বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
ছোটগল্প

সেল নম্বর ২৩

নীচু স্বরে সবাই কথা চলেছে ওই ছোট্ট ঘরটাই। লোকে আসছে মদ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ টেবিলে বসে মদ খাচ্ছে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১২ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

সেল নম্বর ২৩
|pinterest

" আরেকটা বোতল দিয়ে যা শালা!" বুবাই ডাক্তার চেঁচিয়ে বলে উঠল। এই আড্ডাখানা এখন বুবাই ডাক্তারের ঘরবাড়ি হয়ে গিয়েছে। দুশো স্কোয়ারফিট এই ঘরটার চারিদিকে শুধু মদের গন্ধ, কাঁচা ছোলার স্বাদ, ধোঁয়া আর গালাগালিতে রমরম করছে। চারটে ছোট ছোট টেবিল। চারটে টেবিলই ভর্তি। এই ঘরের এক কোণে একটা বিরাট আকৃতির জলের ট্যাঙ্ক। তার পাশে অপরিচ্ছন্ন একটা বেসিন। বেসিনের নীচে ডাস্টবিন। যেখানে নোংরা উপচে পড়ছে। বেসিনের নীচ বরাবর একটা ছোট নর্দমা চলে গিয়েছে দোকানটার বাইরে পর্যন্ত। এই ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটা ছোট জানলা রয়েছে। দেখে মনে হলো এই জানালা দিয়ে রাতে মদের বোতল বেশী দামে বেচা হয়। জানলাটা নীচে একটা ছোট খোপ বাকি অংশটা তারজালি দিয়ে আটকানো। সেই তারজালিও অনেক অংশ মরচে ধরেছে। ঝুল জমেছে। আমাদের সামনের টেবিলের এক মধ্যবয়সী বুড়ো লোক চিৎকার করে বলে উঠল, " কই রে শুয়রের বাচ্চা কখন থেকে বলছি ছোলা দিয়ে যা, কেউ কি নেই নাকি?" এই ঘরে একটাই ফ্যান। তাও সেটা বাবরের আমলের। আমাদের সামনের একটা বড় তারজালি দিয়ে দোকানটাকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। তারজালির ওপারে তিনজন লোক। তারজালির নীচে একটা বড় ফুকো যেখান দিয়ে বাংলা মদের বোতল পারাপার হয়। চুনকাম করা দেওয়ালে শ্যাওলা ধরেছে। নীচুস্বরে সবাই কিছু না কিছু বিড়বিড় করে চলেছে। বিড়ির গন্ধ একটা অসম্ভব বাজে পরিবেশ তৈরি করেছে। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ উচ্চস্বরে গালাগাল দিয়ে মদের জন্য আবদার জানাচ্ছে। কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে কাঁকিনাড়া পেরোলেই এই বাংলা মদের ঠেকটা দেখতে পাওয়া যাবে। দোকানের নাম শরতের দেশী মদের দোকান।ইদানীং বুবাই ডাক্তারের এটাই আড্ডাখানা। গত কয়েক মাসে বুবাই ডাক্তারের জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো স্থিতধী নেই আর তিনি। কথায় কথায় রেগে যান। জীবনে কোনওদিন ওনার মুখে গালাগাল শুনিনি, কিন্তু এখন তো অনেক কিছুই দেখছি আর শুনছি। সাদা পাকা দাড়িতে মুখ ভর্তি। গায়ের রঙ আগের চেয়ে অনেকটা কালচে। চুল বেড়েছে। সাদা পাকা চুলগুলো উস্কোখুস্কো। কপালে কাটা দাগ। চোখের তলায় কালি। শরীর ভেঙেছে। দাঁতগুলো অপরিষ্কার। একটা ময়লা হলদে টিশার্ট আর ছাই রঙের একটা প্যান্ট। পায়ে ছেঁড়া চটি। ডাক্তারবাবুর গা থেকে একটা বিকট গন্ধ বেরোচ্ছে। অনেকদিন স্নান না করলে যেমন গন্ধ বেরোয়। তিনি আবার চিৎকার করে বলে উঠলেন, " কই গেলি সব হারামিগুলো, কখন থেকে বলছি বোতলটা দিয়ে যা।" এইবার একজন বেঁটে মতো ভদ্রলোক তারজালির ওপার থেকে বললেন, " টাকা না দিলে আর বোতল দেওয়া হবে না।" বুবাই ডাক্তার একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, "আরে টাকা দেবো না বলেছি! কিছুদিনের মধ্যে সব দিয়ে দেব।" আবার ওই ভদ্রলোক বললেন, " আগে টাকা পরে কথা।" বুবাই ডাক্তার এবার রাগে লাল হয়ে উঠে বলে উঠল, " আমাকে মদ দিবি না শালা, তোর এত ক্ষমতা?" এই বলেই টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বুবাই ডাক্তার ছুটে গেল ওই লোকটার দিকে। তারজালি ধরে বলতে থাকল, " তুই জানিস আমি কে?" সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। বুবাই ডাক্তারকে এমন রেগে যেতে আমি কোনওদিন দেখিনি। তার চোখমুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, ঘামে ভিজে গিয়েছে জামা। রাগে তার মুখ লাল। কোনরকমে আমি আর শাওন দা বুবাই ডাক্তারকে সামলে টেবিলে বসলাম। কিন্তু তিনি তখনও রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। ওই বেঁটে করে ভদ্রলোককে পকেট থেকে হাজার বারোশ টাকা দিয়ে কোনক্রমে ডাক্তারবাবুর জন্য আরও একটা বাংলার বোতলের ব্যবস্থা করা গেল।

