বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
ছোটগল্প

দে বী প ক্ষ

দেবারতীর সঙ্গে রীতেশের আলাপ এই থানাতেই। আজ থেকে মাস আটেক আগে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

২২ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

দে বী প ক্ষ
|প্রতীকী ছবি

নীলসাদা দেওয়ালের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছে। দশ ফুট বাই বারো ফুটের ঘরটায় বিভিন্ন গন্ধ ঘুরে কখনও বিশ্রী ফিনাইলের গন্ধ, ডেটলের কড়া স্বাদ, অনেকদিনের জমা পায়খানার দুর্গন্ধ, মরা পিঁপড়ের গন্ধ, না খাওয়া খাবারের গন্ধ। এই ঘরে কোনও পাখা নেই। একটি হলুদ আলো জ্বলছে টিমটিম করে। এক কোণে পর্দা দিয়ে ঘেরা অস্থায়ী একটি পায়খানা। অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন। ঘরের অপর এক কোণে একটি কুঁজোয় রাখা রয়েছে জল। তার পাশে স্টিলের গ্লাস। ঘরটির মেঝে সিমেন্টের, এবড়ো-খেবড়ো এবং অপরিষ্কার। একটি মাদুর আছে কিন্তু সেটিও ছিঁড়ে ছিঁড়ে একদম পাতলা হয়ে গিয়েছে। মাদুর আর মেঝে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। নীলসাদা দেওয়ালে টিলা দিয়ে কতগুলো নাম খোদাই করা। ভালবাসার চিহ্নের মধ্যে লেখা জুঁই আর সোমেশ। তার পাশে গোলাকৃতি একটা ছবির মধ্যে লেখা মুসকান আর শাহীন। দেওয়ালের অনেক জায়গায় লেখা মা! কিছু জায়গায় লেখা আমি বাঁচতে চাই আবার কাটাকুটিতে ভরা দেওয়ালের কিছু অংশ। স্রেফ হিজিবিজি কাটা, দেখে মনে হয় সময় নষ্ট করার জন্যই কেউ যেন কাটাকুটি এঁকে গিয়েছে। এই ঘরের একদম উত্তরপূর্ব কোণে উপরে একটা ছোট্ট ভেন্টিলেটর। তারজালি দিয়ে আটকানো সেই ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। এখন ভোর। তবে এই ঘরে থাকলে দিনরাত্রির হিসেব গুলিয়ে যায়। এই ঘরটা আসলে গোলমেলে। রীতেশ গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালবাসে। ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরিটি রায় গুলে খাওয়া। শার্লক হোমসকে রীতেশ নিজের জীবনের আদর্শ মানে। শার্লকের মতো প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত হতে চাই রীতেশ। তবে সবকিছু চাইলেই যে পাওয়া যায় তেমনটা নয়। ওম শান্তি ওমে শাহরুখ খানের সেই ডায়লগটা মনে পড়ে? দুহাত শুন্যে তুলে শাহরুখ বলেছিলে, " ক্যাহেতে হে আগার কিসি চিজ কো দিল সে চাহো তো পুরি ক্যাহেনাত তুমকে মিলানেকো কসিস মে ল্যাগ যা তি হে!" কিন্তু এইসব ডায়লগ শুধু মাত্র সিনেমাতেই খাটে। বাস্তবে এইসব আজগুবি, অবান্তর। স্থানীয় একটি পত্রিকায় কাজ করে রীতেশ। গোয়েন্দা জীবন চাওয়া ছেলেটা গোবেচারার মতো নেতাদের পিছু পিছু ছোটে। একটা ছোট্ট এক্সক্লুসিভের জন্য কিংবা এমন একটা খবর যা গোটা সাংবাদিক কুলের কাছে অজানা। তবে এখনও রীতেশের কপাল খোলেনি। হয়ত আর খুলবেও না। আশা ছেড়ে দিয়েছে রীতেশ। স্থানীয় নেতাদের পিছনে ঘুরতে ঘুরতে দিন শেষ হয়ে যায়। কোনও নেতা অমুক টিউব কল উদ্বোধন করছে তো অন্য