বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

দেবীর দেশ

ওরা হাওয়ার মতো বয়ে চলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সন্ধে হলে বড় রাস্তার বহমানতা ছেড়ে এসে দাঁড়ায় গলির মদ্যিখানে, সবুজ আলো মেখে ঢুকে যায় ছোট্ট ছিমছাম ক্যাফেটেরিয়ার ভিতর।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

দেবীর দেশ
|দেবীর দেশ


গলায় ধূসর রঙের গলাবন্ধ জড়ানো ছেলেটার খিন্ন শরীরে কালো জামা, মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত ভাবে উঠে এসেছে। পায়ে কমদামী জুতো, পকেটও মরুভূমির মতো ধু ধু বালি আর শূন্যতায় ভরা। প্রতিদিনের মতো ওরা মিত্র পাড়ার রাস্তা ধরে এসে দাঁড়াল একটা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। যে ক্যাফেটেরিয়ার মাথায় জ্বলে সবুজ আলো। দু'দিক দেখা যাওয়া পর্দার এপার ওপার জুড়ে হলুদ আলোর মেহফিল খেলা করে দিনরাত। পর্দার ওপারে এক সুন্দরী মহিলা বসে থাকেন।মনে হয় ধ্যানরত কালপুরুষের মতো উজ্জ্বল। লোক আসলেই তিনি হেসে ওঠেন। এগিয়ে দেন সূচীপত্র। কালো জামা পরা ছেলেটার সঙ্গে থাকে তার চেয়ে বয়সে ছোট এক বন্ধু। ফর্সা, রোগা ছেলেটা ততদিনে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকধাপ। কিনেছে সবুজ রঙের এনফিল্ড। তবুও ওই কালো জামা পরা ছেলেটার পায়ের নীচে সর্ষে। চোখের তলায় নৈহাটির ইতিহাস। কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে বেকারত্বের দিনলিপি। তবুও ওদের মধ্যে খেদ নেই। ওরা হাওয়ার মতো বয়ে চলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সন্ধে হলে বড় রাস্তার বহমানতা ছেড়ে এসে দাঁড়ায় গলির মদ্যিখানে, সবুজ আলো মেখে ঢুকে যায় ছোট্ট ছিমছাম ক্যাফেটেরিয়ার ভিতর। ওখানে গান বাজে। হাতে গোনা কয়েকটা চেয়ার টেবিল মাঝে মধ্যেই ভিড়ে ঠাসা থাকে। আবার কখনও ধু ধু শূন্যতা খেলে বেড়ায় গোটা ক্যাফেটেরিয়া জুড়ে। তখন শুধু সেই মহিলার সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগে না।

শিয়ালদহ শাখার মেন লাইন এক ঘণ্টা ট্রেন সফর করলে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় নৈহাটি। ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে ওঠা এই আধা শহর, পূর্ণ মফস্বলের বুকে বড় হয়ে উঠেছে ওই কালো জামা পরা ছেলেটা। দেখেছে হলুদ বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে নৈহাটি জংশন। সমরেশ বসু, শ্যামল মিত্রের ভূমিতে বড় হওয়া সেই ছেলেটি জীবনের শুরুতে লিটিল ম্যাগাজিন করেছে। কবিতা লিখেছে অশনিসংকেত পত্রিকায়। ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা থেকে পড়াশুনা শেষ করে বয়ে গিয়েছে আপন নোঙরে। গঙ্গার পারে তৈরি এই স্কুলের প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে গঙ্গা দেখা যায়। দেখা যায় সদ্য গজিয়ে ওঠা চর। ছেলেটি অবাক হয়ে শুধু দেখে গিয়েছে ভাগীরথীর বয়ে যাওয়া। সে তখনও জানত না একদিন এই ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে উঠবে তার লেখা প্রথম উপন্যাস। যে উপন্যাসে বারবার ফিরে ফিরে আসবে তার শৈশব।যে উপন্যাসে ভেসে উঠবে তার ফেলে আসা স্কুলের ছায়া। যে উপন্যাসের শিরায় উপশিরায় বিঁধে যাবে একটা খুচরো প্রেমের মাইলফলক। আমরা কি সবটা ভাবতে পারি? জীবনের প্রতিটি দিন কি হিসেব মতো হতে পারে? হিসেবের বাইরে চলে যায় কতকিছু, কত সময়, কত কথা, কত প্রেম!

ভাগীরথীর পূর্বে তখন এক বিচ্ছিন্ন জনপদের মতো বেঁচে ছিল আজকের নৈহাটি। নাম ছিল না। ছিল না কোনও পরিচয়। তখন এই বিচ্ছিন্ন জনপদে হট্টবিলাসিনীদের বসবাস শুরু হল। সেই হট্টবিলাসিনীদের তাড়নায় গড়ে উঠল দেশি পানশালা। আসতে শুরু করে পার্শ্ববর্তী জনপদের লোকজন। ভাগীরথীর পথ বেয়ে বয়ে চলা বণিক, জমিদারও এই নামহীন জনপদে ফেলতে শুরু করে নোঙর। এই জনপদের পশ্চিমে তখন সাতগাঁ। সেই সূত্রে এই নামহীন জনপদ বয়ে যাওয়া মহাজন, বণিক, জমিদার, ইংরেজদের নজরে আসে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটা খিন্ন জীবন। প্রথম পর্যায়ে নিম্ন বর্গের মানুষদের বসবাস শুরু হয়। তখন এই অঞ্চলে নেপিয়ার নামক এক ঘাসের দেখা পাওয়া যেত। সেই ঘাস থেকে এই বিশেষ উপায়ে তৈরি হতে শুরু করে গুড়। সেই গুড়ের বিক্রির জন্য বসতে লাগল হাট। তখন এই হাটের জন্য এই জনপদকে গুড়ের হাট বলা হত। যদিও সেই হাটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হট্টবিলাসিনীরা। কালক্রমে সেই জনপদের নাম হয়ে উঠল নটিহাটি এবং পরে সেই থেকে নৈহাটি। সেই নৈহাটির বুকে একের পর এক কত ইতিহাস গেঁথে থাকে, কত প্রেম, কত উড়োচিঠি বয়ে গিয়েছে ভাগীরথীর পথ বেয়ে। সেই সব উড়োচিঠিকে বুকে নিয়ে সেই কালো জামা পরা ছেলেটির বড় হওয়া। ছেলেটির ডাক নাম রাতুল। বাড়ি, মামারবাড়ি সব জায়গায় সে রাতুল নামে পরিচিত। তবুও তার একটি ভাল নাম আছে। যে নামে তৈরি হয়েছে তার পরিচয়পত্র। তবুও তার ডাকনাম বেশি প্রিয়।

তখন ঝরা পাতার মরশুম। নৈহাটি জুড়ে উদাসীন স্থবিরতার হাহাকার। নৈহাটির বুকে তৈরি সেই সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফে তখন রাতুলের সন্ধের একমাত্র আশ্রয়। শাল শিমূল পলাশের মদ্যিখান থেকে ছুটে যাওয়া জীবনের মতো রাতুলের হৃদস্পন্দন, একলা উড়ে চলা পাখির মতো তার মনোভাব। প্রতিদিনের এক কাপ গ্রীন টি তার বরাদ্দ ছিল সেই ক্যাফেতে। শিরশির করে ওঠা হাওয়ার ইঞ্জেকশনকে উপেক্ষা করেও ছেলেটা প্রতিদিন সন্ধে হলে হাজির হতো সেই সবুজ আলো জ্বালা ক্যাফের ভিতর। মিত্র পাড়ার বুকের ভিতর অনেক প্রকোষ্ঠ। এককালে নৈহাটিতে বসবাসকারী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই মিত্রপাড়ায় আস্তানা গেড়েছিল। তৈরি হয়েছিল গোপন কুঠির। সেইসব ইতিহাসের খোঁজ এখন অতলে। এই আধা মফঃস্বল এখন তাঁর সোনালী গৌরব হারিয়ে দিকশূন্যপুরে। রাতুলের শৈশব বারবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে কিছু প্রশ্নের দিকে। যেখানে সে খুঁজেছে কৃষ্ণচূড়ার ব্যাকুলতাকে। খুঁজেছে তাঁর জন্মের গভীরতাকে।

এক সন্ধেতে রাতুল এসে দাঁড়িয়েছে সেই ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। বুক জুড়ে এক উদাসীন ভবিষ্যতের হাতছানি শুধু। তখনও ক্যাফেতে বসেনি কাঁচের দরজা। সাদা প্ল্যাস্টিকের পর্দা দিয়ে বিছিন্ন করে রাখা ছিল সেই ক্যাফের প্রবেশদ্বার। তখন ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগ। রাতুল সেদিন ক্যাফেতে প্রবেশ করতেই একফালি গন্ধ আছড়ে পড়ল তার বুকে। ক্যাফের মালকিন হেসে উঠলেন। অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, 'কী খাবে?' রাতুল বসল ক্যাফের দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকের টেবিলে। টেবিলের বিপরীতে মাটিতে রাখা এক মোটা কুশান। রাতুলের সঙ্গে তার চেয়ে কম বয়সী সেই যুবক। রাতুল চায়ে চুমুক দিতেই একটা এলেমেলো হাতছানি ঘিরে ধরল তাকে। মুখ ফিরিয়ে দেখল, একটা মেয়ে এসে বসেছে সেই মোটা কুশানে। শ্যামলা গায়ের রঙ। চুলের শেষে সোনালী কারুকার্য। চোখের নীচে কালো কালি। পরনে দামী ট্র্যাক শুট। বাঁ হাতের অনামিকায় প্ল্যাটিনামের আংটি। সেখানে চকচক করছে একটা পুচকে হিরে। রাতুল তাকিয়ে রইল একভাবে। হাওয়া ভেসে এলো। ভেসে এলো ভাঙা শৈশব। রাতুল তাকিয়েই রইল। মেয়েটার গাল টোল পড়েছে। উড়ুক্কু চুলগুলো চোখের সামনে এসে বিরিক্ত করছে। রাতুলের খুব ইচ্ছে হল, চোখের সামনে চুলগুলো সরিয়ে দিতে। যে চুলগুলো সরালেই একরাশ ইতিহাস ধেয়ে আসবে নিরাসক্ত জীবনে। যে চুলগুলো সরালেই খুঁড়ে পাওয়া যাবে নৈহাটির প্রত্নতত্ত্ব।

রাতুলের জীবনে প্রেম অনেকটা কালো মেঘের মতো সহজ। তবুও প্রেম তো সহজ নয়। সে বারবার মায়াময়। রাতুলের জীবনে বহুবার প্রেম এসেছে। চলেও গিয়েছে উড়ো হাওয়ার মতো। তবুও এই মেয়েটাকে দেখে রাতুলের বারবার মনে হল, এ এক ইতিহাসের সমান। এমনটা আগে হয়নি। সত্যি হয়নি। কী ছিল মেয়েটার মধ্যে যা রাতুলকে বারবার ব্যাকুল করে তুলেছিল? রাতুল কি তখন জানত খুব শীঘ্রই সে হয়ে উঠবে প্রত্নতাত্ত্বিক। খুঁজতে বেরোবে তার জন্মভূমির ইতিহাস। যে ইতিহাসকে সঙ্গে রেখে, বাঁদিকে বঙ্কিম লাইব্রেরি, মিত্র পাড়া, গরিফার বিস্তীর্ণ পথ বেয়ে সে এগিয়ে যাবে এক অনন্ত স্বপ্নের দিকে। যে ব্যাকুলতা তাকে দিয়ে লেখাবে ভাগীরথীর পূর্বে। যে প্রেম তাকে ঘুমোতে দেবে না।যে প্রেম থেকে জন্ম নেবে এক নতুন দেশ, দেবীর দেশ।
(পরবর্তী পর্ব আগামী রবিবার)

ট্যাগসূচী:#Naihati#Garifa#Love#Life#History
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev