বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
ছোটগল্প

মো হ র কু ঞ্জ

আজ রবিবার। মেয়েটির বাড়ির সামনে আলো লাগানোর কাজ চলছে। টুনি লাইটের বেশ কয়েকটি সেট দিয়ে সারা বাড়ি ঘিরে ফেলা হচ্ছে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

২৬ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

মো হ র কু ঞ্জ

মেয়েটা ছাদে এসে দাঁড়াল। শেষ বিকেলের রোদ এসে পড়েছে তাঁর চিবুকে। ধবধবে সাদা মুখে শেষ বিকেলের আলো সোনালী হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ছাদে। ল্যাম্পপোস্টের তার বেয়ে কাঠবিড়ালিটা ছুট্টে চলে গেল অন্যদিকে। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। সামনের নিম গাছের পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে। এখন বসন্ত নয়, তবুও ঝরা পাতার মোহে আছন্ন হয়ে আছে মেয়েটা। ছাদের এককোণে জড়ো করে রাখা হয়েছে বাঁশ। বাগানেও রাখা রয়েছে বাঁশের সারি। কুকুরগুলো সেই বাঁশের উপরে উঠে খেলা করছে। বাগানের একদিকে একটি বড়ো খাঁচায় তিনটে মোরগ। সকাল হলেই তারা ডাক দিয়ে ঘুম ভাঙায় গোটা পাড়ার। মেয়েটার বাড়ির পশ্চিমদিকে একটা বিরাট বাড়ি। সেই বাড়ির গ্রিলের জানলা দিয়ে পলাশ মেয়েটাকে দেখে রোজ। খোঁজ রাখে মেয়েটার সাতকাহনের। ছোটবেলায় মেয়েটা আসত তাদের বাড়ি। সরস্বতী পুজোর দিন। হলুদ শাড়ি পড়ত। তখন কৈশোরের জোনাকিরা শত শত আলো জ্বালাত বুকে। সুগন্ধি ছড়ানো হলুদ শাড়ির কুঁচি ঠিক করত মেয়েটা। মায়ের শাড়ি পড়ার অভ্যেসটা ছোট থেকে রপ্ত করে নেয় মেয়েরা। মায়েদের শাড়িতে মেয়েদের সৌন্দর্য বেড়ে যায় আনায়সে।

গলির মোড়ে আজকেও ভিড় করেছে অবাঙালি ছেলেরা। গোল হয়ে বসে গাঁজা খাওয়া চলছে। সেই ছেলেগুলোর থেকে একটু দূরে গোল হয়ে বসে জুয়া খেলা চলছে। এই গলিতে এটাই রোজনামচা। গলির একদম শেষ বাড়িটা মেয়েটির। বাড়ির সামনের ফলকে বাড়ির নাম লেখা। বেশ বড় পেল্লাই বাড়ি। বাড়ির সামনে বাগান। দক্ষিণ দিক মুখ করে বিরাট ছাদ। সেই ছাদেই বসতে চলে আয়োজন। আর মাত্র কয়েকটা দিন। গতকালই প্যান্ডেলের কাপড় এসে পৌঁছেছে। ধীরে ধীরে আত্মীয়স্বজনও এসে পৌঁছাবে। মেয়েটি উদাসী হয়ে চেয়ে আছে দূরের দিকে। কী ভাবছে সে? ফেলে আসা ছোটবেলার কথা ? আর কিছুদিন পরেই এই বাড়িটা ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে। ছোটবেলার সবকিছু ছেড়ে। এই পাড়া, বাগান, ছাদ, পুরোনো জামার গন্ধ- সবকিছু এক নিমেষে ছেড়ে অন্য একটা বাড়িকে আপন করে নিতে হবে। হাওয়ার তেজ বেড়েছে। সূর্য ঢলেছে পশ্চিমপ্রান্তে। শেষ বিকেলের আলোয় অপরূপ পটভূমিকা তৈরি হয়েছে।