বিগত কয়েক মাসে জীবন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এটাই হয়ত জীবনের স্বভাব। এমন এক একটা সময় জীবনে আসে যখন কোনদিকে হাওয়া বইছে সেটা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। কোন দিকে হাঁটতে হবে সেটা তখন সময়ই ঠিক করে দেয়। যখন কোনও পরিকল্পনা আর কাজ করে না। সব ঘেঁটে 'ঘ' হয়ে যায়। তখন যেটা ঘটে সেটাকেই মেনে নিতে হয়। মাসখানেক আগে এক বয়স্ক রোগীকে ওষুধের বিষক্রিয়ায় মেরে ফেলা এবং তার থেকে দিনের পর দিন বেশীদামে ঔষুধ বেচার জন্য বুবাই ডাক্তারের জেল হয়েছিল। টানা আঠাশ দিন জেলে থাকার পর অবশেষে শর্তসাপেক্ষে জামিনে বাইরে আছে। তবে আঠাশ দিনের ছাপ বুবাই ডাক্তারের ব্যবহারেই বেশ স্পষ্ট।

গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, " সব শালা চোর। আর আমি কয়েকটা টাকা ধার করেছি বলে আমাকে মদ দেবে না!" কথাগুলো শেষ করে এক নিঃশ্বাসে মদের গ্লাসটা খালি করে দিয়ে বুবাই আবার বলল, "সবাইকে আমি বুঝে নেব।" এই ঘরে মাত্র একটা বাল্ব জ্বলছে। একটাই পাখা ঘুরছে খুব ধীর গতিতে। তারমধ্যে এই মে মাসের দুপুর। গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত কিন্তু এই চৌহদ্দির বাইরে বুবাই ডাক্তার বেরোবেন না। এই মুহূর্তে তার মদের নেশা ছাড়া আর কিছুর প্রতি আসক্তি নেই। শাওনদা বলে উঠল, " আপনি দৈনন্দিক জীবন যাপনে ফিরে আসুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।" এতক্ষণ বাদে বুবাই ডাক্তার খেয়াল করল, একজন অচেনা কেউ তাকে কিছু উপদেশ দিচ্ছে। শাওনদার চোখে চোখ রেখে বুবাই বলে উঠল, " শোনো, যখন পিছনে তেল মাখানো রুল ঢোকে না তখন আর কিছুই ঠিক থাকে না।" শাওনদা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, " আমি আপনার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি।কিন্তু আমরা তো আপনাকেই সাহায্য করতে এসেছি।" বুবাই ডাক্তার এবার একটু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শাওনদার মুখের দিকে চেয়ে বলল, " কী সাহায্য?"

