাশয় তাঁকে বারবার এই মন্ত্রেই দীক্ষা দিয়েছেন যে, কী করে পুরাণের চরিত্রগুলোকে বাস্তবের চরিত্রের সঙ্গে মেলানো যায়। সেই মন্ত্রসফলও হয়েছে। কালকূট মিলিয়ে দিয়েছেন জীবনের চিত্রপট। শাম্বের চরিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি। তিনি কেবল নিজের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেন না, বরং তাঁর মতো অন্যান্য রোগীদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করেন। তাঁর এই মানসিক দৃঢ়তা এবং মানবিকতা তাঁকে এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করে। এই চরিত্রের মাধ্যমে লেখক দেখাতে চেয়েছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজের মনোবল এবং বিশ্বাস। সমাজের অবহেলা, শারীরিক দুর্বলতা কিংবা ভাগ্যের নির্মমতা,কোনও কিছুই মানুষের আত্মশক্তিকে পরাজিত করতে পারে না, যদি সে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে।কালকূটের শাম্ব উপন্যাস আসলে পুরাণের পুনর্কথন নয়, বরং পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা। এখানে পুরাণকে ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক মানুষের অস্তিত্বসংকট ও আত্মসংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। শাম্বের চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও নতুন আলো খুঁজে পেতে পারে। এই উপন্যাস তাই কেবল একটি পুরাণভিত্তিক কাহিনি নয়, বরং এটি মানুষের অদম্য আত্মশক্তি, বিশ্বাস এবং পুনর্জন্মের এক চিরন্তন কাহিনি।এইভাবে কালকূট পুরাণের এক উপেক্ষিত চরিত্রকে আধুনিক সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করে তাকে এক সার্বজনীন মানবিক প্রতীকে পরিণত করেছেন। তাঁর শাম্ব উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনে সংগ্রাম অনিবার্য, কিন্তু সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন শক্তি এবং নতুন জীবন।