পলাশ পূর্ব দিকের জানলা দিয়ে দেখছে মেয়েটাকে। ছেলেটার প্রতিদিনের অভ্যেস। সে জানে মেয়েটা বাড়িতে থাকলে কখন কী করে। সকাল হলেই বাগানে নিয়ে যায় কুকুরদের। তারপর দক্ষিণ দিকের ঘরে বসে ল্যাপটপে একটানা কাজ করতে করতে বিকেল হয়ে যায়। তারপর কানে হেডফোন গুঁজে ছাদে আনমনে পায়চারি করে সে। আবার ঘরে এসে একটানা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকে। পলাশের এইসব দেখতে ভাল লাগে না। তবুও কীযেন একটা তাকে টেনে নিয়ে যায় মেয়েটির দিকে। ছোট থেকেই মেয়েটির প্রতি অমোঘ টান, তবুও কোনদিন তাকে বলা হয়নি। শুধু তাকে দেখে গিয়েছে পলাশ। পাশাপাশি বাড়িতে থেকেও কোনওদিন কথা বলার চেষ্টা করেনি। শুধু ছোট থেকে বড় হওয়ার দিনগুলো দেখে গিয়েছে সে। মেয়েটি সমাজমাধ্যম থেকে বহু দূরে থাকে। বহু খুঁজেও সে মেয়েটির খোঁজ পাইনি। হয়ত এই যুগেও কেউ কেউ সমাজমাধ্যম থেকে দূরে থাকতে ভালবাসে। দিনশেষে লাইক, শেয়ার, কমেন্টের বাইরের আসল দুনিয়ায় বাঁচতে চাই সে। মেয়েটি আনমনে সারা ছাদে পায়চারি করছে আর মাঝেমাঝে দূরে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ছে। লাল রঙের টিশার্ট আর কালো ট্রাক শুটের প্যান্ট পড়েছে। গলার সরু সোনার চেন। ডান হাতে সোনার ব্রেসলেট। দু’হাতে সদ্য করা মেহেন্দি। মেয়েটি কী ভাবছে? পলাশের মনে প্রশ্ন জাগল। তার নীল জামা ছ’বছরের পুরোনো। সেই জামায় বেশ কিছু ফুটো। বাবার জমানো যা ছিল সেটা প্রায় শেষ। বাবাও নেই এখন। মায়ের পেনশনের দিকে তাকিয়ে থাকে সারামাস। গ্র্যাজুয়েট হয়েও ছেলেটা কোথাও চাকরি পাইনি। দু’একবার কল সেন্টারে কাজ করেছে। কিন্তু ভাল ইংরেজি জানে না বলে সেই চাকরি থাকেনি। এখন শাসক দলের পার্টি অফিসে হিসেব রাখার কাজ করে। মাসে আট হাজার টাকা। মাঝেমধ্যে কবিতা লেখে। দু’একবার সেই কবিতা ছাপা হয়েছে লিটিল ম্যাজাগিনে। কিন্তু এইসব দিয়ে তো জীবন চলবে না। কোনওদিনই লেখাকে পেশা হিসেবে বেছে কেউ সুখে থাকেনি। রবীন্দ্রনাথও না।

দূর থেকে গাঁজার গন্ধ আসছে। মেয়েটা সেই গন্ধ সহ্য করতে না পেরে ছাদ থেকে ঘরে এসে আলো জ্বালাল। সন্ধে হয়ে গিয়েছে। শাঁখের আওয়াজ ভেসে আসছে। এই সময়টা প্রতিদিন হরেন গাঁজা খেতে আসে। নিয়ম করে সে আসে। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, কখনই তার কামাই নেই। গাঁজার গন্ধে বাড়ির জানালা খুলে রাখা দায়। থানা পুলিশ, নেতা মন্ত্রী ধরেও এইসব বন্ধ হয়নি। একবার পলাশ হরেনকে ধমকাতে গিয়ে নিজে বিপদের মুখে পড়েছিল। হরেন পকেট থেকে একটা সরু চাকু নিয়ে গলার কাজে ধরে বলেছিল, ' বাঙ্গালমে হাম শের হে। এহি গার কার রাখ দেঙ্গে।' পুরো ঘটনাটা ছাদ থেকে দেখেছিল কাজু কাকু। মেয়েটির বাড়ির পাশের বাড়ি। কাজু কাকু চুপচাপ ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। মেয়েটাও সেদিন ছাদ থেকে পুরো ঘটনাটা দেখেছিল। সেও একটা বাঁকা হাসি হেসে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ছেলেটির বাড়ির বিপরীতে অশ্রু জেঠুরা থাকে। সেও জানলার ফাঁক দিয়ে সার্কাস দেখার মতো দেখেছিল। স্থানীয় কাউন্সিলর পলাশকে উত্তম মধ্যম ঝেরেছিল হরেনকে ধমকানোর জন্য। তার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে কোনক্রমে চাকরিটা বাঁচিয়েছিল সে। তবুও মেয়েটির প্রতি তাঁর টান একটুও কমেনি।