শাওনদার সঙ্গে আজ থেকে বছর ছয়েক আগে একটা ডকুমেন্টারির এডিটিং করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। লম্বা রোগা শ্যামলা বর্ণের ছেলেটির তখন বয়স সবে ত্রিরিশের কোঠায়। মুখ কমানো। চুলের বাহার আছে। সাদা দাঁতগুলোর মধ্যে সবসময় একটা হাসি লেগে আছে। শুরুর জীবনটা ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তী কালে একটা প্রোডাকশন হাউস খুলেছে। বেশ কিছু বিয়ের ভিডিও, মিউজিক ভিডিও, স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি, ডকুমেন্টারি বানানোর পরে অবশেষে একটা প্রোডিউসার পাকড়াও করেছে! সে কিছু টাকা দিতে রাজি হয়েছে। তবে তিনি নাকি একটাই শর্ত দিয়েছেন, সিনেমা বানাতে হলে ভূতেরই বানাতে হবে। আমার জিজ্ঞাসা করতে শাওনদা বলল, " মারোয়ারী বাবু বলেছেন একটা যৌন দৃশ্য অবশ্যই থাকতে হবে। মাঝে মাঝে নায়িকার ক্লিভেজ, খোলা পিঠ, নায়কের সঙ্গে চুম্বনের দৃশ্য এইসব রাখতে হবে।" এইসব ফিরিস্তি শুনে বলেছিলাম, " ডাক্তারবাবুর সমানে এইসব আবার বলতে যেন না। উনি একটু নারীবিদ্বেষী।" শাওনদা বেশ গদগদ হয়ে বলেছিল, " তার মানে তুই দেখা করাবি বল?" অগত্যা শাওনদার প্রস্তাব ফেলতে পারিনি।

বুবাই ডাক্তার একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, " কী জানতে চাও?" শাওনদা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু আমি শাওনদাকে থামিয়ে বললাম, " আমি বুঝতে পারছি আপনি কোন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আর সত্যি আমরাও চাই আপনারই সাহায্য করতে।" বুবাই ডাক্তার কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, " তুমি কিছুই বুঝতে পারছো না! জেলের মধ্যে ছিলে কোনওদিন। জানো ওখানে কী হয়?" বুবাই ডাক্তার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মধ্যিখান থেকে শাওনদা বলে উঠল, " আপনার গল্প কাজে লাগাতে পারলে আপনি উপযুক্ত পাওনা পাবেন।" বুবাই ডাক্তার হঠাৎ একঝটকায় শাওনদার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল," পাওনা মানে? আর শোনো আমি কোনও গল্প বলি না। যা বলি সেটা সত্য ঘটনা!" শাওনদা কিছু বলার আগেই আমি বলে দিলাম, " আসলে এই গল্পটা নিয়ে যদি সিনেমা তৈরি হয় তাহলে আপনি উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবেন।" মনে হল কথাটা শুনে বুবাই ডাক্তার একটু মচকালেন তবুও ভাঙলেন না। একটু কর্কশ গলায় বললেন, " আজকাল তো সিনেমা মানেই যৌন দৃশ্য আর রাজনীতি সুড়সুড়ি।" শাওন বলল, " না না। আমাদের সিনেমায় ওইসব কিছু নেই।" অবস্থা এমনই এখন ডাক্তারবাবুকে মিথ্যে বলা ছাড়া গতিও নেই।

নীচু স্বরে সবাই কথা চলেছে ওই ছোট্ট ঘরটাই। লোকে আসছে মদ নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ টেবিলে বসে মদ খাচ্ছে। ঘরে একটাই বাল্ব জ্বলছে। মে মাসের গরম আরও অসহ্য হয়ে উঠছে। ফ্যানটা টিমটিম করে ঘুরছে। একটা বিড়ি জ্বালিয়ে বুবাই ডাক্তার বলতে শুরু করল, " যেদিন প্রথম গ্রেপ্তার হলাম সেইদিনটা জীবনে ভুলব না। আসলে জীবনে কোনওদিন কোনও অনৈতিক কাজ করিনি। ওই বুড়োটা আমারই পেশেন্ট ছিল। তবে ঠিক করে ওষুধ খেত না। অনেক জটিল রোগ ছিল। হুট করে একদিন সে মারা গেল। অমনি বাড়ির লোকে আমার নামে থানায় এফ.আয়.আর করে দিল। শুনেছিলাম ওদের নাকি অনেক উঁচুমহল পর্যন্ত যোগাযোগ। তাই এ যাত্রায় যে সহজে ছাড়া পাবো না সেটা জানতাম। তবে এটা ঠিকই যে আমি অনেকসময় অনেক বেশী টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছি। " কথাটা শেষ করে গ্লাসে চুমুক দিল ডাক্তারবাবু। শাওনদা কিন্তু ইতিমধ্যে ভয়েস রেকর্ডিং শুরু করে দিয়েছে। ডাক্তারবাবু একটু শ্বাস নিয়ে আবার বলল, " একবেলা থানায় কাটিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কোর্টে। বিচারক আমাকে সাত দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। তারপর আমার মেডিকেল করানোর পর সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হলো।" শাওনদা জিজ্ঞাসা করল, " কোন সংশোধনাগারে?" ডাক্তারবাবু শাওনদার চোখে চোখ রেখে বলল, " তোমার অত জেনে কাজ নেই। যেটুকু বলছি ওইটুকুই তোমার জন্য যথেষ্ট।" আমি শাওনদাকে খোঁচা মেরে বললাম," চুপ থাকো।" আসলে ডাক্তারবাবু এগুলো একদম পছন্দ করে না। ডাক্তারবাবু আবার শুরু করলেন, " আইনি নিয়মকানুন কিছু বুঝতাম না। আজও বুঝি না। থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল উকিলের ব্যাপরে। আমার তিনকূলে কেউ নেই। ভাঁড়ারও প্রায় শূন্য। তাই অগত্যা সরকারী উকিলেই ভরসা রেখেছিলাম। যদিও সে উকিল প্রথমেই যা ঝুলিয়ে দিল তাতে আমার কপালে জেলে যাওয়াটা লেখাই ছিল।"

