" আরেকটা বোতল দিয়ে যা শালা!" বুবাই ডাক্তার চেঁচিয়ে বলে উঠল। এই আড্ডাখানা এখন বুবাই ডাক্তারের ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছে। দুশো স্কোয়ারফিট এই ঘরটার চারিদিকে শুধু মদের গন্ধ, কাঁচা ছোলার স্বাদ, ধোঁয়া আর গালাগালিতে রমরম করছে। চারটে ছোট ছোট টেবিল। চারটে টেবিলই ভর্তি। এই ঘরের এক কোণে একটা বিরাট আকৃতির জলের ট্যাঙ্ক। তার পাশে অপরিচ্ছন্ন একটা বেসিন। বেসিনের নীচে ডাস্টবিন। যেখানে নোংরা উপচে পড়ছে। বেসিনের নীচ বরাবর একটা ছোট নর্দমা চলে গিয়েছে দোকানটার বাইরে পর্যন্ত। এই ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটা ছোট জানলা রয়েছে। দেখে মনে হলো এই জানালা দিয়ে রাতে মদের বোতল বেশী দামে বেচা হয়। জানলাটা নীচে একটা ছোট খোপ বাকি অংশটা তারজালি দিয়ে আটকানো। সেই তারজালিও অনেক অংশ মরচে ধরেছে। ঝুল জমেছে। আমাদের সামনের টেবিলের এক মধ্যবয়সী বুড়ো লোক চিৎকার করে বলে উঠল, " কই রে শুয়রের বাচ্চা কখন থেকে বলছি ছোলা দিয়ে যা, কেউ কি নেই নাকি?" এই ঘরে একটাই ফ্যান। তাও সেটা বাবরের আমলের। আমাদের সামনের একটা বড় তারজালি দিয়ে দোকানটাকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। তারজালির ওপারে তিনজন লোক। তারজালির নীচে একটা বড় ফুকো যেখান দিয়ে বাংলা মদের বোতল পারাপার হয়। চুনকাম করা দেওয়ালে শ্যাওলা ধরেছে। নীচুস্বরে সবাই কিছু না কিছু বিড়বিড় করে চলেছে। বিড়ির গন্ধ একটা অসম্ভব বাজে পরিবেশ তৈরি করেছে। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ উচ্চস্বরে গালাগাল দিয়ে মদের জন্য আবদার জানাচ্ছে। কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে কাঁকিনাড়া পেরোলেই এই বাংলা মদের ঠেকটা দেখতে পাওয়া যাবে। দোকানের নাম শরতের দেশী মদের দোকান।ইদানীং বুবাই ডাক্তারের এটাই আড্ডাখানা। গত কয়েক মাসে বুবাই ডাক্তারের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো স্থিতধী নেই আর তিনি। কথায় কথায় রেগে যান। জীবনে কোনওদিন ওনার মুখে গালাগাল শুনিনি, কিন্তু এখন তো অনেক কিছুই দেখছি আর শুনছি। সাদা পাকা দাড়িতে মুখ ভর্তি। গায়ের রঙ আগের চেয়ে অনেকটা কালচে। চুল বেড়েছে। সাদা পাকা চুলগুলো উস্কোখুস্কো। কপালে কাটা দাগ। চোখের তলায় কালি। শরীর ভেঙেছে। দাঁতগুলো অপরিষ্কার। একটা ময়লা হলদে টিশার্ট আর ছাই রঙের একটা প্যান্ট। পায়ে ছেঁড়া চটি। ডাক্তারবাবুর গা থেকে একটা বিকট গন্ধ বেরোচ্ছে। অনেকদিন স্নান না করলে যেমন গন্ধ বেরোয়। তিনি আবার চিৎকার করে বলে উঠলেন, " কই গেলি সব হারামিগুলো, কখন থেকে বলছি বোতলটা দিয়ে যা।" এইবার একজন বেঁটে মতো ভদ্রলোক তারজালির ওপার থেকে বললেন, " টাকা না দিলে আর বোতল দেওয়া হবে না।" বুবাই ডাক্তার একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, "আরে টাকা দেবো না বলেছি! কিছুদিনের মধ্যে সব দিয়ে দেব।" আবার ওই ভদ্রলোক বললেন, " আগে টাকা পরে কথা।" বুবাই ডাক্তার এবার রাগে লাল হয়ে উঠে বলে উঠল, " আমাকে মদ দিবি না শালা, তোর এত ক্ষমতা?" এই বলেই টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বুবাই ডাক্তার ছুটে গেল ওই লোকটার দিকে। তারজালি ধরে বলতে থাকল, " তুই জানিস আমি কে?" সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। বুবাই ডাক্তারকে এমন রেগে যেতে আমি কোনওদিন দেখিনি। তার চোখমুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, ঘামে ভিজে গিয়েছে জামা। রাগে তার মুখ লাল। কোনরকমে আমি আর শাওন দা বুবাই ডাক্তারকে সামলে টেবিলে বসলাম। কিন্তু তিনি তখনও রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। ওই বেঁটে করে ভদ্রলোককে পকেট থেকে হাজার বারোশ টাকা দিয়ে কোনক্রমে ডাক্তারবাবুর জন্য আরও একটা বাংলার বোতলের ব্যবস্থা করা গেল।
বিগত কয়েক মাসে জীবন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এটাই হয়ত জীবনের স্বভাব। এমন এক একটা সময় জীবনে আসে যখন কোনদিকে হাওয়া বইছে সেটা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। কোন দিকে হাঁটতে হবে সেটা তখন সময়ই ঠিক করে দেয়। যখন কোনও পরিকল্পনা আর কাজ করে না। সব ঘেঁটে 'ঘ' হয়ে যায়। তখন যেটা ঘটে সেটাকেই মেনে নিতে হয়। মাসখানেক আগে এক বয়স্ক রোগীকে ওষুধের বিষক্রিয়ায় মেরে ফেলা এবং তার থেকে দিনের পর দিন বেশীদামে ঔষুধ বেচার জন্য বুবাই ডাক্তারের জেল হয়েছিল। টানা আঠাশ দিন জেলে থাকার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে জামিনে বাইরে আছে। তবে আঠাশ দিনের ছাপ বুবাই ডাক্তারের ব্যবহারেই বেশ স্পষ্ট।
গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, " সব শালা চোর। আর আমি কয়েকটা টাকা ধার করেছি বলে আমাকে মদ দেবে না!" কথাগুলো শেষ করে এক নিঃশ্বাসে মদের গ্লাসটা খালি করে দিয়ে বুবাই আবার বলল, "সবাইকে আমি বুঝে নেব।" এই ঘরে মাত্র একটা বাল্ব জ্বলছে। একটাই পাখা ঘুরছে খুব ধীর গতিতে। তারমধ্যে এই মে মাসের দুপুর। গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত কিন্তু এই চৌহদ্দির বাইরে বুবাই ডাক্তার বেরোবেন না। এই মুহূর্তে তার মদের নেশা ছাড়া আর কিছুর প্রতি আসক্তি নেই। শাওনদা বলে উঠল, " আপনি দৈনন্দিক জীবন যাপনে ফিরে আসুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।" এতক্ষণ বাদে বুবাই ডাক্তার খেয়াল করল, একজন অচেনা কেউ তাকে কিছু উপদেশ দিচ্ছে। শাওনদার চোখে চোখ রেখে বুবাই বলে উঠল, " শোনো, যখন পিছনে তেল মাখানো রুল ঢোকে না তখন আর কিছুই ঠিক থাকে না।" শাওনদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, " আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি।কিন্তু আমরা তো আপনাকেই সাহায্য করতে এসেছি।" বুবাই ডাক্তার এবার একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শাওনদার মুখের দিকে চেয়ে বলল, " কী সাহায্য?"
শাওনদার সঙ্গে আজ থেকে বছর ছয়েক আগে একটা ডকুমেন্টারির এডিটিং করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। লম্বা রোগা শ্যামলা বর্ণের ছেলেটির তখন বয়স সবে ত্রিরিশের কোঠায়। মুখ কমানো। চুলের বাহার আছে। সাদা দাঁতগুলোর মধ্যে সবসময় একটা হাসি লেগে আছে। শুরুর জীবনটা ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তী কালে একটা প্রোডাকশন হাউস খুলেছে। বেশ কিছু বিয়ের ভিডিও, মিউজিক ভিডিও, স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি, ডকুমেন্টারি বানানোর পরে অবশেষে একটা প্রোডিউসার পাকড়াও করেছে! সে কিছু টাকা দিতে রাজি হয়েছে। তবে তিনি নাকি একটাই শর্ত দিয়েছেন, সিনেমা বানাতে হলে ভূতেরই বানাতে হবে। আমার জিজ্ঞাসা করতে শাওনদা বলল, " মারোয়ারী বাবু বলেছেন একটা যৌন দৃশ্য অবশ্যই থাকতে হবে। মাঝে মাঝে নায়িকার ক্লিভেজ, খোলা পিঠ, নায়কের সঙ্গে চুম্বনের দৃশ্য এইসব রাখতে হবে।" এইসব ফিরিস্তি শুনে বলেছিলাম, " ডাক্তারবাবুর সমানে এইসব আবার বলতে যেন না। উনি একটু নারীবিদ্বেষী।" শাওনদা বেশ গদগদ হয়ে বলেছিল, " তার মানে তুই দেখা করাবি বল?" অগত্যা শাওনদার প্রস্তাব ফেলতে পারিনি।
বুবাই ডাক্তার একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, " কী জানতে চাও?" শাওনদা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু আমি শাওনদাকে থামিয়ে বললাম, " আমি বুঝতে পারছি আপনি কোন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আর সত্যি আমরাও চাই আপনারই সাহায্য করতে।" বুবাই ডাক্তার কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, " তুমি কিছুই বুঝতে পারছো না! জেলের মধ্যে ছিলে কোনওদিন। জানো ওখানে কী হয়?" বুবাই ডাক্তার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মধ্যিখান থেকে শাওনদা বলে উঠল, " আপনার গল্প কাজে লাগাতে পারলে আপনি উপযুক্ত পাওনা পাবেন।" বুবাই ডাক্তার হঠাৎ একঝটকায় শাওনদার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল," পাওনা মানে? আর শোনো আমি কোনও গল্প বলি না। যা বলি সেটা সত্য ঘটনা!" শাওনদা কিছু বলার আগেই আমি বলে দিলাম, " আসলে এই গল্পটা নিয়ে যদি সিনেমা তৈরি হয় তাহলে আপনি উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন।" মনে হল কথাটা শুনে বুবাই ডাক্তার একটু মচকালেন তবুও ভাঙলেন না। একটু কর্কশ গলায় বললেন, " আজকাল তো সিনেমা মানেই যৌন দৃশ্য আর রাজনীতি সুড়সুড়ি।" শাওন বলল, " না না। আমাদের সিনেমায় ওইসব কিছু নেই।" অবস্থা এমনই এখন ডাক্তারবাবুকে মিথ্যে বলা ছাড়া গতিও নেই।