নেতা রাস্তার পাশে দুটো গাছ লাগাচ্ছে, এইসব খবর করতে করতে রীতেশ ক্লান্ত হয়ে যায়। তবুও মাথার কাছে সোনার কাঠি কেউ রেখে যায় না। স্বপ্নে বিভোর থাকে রীতেশ। একটা ভাল দিনের অপেক্ষায় থাকে প্রতিদিন। তবুও সেই একই দিন, একই নেতাদের ঘ্যানঘ্যান। স্তাবকতা করতে করতে দিন কাটে তার। সিপিএমের ক্ষমতার শেষ কয়েকটা বছর খুব কাছ থেকে দেখেছে রীতেশ। ক্ষমতার হস্তান্তর যে কী ভয়ংকর জিনিস রীতেশ তা হাড়ে হাড়ে জানে। একজন মানুষ দিনের পর দিন মার খেতে খেতে যখন একদম আধমরা হয়ে যায়, তখন সে বাঁচার আশা ছেড়ে দেয়। কিন্তু মরার আশাও করে না। বাঁচা আর মরার মধ্যে বেঁচে থাকে আধমরা হয়ে। সিপিএমের আমলে খবর করতে গিয়ে কতবার হুমকির মুখে পড়েছে রীতেশ। পাড়ার দাদাদের মুখে শুনেছে, " বেশী খবর করলে ভাসিয়ে দেব", আবার কখনও খবর না করলে, " কী রে বিরোধীদের থেকে কত টাকা পাচ্ছিস খবর না করার জন্য।" তারপর অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। সিপিএম ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তৃনমূলের নয়া জমানা শুরু হয়েছে। রীতেশও কিছু দাদা-কাকা বানিয়ে ফেলেছে গত পাঁচ বছরে। দুপয়সা বেশী কামিয়েছে। একতলার ঘরভাড়া ছেড়ে চার তলার ফ্ল্যাটে এসে উঠেছে। প্রায় লাখ পঁচিশেক টাকা গৃহ ঋণ নিয়ে প্রথম নিজেদের বাড়িতে উঠে এসেছে। রীতেশের বাবা গৃহ শিক্ষক ছিলেন। আয় বলতে ওইটুকুই। কোনওদিনই রীতেশের কপালে পৈতৃক ভিটে কী জিনিস, তা আর দেখে হয়ে ওঠা হয়নি। মা বাবার এক ছেলে রীতেশ। নৈহাটি নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। বিজ্ঞানের ছাত্র রীতেশ চিরকালই আত্মভোলা। মন যে দিকে সায় দিয়েছে সেই দিকেই ছুটে গিয়েছে। ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল সারাজীবন ক্রিকেট খেলেই জীবন কাটাবে। রাহুল দ্রাবিড়ের মতো স্থিতধী হতে চেয়েছিল রীতেশ। কিন্তু হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া যে বড়ই কঠিন সাধনা। সবাই পারে না। পরিস্থিতিও সাধ দেয় না সবসময়। ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পাশ করে আর পড়াশুনা করা হয়নি। প্রথমে স্থানীয় একটি পোর্টালে কিছুদিন কাজ শেখার পরে, সাপ্তাহিক অশনি সংকেত পত্রিকায় কাজ শুরু। প্রথমে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে শুরু। এখন সেটি বেড়ে পঁচিশ হয়েছে। তবে উপড়ি আছে ভালই। সেই টাকা দিয়েই আজকে কিছুটা হলেও রীতেশ সাবলম্বী। বাবার কিছু জমানো সঞ্চয় আর রীতেশের বিগত পাঁচ বছরের পরিশ্রমে ওদের পরিবারে আশার আলো ফুটেছে। আলো আর অন্ধকার তো একে অপরের দোসর। এই ঘরে কোনও ফ্যান নেই। লোহার গ্রিলের ওপর প্রান্ত থেকে একটি টেবিল ফ্যান ঘুরছে। গতকাল রাত থেকেই ওই ফ্যানের হাওয়া রীতেশের গা অবধি পৌঁছায়নি। গ্রিলের অপর প্রান্তে একটা জীবন আছে, যেখানে কেউ পরাধীন নয়। যেখানে যে কেউ যার ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়াতে পারে। আসলে মানুষ যতদিন না পর্যন্ত পরাধীন হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত সে স্বাধীনতার স্বাদ কী হতে পারে তা বুঝতে পারে না। গতকাল রাত থেকে রীতেশ হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে স্বাধীনতা আসলে কতটা মোলায়েম, কতটা আদুরে। কাছে থাকলে আমরা এমন কতকিছুর স্বাদ পায় না যা দূরে গেলে বুঝতে পারি।