আর একটা বিড়ি ধরিয়ে বুবাই বলল, " কোর্ট চত্ত্বর থেকে একটা বড়ো ভ্যানে আমাদের নিয়ে রওনা হলো কয়েকজন পুলিশ অফিসার। ভ্যানের মধ্যে আমি ছাড়াও আরো এগারো জন। বেশ কয়েকজন অল্প বয়সী যুবকও ছিল ওই গাড়িতে। কিছুক্ষন যাওয়ার পর গাড়ি থামল সংশোধনাগারের সামনে। ভিতরে ঢোকার সময় একজন মোটা লম্বা মতন একটি লোক আমার নাম-ধাম এবং আরও কিছু ব্যাপার জানতে চাইল। যেমন আমার কোনও অসুখ আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর একটা ছোট্ট গেট পেরিয়ে একটা ঘরে এলাম। সেই ঘর থেকে সোজা দেখা যায় সংশোধনাগারের ভিতরটা। এবার একজন বেঁটে মতন ভদ্রলোক আমাকে বলল, জামাটা খোল। জামাটা খোলার পর আমাকে বলল পিছন ঘুরতে। আমি অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে জামাটা খুললাম। এবার ওই লোকটি একটা মিচকে হাসির সঙ্গে বলল, প্যান্টটা খোল এবার। আমি কিছু উত্তর না দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরও একবার ভারী গলায় ওই বেঁটে মতো লোকটা একই কথা বলল। কিন্তু আমি চুপ রইলাম।এবার ওই লোকটি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার সামনে এসেই কষিয়ে একটা চড় মারল। গালাগাল দিয়ে বলল, শুনতে পাচ্ছিস না কী বলছি!' শুধু প্যান্ট নয় জাঙ্গিয়াটাও খুলবি। কথাগুলো বলতে বলতে বুবাই এর চোখ জলে ভরে এলো। গলা ভারী হয়ে এলো। গ্লাসে রাখা মদটুকু এক নিমেষে শেষ করে বলে উঠল, " জেলের জীবনটা একদম অন্যরকম। অন্যপৃথিবীর মতন।"

হঠাৎ করে আমার ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম কৌশিক ফোন করছে। এতদিন বাদে হঠাৎ কৌশিকের ফোন পেয়ে একটু আশ্চর্য হলেও ফোনটা ধরার অবকাশ পেলাম না। আসলে গল্প বলার মাঝখানে ফোন ধরার ব্যাপারটা ডাক্তারবাবু একদম পছন্দ করে না। তাই ফোনটা কেটে দিলাম। ডাক্তারবাবু আর একটা মদের বোতলের ফিরিস্তি দিয়ে আবার বলতে শুরু করল," পুরো উলঙ্গ করে আমার তল্লাশি নেওয়ার পরে ওরা আমাকে একটা হল ঘরে নিয়ে গেল। সেই ঘরে অন্তত কুড়ি থেকে বাইশজন কয়েদি। একটাই পায়খানা। সেখানে কোনও পাখা নেই। দরজার বাইরে একটা হাই স্পিড টেবিল ফ্যান। আর খাওয়ার জল বলতে একটা কল আছে বটে কিন্তু সেই জল মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার অন্নপ্রাশনের ভাত বেরিয়ে এসেছিল। জেলের ভিতরে এমন কোনও জিনিস নিয়ে যেতে দেওয়া হয় না যেখানে বিপদ থাকে। যেমন যে কোনও ধরনের অলংকার, মাদুলি, বেল্ট, ঘড়ি, ওষুধ ইত্যাদি। তবে আমার সঙ্গে কিছুই ছিল না। কোনও ক্রমে একটা রাত ওই ঘরটার কাটালাম। দুপুরে দুটো শুকনো পোড়া রুটি আর ডাল দিলেও সন্ধের পর আমাদের রাতের খাবার দিয়ে দিয়েছিল। রাতের খাবার বলতে গলা ভাত আর ডাল। ডাল তো নয়, যেন গরম জল। কোনও ক্রমে সেই রাতটুকু না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলাম। পরের দিন সকালে আমাদের লাইন করে বাইরে দাঁড় করিয়ে গুনতি হলো। তারপরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো সেল নম্বর তেইশে। ছোট আকারের এই কক্ষে মোটামুটি তিনজনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও আমাকে নিয়ে মোট ছয়জন কয়েদী ছিল।"

মদের গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বুবাই ডাক্তার বলল, " ওই সেলেই যত গন্ডগোল হলো। " শাওনদা অনেক্ষন চুপ থাকার পরে বলে উঠল, " কী হলো?" বুবাই ডাক্তার একটা বিড়ি ধরাতে ধরাতে বলল, " ওই সেলেই আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সমীরের। সমীর...." আমার ফোনটা আবার বেজে উঠল। দেখি কৌশিক ফোন করেছে। এবারও অগত্যা ফোনটা কেটে দিলাম। ডাক্তারবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বলল," খুব দরকারী কিছু?" আমি মাথা নেড়ে বললাম, " না না। তেমন কিছু নয়। আপনি চালিয়ে যান।" ডাক্তারবাবু আবার শুরু করতে যাবে ঠিক এমন সময় আবার কৌশিকের ফোন। এবার একটু বিরক্ত হয়েও ফোনটা ধরলাম। কিন্তু ফোনের ওপার থেকে কেমন একটা বিকট শব্দ আসতে থাকল। কৌশিক কিছু একটা বলতে চাইছে কিন্তু নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে। হ্যালো, হ্যালো করলাম কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না। কলটা কেটে দিলাম। ডাক্তারবাবু একটু মিহি গলায় বলল, " কৌশিক কি দরকারী কিছু বলবে? ফোনটা ধরে নাও। এই ঘরের বাইরে নেটওয়ার্ক পাবে।" আমি ঘাড় নেড়ে বাইরে এসে কৌশিকে ফোন করলাম। ফোনের ওপার থেকে কৌশিক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল," ভাই শুনেছিস?" আমি বললাম," কী?" কৌশিক কাঁদো কাঁদো গলায় বলল," এটা কী করে হয়ে গেল ভাই?" আমি বললাম," কী? তাড়াতাড়ি বল।" কৌশিক বলল," কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ের ধারে আজ সকালে বুবাই ডাক্তার লরি চাপা পড়েছে।" কৌশিকের কথাগুলো একদম বিদ্যুৎ চমকানোর মতো এসে লাগল। মনে হলো পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। আমার চারিদিক কেমন ঘুরছে। গা গোলাচ্ছে। কৌশিকে জিজ্ঞাসা করলাম, " সত্যি বলছিস?" খুব কষ্ট করে শব্দগুলো বেরোল। কৌশিক কাঁদতে কাঁদতে বলল, " হ্যাঁ রে ভাই। সত্যি।" তারপরে একটা অন্ধকারময় জগৎ। বুঝতে পারলাম কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। পা কাঁপছে। সব কিছু ঘোলাটে লাগছে। আস্তে আস্তে সব শব্দ মিলিয়ে গেল। চুপ হয়ে গেল কোলাহল। তারপরে কেটে গিয়েছে অনেক কটা মাস। শাওনদা আজ সিনেমা বানিয়েছে। ধুমধাম করে প্রিমিয়ার হয়েছে। টিকিট কেটে লোকে হাউসফুল করেছে সেই সিনেমা। আজকাল আর রবিবার হলে গল্প শুনতে যাওয়া হয় না। আড্ডা হয় না জমজমাটি। ডাক্তারবাবু হারিয়ে গেলেন কোনও সুদূর গ্রহে। কোনও ভৌতিক গল্পের মতো যেন মনে হয়। মনে হয় সেল নম্বর তেইশের মতো।

ট্যাগসূচী:#story#horror
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev