আর কতগুলো রোদ পেরোলে তোমার দেখা পাওয়া যাবে? পেঁজা তুলোর মেঘ সারি বাঁধছে, ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ পড়তে শুরু করেছে। আর কয়েকটা দিন, তারপরেই আমাদের দেখা হবে। তেপান্তরে ভোরের প্রথম আলো মিশে যাবে। কত বাগান ভিজিয়ে দেবে প্রথম শিশিরের স্পর্শ, আলতো উষ্ণতা গায়ে মেখে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে জানলার ধারে এসে দাঁড়াব, উত্তুরে হাওয়ার দল মিছিল করে ধেয়ে আসবে। তারপরে ধীরে ধীরে ছাদে দাঁড়াবে রোদ, নীল আকাশের দিকে তাকাতেই চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। অদৃশ্য ভাললাগা জড়িয়ে ধরবে আমাদের। দুটো আলাদা দেশ অথচ একই রোদ। রোদের জন্মদিন কবে?তোমাকে বহুবার জিজ্ঞাসা করেছি, তুমি উদাসী মেয়ের মতো তাকিয়েছো আকাশের দিকে।
তোমার আর আমার আকাশ এক নয়, তবুও প্লেন উড়ে গেলে মনে হয় আমাদের আকাশ এক। এই রোদ এক। তোমার জানলার বাইরে বিরাট জঙ্গল। সেই জঙ্গলের পথ দিয়ে এঁকেবেঁকে যাও রোজ। আলোর পথ বেয়ে হেঁটে যাও দিকশূন্যপুরে। প্রতিদিন এই রোদকেই বলি, তোমার ভাল হোক। এই রোদ তোমাকে কি জানান দেয়? আমাদের দুজনের রোদ কি এক? রোদের জন্মদিন কবে জানো? অফিস ফিরতি পথে ইদানীং চোখে পড়ে ব্যস্ততা। নতুন জামাকাপড়ের লট নিয়ে দরাদরি হয় ফুটপাতে। প্যান্ডেল আর বাঁশের প্রস্তুতি জানান দেয় রোদের জন্মদিন আসছে।রোদ উঠবে ঝলমলে। মাইকে গান বাজবে। ঢাকির দল মাতিয়ে দেবে সাতদিন। বাঙালি প্রিয় সাতকাহনে রোদের উপযাপন হবে। আমাদের রোদ তো এক। এক তো? তুমি আবার উদাসী মুখ নিয়ে প্লেনের জানলার দিয়ে বাইরে তাকাবে। রোদ চিড়ে তুমি আসবে একই ছাদের তলায়, মিঠে রোদ গায়ে মেখে আমরা একসঙ্গে অঞ্জলি দেব। সেইদিনই রোদের জন্মদিন।
তুমি অনেকটা অমলকান্তির মতো। যে অমলকান্তি শুধুমাত্র রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। নিয়মের বেড়াজাল তাঁকে বাঁধতে পারেনি। সবাই পড়াশোনা করে কোন লক্ষ্য নিয়ে হয়তো কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউতো উকিল। সবাই পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে কিন্তু অমলকান্তি তার ব্যতিক্রম। সে কোন কিছু হতে চায় না, সে হতে চায় রোদ্দুর। সে হতে চায় কাক ডাকা বিকেলের লাজুক রোদ্দুর। অমলকান্তি আর তুমি এক! একই তোমাদের পথ চলা। জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে জাপটে ধরে বাঁচতে চাওয়ার যে অনাবিল আনন্দ, সেই আনন্দের উৎস আদতে অমলকান্তির ইচ্ছে। কোনও পিছুটান নেই, দ্রুতগামী জীবনের বদন্যতা নেই। শুধু বাঁচতে চাওয়ার যে আনন্দ, সেটাই তো সব।
রোদের জন্মদিন নিয়ে ভাবতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ ছবির কথা বারবার ফিরে আসে। ঠিক যেমন কোনও এক সকাল, যখন হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়ায় এক চিঠি, যার প্রেরক দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে নিরুদ্দেশ। সেই চিঠি থেকে এক অদ্ভুত আলো শুরু হয় আর খুলে যায় অনীলার জীবনের জানলা। চিঠি পাঠিয়েছেন ছোটমামা মনমোহন মিত্র—একজন যাত্রী, যিনি ঘর, আত্মীয়,পরিচয় ফেলে সারা পৃথিবী ঘুরেছেন, ছুটে চলেছেন সেই জীবনের সন্ধানে, যেখানে সভ্যতা পেয়েছে অন্য এক মাত্রা। তাঁর ফিরে আসা কোনো সহজ প্রত্যাবর্তন নয়। এটি আসলে অস্তিত্বের এক অনুরণন, এক আত্মপরিচয়ের খোঁজ। ‘আগন্তুক’ সিনেমার আবহও তেমনই—দুর্গাপুজোর ঠিক পূর্বক্ষণ, যখন শহরের আকাশ ধীরে ধীরে ধুলোমুক্ত হয়, বাতাসে মিশে থাকে কাশফুলের সুগন্ধ, আর জানলার ধারে এসে দাঁড়ায় উষ্ণ, সংবেদনশীল এক রোদ। মনমোহন মিত্রও তেমনই—চেনা অথচ অচেনা, আলো অথচ প্রশ্ন, যিনি সংসারে এসে অজস্র আলো ফেলেন, আবার নিজেই মিশে যান অপার অচেনায়। ‘আগন্তুক’ আসলে সেই রোদের গল্প, যে রোদ হঠাৎ এসে জানালায় পড়ে ঘরকে নতুন করে চিনিয়ে দেয়। সংশয় আর বিশ্বাসের টানাপোড়েনে দীর্ণ পরিবারে তাঁর আগমন যেন আলোর মতো স্বল্পকালের জন্য, অথচ গভীরতার দিক থেকে চিরস্থায়ী।
ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত উৎসব বনেদি বাঙালি পরিবারের দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নির্মিত কালজয়ী ছবি। উৎসবের আনন্দমুখর আবহে পরিবারের চার ভাইবোন এবং তাদের পরিবার জড়ো হয়।সম্পর্কের ভিতরে থাকে ক্লান্তি, অপূর্ণতা, দুঃখবোধ। যেভাবে সকালবেলা জানলা খুললে ঘরের কোণায় জমে থাকা অন্ধকার হঠাৎ হালকা হয়ে যায়, ঠিক সেভাবেই 'উৎসব' সিনেমায় দেখা যায় প্রতিটি চরিত্র, যার যার নিজের দুঃখ নিয়ে এসেছে, তারা আবার ধীরে ধীরে একে অপরের পাশে বসে, একসঙ্গে খায়, কথা বলে, গান গায়। এই উৎসবই রোদের জন্মদিন। সেই রোদ, যা সম্পর্কের ক্লান্তিকে ঝেড়ে ফেলে আবার নতুন করে বাঁচার রসদ দেয়। তাই 'উৎসব' কেবল সিনেমা নয়,এটি একটি ঋতুচক্র, যা বাঙালির মনের ভিতর জমে থাকা মেঘকে সরিয়ে আনন্দের রোদ নামিয়ে আনে।