গতকাল রাত থেকে এখন অবধি দুটো রুটি আর ডিম তরকা জুটেছে। যদিও রীতেশের খুব একটা খিদে নেই। থানার কনস্টেবলবাবু নীলিমেশ দাঁ আবার রীতেশের বিশেষ পরিচিত। মোটামুটি থানার ভিতরের খবরগুলো তিনিই রীতেশের কাছে পৌঁছে দেন। রীতেশ কতবার খবর করতে এই থানায় এসেছে, কতবার কাছ থেকে এই নীলসাদা কুঠোরিটি দেখেছে। কিন্তু এই কুঠোরি যে কী ভয়ঙ্কর রকম ঘোলাটে হতে পারে তা এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে রীতেশ। কিছুতেই যেন সময়ের কাঁটা ঘুরতে চাইছে না। গতকাল রাত থেকে নৈহাটি থানার বড়বাবু বাণীকুমার দাস রীতেশের খোঁজ নিয়ে গিয়েছেন। এই তল্লাটে রীতেশের একটু পরিচিতি আছে। সাংবাদিক হওয়ার দৌলতে এই সম্পর্কগুলো এমনিতেই তৈরি হয়ে যায়, বিশেষ প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে না। তবে রক্তের সম্পর্ক বাদে যে কোনও সম্পর্কই যে শুধুমাত্র প্রয়োজন ভিত্তিক, তা আজ বুঝতে পারছে রীতেশ। গতকাল রাত থেকে শুধুমাত্র রীতেশের বুড়ো বাবা একবার দেখা করে গিয়েছে। তাও মিনিট পাঁচেকের জন্য। উকিলের বন্দোবস্ত করতে হবে এই জেনে বুড়ো মানুষটা দিশেহারা হয়ে গিয়েছে।

গঙ্গাপারের শহর নৈহাটি চিরকালই ছিমছাম। সাহিত্যে ভরপুর। নাটকে সরগরম। নৈহাটির কালীপুজো এখন জগৎবিখ্যাত। নৈহাটির বড় মা এখন সবার কাছে শান্তির ঠিকানা। ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভূমি নৈহাটি আসলে স্মৃতির শহর। ভালবাসার শহর। কলকাতা থেকে মাত্র ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা নৈহাটি। শিয়ালদহ থেকে মাত্র এক ঘন্টার ট্রেন সফর। শিয়ালদহ রানাঘাট মেন লাইনে পড়ে নৈহাটি জংশন। এই স্টেশন থেকে ট্রেন পাল্টে চলে যাওয়া যায় ব্যান্ডেল। নৈহাটি শহরের আগের চেয়ে এখন অনেক উন্নত। ঝকঝকে রাস্তা, মোলায়েম গঙ্গার ঘাট, নতুন গজিয়ে ওঠা বহুতল শপিং মল, সদ্য হওয়া মাল্টিপ্লেক্স। তবুও বারবার নৈহাটিকে রীতেশের এখনও সাবালক লাগে। নৈহাটির পরিবেশ যতই স্বাধীনচেতা হোক না কেন নৈহাটি এখনও উন্নয়নের খোঁজে। এখানে প্রচুর চায়ের দোকান। দোকান বলা ভুল, ঠেক! নৈহাটিতে আড্ডার কোনও খামতি নেই। পাড়ার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে আড্ডার ঠেক নৈহাটির অন্য একটি বৈচিত্র বলা যেতে পারে। এই জন্যই হয়ত এখানে তেমন কোনও ক্যাফে গড়ে উঠতে পারেনি। বলা ভাল গড়ে উঠলেও তা বেশীদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

দেবারতীর সঙ্গে রীতেশের আলাপ এই থানাতেই। আজ থেকে মাস আটেক আগে। তখন সদ্য ঝরা বসন্তের পাতা ছুঁয়ে এসেছে ফিকে হয়ে যাওয়া বিকেল। উড়ন্ত প্রজাপতি পাখা মেলে ফিরে গিয়েছে কোনও দূর অজানায়। মখমলে আঁচল পেতে দিয়ে আদর করেছে মোলায়েম কোনও পালক। উড়ে এসে জুড়ে বসেছে নেশাতুর ধুলোবালি। ঝেড়ে ফেললেও সে যে যেতে চাই না। এমনিই আবেশ সেই সময়, এমনিই একদিন রীতেশ কিছু ছুটকো কাজে এসে উঠেছে থানার সামনে বিস্তৃত উঠোনে। থানার একদিকে জড়ো হওয়া কিছু উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড় প্রতিদিনের মতো। অন্যদিকে বাজেয়াপ্ত কিছু বাইক, গাড়ির স্তূপ। থানার কিছু অফিসারদের প্রতিদিনের মতো জটলা চলছে। এখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে দশটা। থানা থেকে কিছু কয়েদীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নৈহাটি স্টেট জেনারেল হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। রুটিন চেকআপ। আবার একটা গাড়িতে কিছু কয়েদীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আদালতের উদ্দেশ্যে। মূলত সকালের সময়টা থানার অন্দরমহলটা একটু ব্যস্তই থাকে। শেষ বসন্তের হাওয়াটা সারা শরীরে একটা শিহরণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা বার করতে গিয়েও থেমে গেল রীতেশ। ঠিক এমন সময় একটা পুরোনো টাটা সুমো এসে থামল। সামনের সিট থেকে থানার ছোটবাবু বীরবল নামলেন। রীতেশের সমবয়সী বীরবল। উচ্চতায় রীতেশের সমান হলেও গায়ে গতরে রীতেশকে দশ গোল দেবে। রীতেশকে দেখা মাত্রই বীরবল জড়িয়ে ধরে বলল, " এএখানে কী ব্যাপার?" জন্ম বাংলায় হলেও বীরবল বিহারের মানুষ, কথায় এখনও একটা বাংলা হিন্দি মেশানো টান আছে। বীরবল যখন বাংলায় কথা বলে তখন সব কথার সঙ্গে একটা অতিরিক্ত 'এ' জুড়ে যায়। যদিও এই রহস্যের সমাধান রীতেশ আজও করতে পারেনি। রীতেশ উত্তর দিল, " তেমন কিছু নয়। মেজ বাবুর থেকে একটা খবরের কনফার্মেশনের জন্য এসেছিলাম।" বীরবল কথাটা পাত্তা না দিয়ে বলল, "একদিন সময় করে এসো। গান হবে, পান হবে।" রীতেশ মুচকি হাসল। বীরবলের গানের গলা অসাধারন। বিশেষত ক্লাসিক্যাল গানের প্রতি ওর একটা অমায়িক ভালবাসা আছে। মাঝেমধ্যে সময় পেলে রীতেশ, পার্থ, আকাশ, তিথি, বীরবল একটু গান-পানের আয়োজন করে। যাকে বলা যেতে পারে বুদ্ধিজীবিদের মাসিক সম্মেলন। রীতেশ লক্ষ্য করল গাড়ির পিছনের সিট থেকে দুজন মহিলা কনস্টেবেলের সঙ্গে একজন মধ্যবয়সী মেয়ে নামল। পরনে গোলাপী শাড়ি। সাদা হাতকাটা ব্লাউজ। কপালের মধ্যিখানে ছোট টিপ। চোখে ভরা কাজল। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। দুহাতে বিভিন্ন রঙের কাঁচের চুড়ি। কানে ঝুমকো দুল। গালের দুপাশে লালচে আভামিশ্রিত পাউডার। গলায় একটা সোনার জল করা অলংকার। উচ্চতায় খুব বড়জোর পাঁচ ফুট পাঁচ। পেটানো চেহারা। যাকে বলা যেতে পারে খুবই আকর্ষণীয়। দেখে মনে হবে এই ধরনের চেহারা ধরে রাখার জন্য খুবই নিয়ম করে চলতে হয়। তবে রীতেশের চোখে ধরা পড়েছিল মেয়েটির হাসি। একটা জাদু ছিল শেষ বসন্তের সকালে।

মেয়েটি গাড়ি থেকে নামতে নামতে রীতেশের চোখের দিকে তাকাল। মনে হলো রীতেশের দিকে একটা মুচকি হাসি ভেসে এলো। রীতেশ চোখ সরাল অন্যদিকে। মহিলা কনস্টেবলরা মেয়েটিকে নিয়ে থানার ভিতরে ঢুকে গেল। বীরবলের দিকে তাকিয়ে রীতেশ জিজ্ঞাসা করল, " তোমার হেফাজতে এত সুন্দরী কয়েদী?" বীরবল একটা অমায়িক হাসি দিয়ে বলল, " আর বলো না। আবার পাড়ার বাইরে বেশ্যাবৃত্তি করতে গিয়েছিল। আগের দিনও সতর্ক করতে এসেছিলাম। শুনল না। আজ তুলে এনেছি।"

এখন বিদায় বসন্তের সমাগম। আকাশের চোখেও অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দেবারতী কথায় 'স'-এর টান ছিল। অসমের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে সে টান যে নতুন কিছু তেমন নয়। তবে সে নিজেও জানে না তার জীবন বৃত্তান্ত। যাযাবরের মতো একবার এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত তার হেঁটে আসা। ঝরা বসন্তের মতো ঝরতে ঝরতে নুইয়ে যাওয়া। জেলের ভিতরে না থেকে একটা গোটা জীবন জেলে থেকে যাওয়া।
"তোমার বাড়ি কোথায়?" রীতেশ জিজ্ঞাসা করল।
"আমি কি জানি বাপু! দেবারতী ভনিতা করে বলল।
" তোমার দেশ কোথায়?"
" আমি যখন যে মালিকের কাছে থাকি সেটাই আমার দেশ।
" তুমি এই কাজ কেন করো?"
" তাহলে কী তুমি আমাকে খেতে দিতে বাপু?" বেশ রাগের সঙ্গে কথাগুলো বলে গেল দেবারতী।
এই ছোট ঘরটায় রীতেশ, দেবারতী, আর বীরবল। হলুদ রঙের একটা বাল্ব জ্বলছে ঘরে। করিবর্গার ছাদ থেকে একটা পুরোনো ফ্যান ঝুলছে। একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার ছাড়া একটা লম্বা বেঞ্চ রয়েছে। এই ঘরে কোনও জানালা নেই। দুটো ভেন্টিলেটর আছে মাত্র। একটা বাথরুম আছে বটে তবে তা থেকে প্রচন্ড দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। এই ঘরটাকে পুলিশি পরিভাষায় ইন্টারোগেশন রুম বলা থাকে। যদিও সিনেমায় যেমনটা দেখানো হয় তার থেকে পুরোটাই আলাদা। সিনেমায় দেখানো রুমের যে আভিজাত্য আছে তা এই ঘরের নেই। বীরবলের সুবাদেই রীতেশ এই ঘরে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকতে পারছে। যদিও সেটা খুব একটা আইনসঙ্গত নয় তবুও আইনের চোখ তো বাঁধা থাকে। সে তো অন্ধ। দেবারতী বলে উঠল, " তা বাবু, তোমার এত প্রশ্ন কেন?" কথাগুলোর মধ্যে এমন 'স'-এর টান ছিল যে রীতেশ হেসে উঠল। রীতেশের হাসি দেখে দেবারতী বলে উঠল, " ও বাপু, আমি কি জোকস নাকি?" কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে রীতেশ আর বীরবল এবার একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল।

এক পশলা বৃষ্টির পরে মেঘ সরে গেলে যে সোনাঝরা রোদ ওঠে সেই রোদে ঈশ্বর থাকেন। তিনি সব ভাল করে দেন। কথাগুলো দেবারতী বলল। তবে এখন 'স'-এর দোষটা কিছুটা হলেও কেটেছে। রীতেশের পাল্লায় পড়ে একটু আভিজাত্য এসেছে। তবুও বেশ্যাবৃত্তির তকমা কি সহজে মুছে ফেলা যায়? যে শরীরে দিনের পর দিন কতগুলো অচেনা শরীর সুখ পেয়েছে, সেই শরীর কি এত তাড়াতাড়ি শুদ্ধ হতে পারে? বোরখা পরে এসেছে দেবারতী। এখন বিকেল। পড়ন্ত রোদ ওদের গায়ে এসে পড়ছে। গরিফা অঞ্চলে ছাইঘাটে ওরা অন্তত সপ্তাহে দুদিন দেখা করে। যদিও খুবই নিয়ম মেনে। আসলে যৌনপল্লীর মেয়েদের প্রেমের অধিকার নেই। ভালবাসার ইচ্ছেটাই ওদের জীবনে মৃত। নৈহাটি ঠাকুরপাড়া অঞ্চলের একটা ছোট্ট গলিতে দেবারতীর ঠিকানা। ওটাই ওর পৃথিবী। দুপুর থেকে গভীর রাত অবধি কাজ। কখনও কখনও দিনে দুজন খদ্দের। আবার উৎসবের সময় তিন থেকে চারজনও হয়ে যায়। সবই চলে ফুলমাসির কথায়। এই ফুলমাসি এই গলির ভগবান। আসলে ফুলমাসি একটা পদ। বেশ্যাপল্লীতে এই পদের জন্যই কত দলাদলি হয়। কত মারপিট হয়। ফুলমাসিই বেশ্যাপট্টির শেষ কথা। নৈহাটির ঠাকুরপাড়া অঞ্চলের একটি সরু গলিতে প্রচুর ঘর আছে। সেই ঘরগুলোর বহুকাল ধরেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। বরং বলা চলে সমাজের কিছু বিচ্ছিন্ন নারী এই ঘরে ঠাঁই পেয়েছে। কেউ হয়ত পাচার হওয়া থেকে বেঁচেছে, কেউবা বাড়িতে চরম অত্যাচারের পর ঘরছাড়া হয়ে অভাবের দায়ে এই ঘরে এসে জুটেছে। কেউবা বংশানুক্রমে এই ঘরেই রয়ে গিয়েছে। কম বয়সে অনাথ হয়ে কেউ কেউ এখানে পেয়েছে ঠাঁই। প্রতিটা ঘরের এক একটা গল্প আছে। লিখতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে। নৈহাটির নামকরণের ইতিহাসের সঙ্গেও কিছুটা জড়িত এই গলির কথা। তবে সেটা স্রেফ জনশ্রুতি হতে পারে। আসলে নৈহাটির ইতিহাস বিরাট।

দেবারতী কোনওদিনই ওর অতীত নিয়ে কথা বলতে চাইত না। আসলে অতীত নিয়ে ওর এলার্জি ছিল। অতীতের কথা বললেই সারা গা হাত পা চুলকাতে শুরু করত। অদ্ভুত রোগটা ওকে পেয়ে বসেছিল। রীতেশ বলেছিল, "রেলের ওপারে ড. বিশ্বাসকে দেখিয়ে নেবে চলো।" দেবারতী বলেছিল, " আমাদের একজন ঠিক করা ডাক্তারবাবু আছে, তাকে ছাড়া আমরা কাউকে দেখাতে পারি না। ফুলমাসির বারণ আছে।" দেবারতীর কাছে ফুলমাসি অনেকটা বিগ্রহের মতো। যা বলে সেটাই ঠিক। সেটাই ধ্রুব সত্য। শুধু দেবারতী বলে নয়। দেবারতীর মতো অনেক মেয়ের কাছেই ফুলমাসি বাবা-মায়ের মতো। দেবারতীর মুখেই শুনেছে সে কথা। কারুর শরীর খারাপ হলে ফুলমাসি নাকি প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গত বছর ইন্দুর মারাত্মক পেটে ব্যথা শুরু হলো। হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জানত পারল কিডনিতে পাথর জমেছে। তারপর তার অপারেশন থেকে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত সবটুকু নাকি ফুলমাসি একা হাতে করেছে। রীতেশ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, " পালিয়ে যেতে পারবে না?" দেবারতী বোরখার মধ্যে থেকে বলে উঠল, " ফুলমাসি আমাকে ছাড়বে না! সেই ছোট থেকে গায়ে গতরে বড় করেছে। আমি নাকি অনেক ব্যবসা দিতে পারব! আমাকে দেখে কাস্টমার আসবে..!" কথাগুলো শেষ করতে না দিয়েই রীতেশ ওর মুখটা চেপে ধরল। রাগের সঙ্গে বলে উঠল," বলেছি তো ওইসব কথা না বলতে!" দেবারতী রীতেশের হাতটা সরিয়ে বলল, " এত জোরে আমার মুখ চেপে ধরবে না। খদ্দেরের মতো লাগে।" এবার আর রাগ সহ্য করতে না পেরে রীতেশ সজোরে একটা থাপ্পড় মারল দেবারতীকে।

দিন শুরু সঙ্গে সঙ্গে থানার ভিতরের চিত্রটা কেমন পাল্টে গেল। ব্যস্ততা বেড়ে গেল। অফিসারদের ভিড় বাড়তে শুরু করল। কয়েদীদের কোর্টে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে লাগল। যদিও কয়েদী বলতে রীতেশ একাই। তবে একজন প্রভাবশালী নেতার ছেলেকে গতকাল রাতে পুলিশ আটক করলেও তার রাত কেটেছে বড় বাবুর ঘরে। এই রাজ্যে প্রভাবশালীদের জন্য সবসময় আলাদা ব্যবস্থা হয়। রীতেশের মতো সাধারনেরা চিরকালই মাটির কাছাকাছি থাকে। তাদের জন্য ওইটাই বরাদ্দ। যদিও গতকাল থেকে বীরবলের দেখা নেই। কঠিন সময়ে কাছের মানুষের দেখা পাওয়া যায় না। যদিও বীরবল কি রীতেশের কাছের ছিল ? প্রয়োজন ভিত্তিক সম্পর্ক শুধু প্রয়োজনেই কাজে আসে তাও সেটা আবার দুজনের প্রয়োজনে। এই চার দেওয়ালের ঘরে রীতেশের কেমন দমবন্ধ লাগছে, মাঝেমধ্যে বুকের ভিতরে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। ঘোলাটে লাগছে এই দুনিয়াটা। সকাল গড়াচ্ছে। এবার ধীরে ধীরে প্রতি দিনের মতো এই দিনটাও শুরু হচ্ছে। তবুও রীতেশের ঘোর কাটছে না। চারিদিকে কাশফুলের গন্ধ। আর তিনদিন বাদেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ। মায়াবী রোদে খেলা করছে সুখেরা। এখন দেবীপক্ষ। এই সময়টা অদ্ভুত একটা মুক্তির স্বাদ লেগে থাকে, আনাবিল আনন্দ লেপ্টে থাকে সবকিছুতেই। দেবারতীরও মুক্তি চেয়েছিল। চেয়েছিল এই দেবীপক্ষে সেও সর্বোত্তম হয়ে উঠুক। তার জীবন থেকে মুছে যাক পুরোনো দিনের গ্লানি, কালিমা। এই রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠুক তাঁর জীবনের বাকি দিনগুলো।
এখন ঘড়িতে আটটা। একজন ভদ্রলোক একটা বড় সুটকেস নিয়ে এসে থানার বাইরে অপেক্ষা করছে। একজন সিভিক পুলিশ এসে রীতেশের সেলের বাইরে দাঁড়াল। তারপর সেলের তালাটা খুলে দিল। রীতেশ প্রথমে একটু অবাক হলো। তারপরে সেই ভদ্রলোক সোজা রীতেশের সেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। রীতেশ একটু ঘাবড়ে গেল। তারপরে সেই মাঝবয়সী ভদ্রলোক বলল, ‘’ সোজা হয়ে দাঁড়াও।‘’ সে এবার তাঁর বড় সুটকেস থেকে স্টেথোস্কোপ বেড় করল। রীতেশ এবার বুঝতে পারল, কোর্টে নিয়ে যাওয়ার আগে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। খেঁকো গলায় তিনি বললেন, ‘’ জামা-প্যান্ট খুলে দাঁড়াও।‘’ রীতেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে হাঁ করে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ধমকের সুরে বলল, ‘’ খোলো সব। নাকি পুলিশ ডাকতে হবে।‘’ এতক্ষণ পরে রীতেশের খেয়াল পড়ল, তার জামায় চাপ চাপ রক্তের দাগ। তার ঘাড়ের কাছে এখনও দগদগে কামড়ের চিহ্ন। এখনও সময়টা দেবারতীর কোলেই থমকে।