আজ রবিবার। মেয়েটির বাড়ির সামনে আলো লাগানোর কাজ চলছে। টুনি লাইটের বেশ কয়েকটি সেট দিয়ে সারা বাড়ি ঘিরে ফেলা হচ্ছে। টুনি লাইটের মধ্যে অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। নিমেষে সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিতে পারে। টুনি লাইটের আলো আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। বাড়ির মূল দরজার সামনে একটা গেট করার প্রস্তুতি চলছে। মাঝে আর দুটো দিন, তারপর নাম গোত্র সব বদলে যাবে। অন্য কোনও ছাদে মেয়েটি হেঁটে বেড়াবে, অন্য কোনও জানালার ধারে রোদ আসবে তখন। যে রোদের দোসর হতে পারবে না পলাশ। সে আবার অভ্যেস মতো এসে দাঁড়াবে তার ঘরের পূর্বদিকের জানলায়। মেয়েটি আর থাকবে না। ইচ্ছে করলেও তাকে আর দেখতে পারবে না। পলাশের বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠল। ভালবাসা কি শুধুমাত্র একে অন্যেকে পাওয়াতেই সম্পূর্ণ হয়? ভালবাসা মানে কি একজন অন্যকে প্রস্তাব দেবে এবং তারপরে তাদের সম্মতি হলে সেই সম্পর্কে ভালবাসা বলা হবে ? পলাশ হয়ত এর কোনটাই জানে না। সে শুধু জানে, পরশু দিন থেকে তার জীবনটা কিছুই বদলাবে না। সে আবার আনমনে এসে দাঁড়াবে এই জানলায়। মেয়েটিকে দেখার জন্য উৎসুক হবে। হরেন নিয়ম করে গাঁজা খাবে। সেও সেই ছেঁড়া জামা গায়ে চাপিয়ে একটা ভাল দিনের অপেক্ষা করবে। বারবার ফোন পে খুলে গুণে নেবে শেষ সম্বলটুকু। তারপর নীল সাইকেল চেপে চলে যাবে পার্টি অফিসে। তার জীবনের রোজনামচায় কিছুই পালটাবে না। যারা অভ্যেস পাল্টে ফেলে,তাঁরাই জীবনে এগিয়ে যায়। বাকিরা কোনওদিন এগোতে পারে না। পলাশদের আইবুড়ো ভাত থেকে নিমন্ত্রণ, বৌভাত পর্যন্ত। কিন্তু সে যাবে কিনা এখনও জানে না। তার মনটা হু হু করে ওঠে ভাবলেই যে মেয়েটা চলে যাবে আজীবনের জন্য। সবুজ শার্টটা গায়ে চাপিয়ে বেরোতেই পলাশ দেখল হরেন তাদের পিছনের দরজার সামনে বসে গাঁজা খাচ্ছে। পলাশকে দেখা মাত্র সে মুখটা গম্ভীর করল। কিন্তু পলাশ হঠাৎ করে হরেনের পাশে বসে বলল, ‘ দাও দু’টান মেরে যায়। আমাদের জীবনটা এইভাবেই চলবে।‘ হরেন হআ করে তাকিয়ে থাকল পলাশের দিকে। গাঁজার ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারিপাশ। সে ধোঁয়ার অপরপ্রান্তে জ্বলজ্বল করছে মেয়েটির বাড়ির নাম, মোহরকুঞ্জ।

ট্যাগসূচী:#story#life#love
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev