ফুনাম্বুলাস পামারাম। আমরা এই প্রাণীটিকে কাঠবিড়ালি বলে ডাকি। গায়ে ডোরাকাটা দাগ, সামনের দাঁতটা একটু বেরিয়ে থাকে। বেশ দুরন্ত গতিতে ছুটে যায় এই ছাদ থেকে অন্য ছাদে। এক ডাল থেকে অন্য ডালে। লাইটের তার বেয়ে হুশ করে ছুটে যায় দিকশূন্যপুরে। রামায়নে লঙ্কা অভিযানের সময় রামসেতু নির্মাণে যখন বানরসেনা বিশাল পাথর বহন করছিল, তখন একটি ছোট কাঠবিড়ালি সমুদ্রতীরে বালুকণা মুখে করে এনে সেতু নির্মাণে সাহায্য করছিল। তার সামান্য কিন্তু নিষ্ঠাবান প্রচেষ্টা দেখে শ্রীরাম মুগ্ধ হন এবং স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দেন কাঠবিড়ালির পিঠে। লোককথা অনুসারে, সেই আশীর্বাদের ছাপ হিসেবেই আজও কাঠবিড়ালির শরীরে লম্বালম্বি ডোরার দাগ দেখা যায়। কিন্তু ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কাঠবিড়ালি। দিনে দিনে তারা অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য। আমাদের প্রতিনিয়ত বড় বড় সমস্যার মাঝে, কাঠবিড়ালির সংখ্যা কমে যাওয়া আদতে আরও বড় সমস্যার সূচনা মাত্র।
ভারতে কাঠবিড়ালির বৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বর্তমান গবেষণা অনুযায়ী, সারা ভারতে প্রায় ৫০–৫৫ প্রজাতির কাঠবিড়ালি পাওয়া যায়। এই প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে গাছে বসবাসকরা কাঠবিড়ালি, মাটিতে বসবাসকারী পাম স্কুইরেল এবং উড়ন্ত কাঠবিড়ালি। সবচেয়ে পরিচিত ডোরাকাটা পাম স্কুইরেল দেখা যায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে। আবার বিশালাকৃতির ইন্ডিয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের মতো প্রজাতি পাওয়া যায় পশ্চিমঘাটের গভীর অরণ্যে। উত্তর-পূর্ব ভারত ও হিমালয় অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে উড়ন্ত কাঠবিড়ালির সবচেয়ে বেশি প্রজাতি বাস করে। তবে বিভিন্ন সমীক্ষা, বন দফতরের পর্যবেক্ষণ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচারের মূল্যায়ন মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। গত ৩০–৪০ বছরে বননির্ভর বহু কাঠবিড়ালি প্রজাতির জনসংখ্যা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে উড়ন্ত কাঠবিড়ালি ও বড় গাছবাসী প্রজাতিগুলোর ক্ষেত্রে পতন সবচেয়ে বেশি, কারণ এরা ঘন বনাঞ্চল ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। বর্তমানে ভারতে পাওয়া কাঠবিড়ালি প্রজাতির প্রায় ২৫ শতাংশই বিপন্নপ্রায়। উত্তর-পূর্ব ভারত ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলে কয়েকটি প্রজাতির সংখ্যা কিছু এলাকায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে, শহর ও গ্রামাঞ্চলে পরিচিত পাম স্কুইরেলও ঝুঁকির মুখে। তাদের ঘনত্ব ব্যাপক হারে কমেছে।
কাঠবিড়ালি আকারে ছোট হলেও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মূলত বীজ বিস্তারের মাধ্যমে বনভূমির স্বাভাবিক পুনর্জন্মে সহায়তা করে। খাবারের প্রয়োজনে কাঠবিড়ালি বাদাম, ফল ও বীজ সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় মাটির নিচে বা গাছের ফাঁকে লুকিয়ে রাখে। সব বীজ তারা আবার খুঁজে পায় না। যেসব বীজ পড়ে থাকে সেখান থেকেই নতুন গাছ জন্মায়। এই প্রক্রিয়া বনকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মাটিতে গর্ত করার ফলে মাটি আলগা হয়, জল ও বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং মাটির উর্বরতা বজায় থাকে। শুধু তাই নয়, খাদ্যশৃঙ্খলের দিক থেকেও কাঠবিড়ালি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা নিজে বীজ ও পোকামাকড় খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কাঠবিড়ালি পেঁচা, সাপ, শিয়াল, বন্যবিড়াল ও শিকারি পাখির খাদ্য হিসেবে কাজ করে। ফলে কাঠবিড়ালির সংখ্যা কমে গেলে শিকার–শিকারির খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্যহীনতা দেখা যাবে। একই সঙ্গে কাঠবিড়ালি একটি এলাকার পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তাদের উপস্থিতি মানে গাছ, খাদ্য ও বাসস্থানের সুস্থ অবস্থান।