দেবারতী বলল, ‘’ তুমি আমার নতুন দেশ হবে ?’’ রীতেশ হুট করে কোল থেকে উঠে বলল, ‘’ কী বললে ?’’ দেবারতী আবার বলে উঠল, ‘’ আমার নতুন মালিক হবে ?’’ কথাগুলো শেষ করে দেবারতী হা হা করে হেসে উঠল। রীতেশের মাথায় আগুন চেপে গেল। সজোরে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল দেবারতীর গালে। তারপরে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘’ মাগী, দেখ আজ তোর কী করি।‘’ কথাগুলো বলার পরেই, দেবারতীর ঠোঁটে কামড়াতে শুরু করল। তারপরে ঘাড়ে! দেবারতীর হাসির ছলে বলে উঠল, ‘’ ওইটুকু ব্যথায় আমাদের কিছু হয় না!’’ বলে সেও রীতেশের ঘাড়ে একটা কামড় বসিয়ে দিল। রীতেশের মাথায় আরও রক্ত চেপে গেল। সে আরও হিংস্র হয়ে উঠল। দেবারতীর ব্লাউজ ছিঁড়ে দিল। তারপরে তার কালো ব্রা খুলে ওর বুকটা নিজের মুখের কাছে নিল। বক্ষবৃন্তে কামড় দিতে লাগল। দেবারতী কিছুটা মোহিত গলায় বলে উঠল, ‘’ তুমি আমাকে মুক্তি দিতে পারবে ?’’ রীতেশের কানে তখন কোনও কথা ঢুকছে না। সে তখন উন্মাদ হয়ে উঠেছে। দেবারতী আবার বলল, ‘’ তুমি আমার নতুন দেশ হবে ?’’ রীতেশ তখন নাভির কাছে , দেবারতীর শরীর অর্ধউলঙ্গ। কোনও কথা রীতেশ তখন আর শুনতে পাচ্ছে না। দেবারতী বলল, ‘’ আমাকে বিয়ে করবে?’’ রীতেশ থেমে গেল। সারা শরীরে একটা শিহরণ বয়ে গেল। নাভির কাছ থেকে উঠে এসে সে দেবারতীকে জড়িয়ে ধরল। গালে চুমু খেল। কপালে চুমু খেল। তারপর আবার আদর করতে শুরু করল। দেবারতী বলে উঠল, ‘’ আমাকে বাইরেও কাজ করতে দেবে তো? ফুলমাসি কিন্তু আমাকে ছাড়বে না। আমার প্রছুর কাস্টমার।‘’ এবার রীতেশ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। মাথার কাছে টেবিলের অপর একটা ফুলদানি ছিল, সেটা তুলে নিয়েই রীতেশ পরপর দেবারতীর মাথায় আঘাত করতে থাকল। যতক্ষণ না পর্যন্ত মাথার ঘিলু বেরিয়ে এলো, ততক্ষণ পর্যন্ত রীতেশ আঘাত করতে থাকল।
রীতেশকে সেল থেকে বের করা হলো। তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । চারিদিকে একটা মোলায়েম রোদ খেলে বেড়াচ্ছে। আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ। ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। রীতেশের নীল জামায় চাপ চাপ কালির দাগ। মুখে অস্পষ্ট একটা কষ্ট তবুও নীরব। দমকা হাওয়া ভেসে আসছে। রীতেশের কোমরে দড়ি, হাতে হ্যান্ডক্যাপ। বাকি কয়েদীদের মতোই তার ব্যবস্থা। গাড়িতে উঠতে উঠতে দেবারতীর কথা মনে পড়ল রীতেশের। একদিন সে তাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেছিল আর আজ সে কয়েদী। দেবারতী এখন অন্য দেশে। সে এখন নিজেই নিজের মালিক। কোনও ফুলমাসি তাকে আর বিরক্ত করছে না। সে এই দেবীপক্ষে এক দেবীকে মুক্তি দিয়েছে। এটা ভেবেই একটা তৃপ্তি পাচ্ছে রীতেশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্তির হাসি হেসে গাড়িতে উঠল সে। কাশফুলের গন্ধ তার গায়ে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্তের গন্ধকে হার মানিয়েছে। ঢাকের শব্দে দেবারতীর আর্তনাদের আওয়াজ মিলিয়ে গেছে। দেবীপক্ষে আর এক দেবী সর্বোত্তম হয়ে উঠেছে । রীতেশ মুক্তি দিয়েছে একটা দিনের, একটা অধ্যায়ের।

ট্যাগসূচী:#story
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev