গলায় ধূসর রঙের গলাবন্ধ জড়ানো ছেলেটার খিন্ন শরীরে কালো জামা, মাথার চুলগুলো অবিন্যস্ত ভাবে উঠে এসেছে। পায়ে কমদামী জুতো, পকেটও মরুভূমির মতো ধু ধু বালি আর শূন্যতায় ভরা। প্রতিদিনের মতো ওরা মিত্র পাড়ার রাস্তা ধরে এসে দাঁড়াল একটা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। যে ক্যাফেটেরিয়ার মাথায় জ্বলে সবুজ আলো। দু'দিক দেখা যাওয়া পর্দার এপার ওপার জুড়ে হলুদ আলোর মেহফিল খেলা করে দিনরাত। পর্দার ওপারে এক সুন্দরী মহিলা বসে থাকেন।মনে হয় ধ্যানরত কালপুরুষের মতো উজ্জ্বল। লোক আসলেই তিনি হেসে ওঠেন। এগিয়ে দেন সূচীপত্র। কালো জামা পরা ছেলেটার সঙ্গে থাকে তার চেয়ে বয়সে ছোট এক বন্ধু। ফর্সা, রোগা ছেলেটা ততদিনে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকধাপ। কিনেছে সবুজ রঙের এনফিল্ড। তবুও ওই কালো জামা পরা ছেলেটার পায়ের নীচে সর্ষে। চোখের তলায় নৈহাটির ইতিহাস। কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে বেকারত্বের দিনলিপি। তবুও ওদের মধ্যে খেদ নেই। ওরা হাওয়ার মতো বয়ে চলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। সন্ধে হলে বড় রাস্তার বহমানতা ছেড়ে এসে দাঁড়ায় গলির মদ্যিখানে, সবুজ আলো মেখে ঢুকে যায় ছোট্ট ছিমছাম ক্যাফেটেরিয়ার ভিতর। ওখানে গান বাজে। হাতে গোনা কয়েকটা চেয়ার টেবিল মাঝে মধ্যেই ভিড়ে ঠাসা থাকে। আবার কখনও ধু ধু শূন্যতা খেলে বেড়ায় গোটা ক্যাফেটেরিয়া জুড়ে। তখন শুধু সেই মহিলার সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই ভাল লাগে না।
শিয়ালদহ শাখার মেন লাইন এক ঘণ্টা ট্রেন সফর করলে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় নৈহাটি। ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে ওঠা এই আধা শহর, পূর্ণ মফস্বলের বুকে বড় হয়ে উঠেছে ওই কালো জামা পরা ছেলেটা। দেখেছে হলুদ বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে নৈহাটি জংশন। সমরেশ বসু, শ্যামল মিত্রের ভূমিতে বড় হওয়া সেই ছেলেটি জীবনের শুরুতে লিটিল ম্যাগাজিন করেছে। কবিতা লিখেছে অশনিসংকেত পত্রিকায়। ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা থেকে পড়াশুনা শেষ করে বয়ে গিয়েছে আপন নোঙরে। গঙ্গার পারে তৈরি এই স্কুলের প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে গঙ্গা দেখা যায়। দেখা যায় সদ্য গজিয়ে ওঠা চর। ছেলেটি অবাক হয়ে শুধু দেখে গিয়েছে ভাগীরথীর বয়ে যাওয়া। সে তখনও জানত না একদিন এই ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে উঠবে তার লেখা প্রথম উপন্যাস। যে উপন্যাসে বারবার ফিরে ফিরে আসবে তার শৈশব।যে উপন্যাসে ভেসে উঠবে তার ফেলে আসা স্কুলের ছায়া। যে উপন্যাসের শিরায় উপশিরায় বিঁধে যাবে একটা খুচরো প্রেমের মাইলফলক। আমরা কি সবটা ভাবতে পারি? জীবনের প্রতিটি দিন কি হিসেব মতো হতে পারে? হিসেবের বাইরে চলে যায় কতকিছু, কত সময়, কত কথা, কত প্রেম!
ভাগীরথীর পূর্বে তখন এক বিচ্ছিন্ন জনপদের মতো বেঁচে ছিল আজকের নৈহাটি। নাম ছিল না। ছিল না কোনও পরিচয়। তখন এই বিচ্ছিন্ন জনপদে হট্টবিলাসিনীদের বসবাস শুরু হল। সেই হট্টবিলাসিনীদের তাড়নায় গড়ে উঠল দেশি পানশালা। আসতে শুরু করে পার্শ্ববর্তী জনপদের লোকজন। ভাগীরথীর পথ বেয়ে বয়ে চলা বণিক, জমিদারও এই নামহীন জনপদে ফেলতে শুরু করে নোঙর। এই জনপদের পশ্চিমে তখন সাতগাঁ। সেই সূত্রে এই নামহীন জনপদ বয়ে যাওয়া মহাজন, বণিক, জমিদার, ইংরেজদের নজরে আসে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটা খিন্ন জীবন। প্রথম পর্যায়ে নিম্ন বর্গের মানুষদের বসবাস শুরু হয়। তখন এই অঞ্চলে নেপিয়ার নামক এক ঘাসের দেখা পাওয়া যেত। সেই ঘাস থেকে এই বিশেষ উপায়ে তৈরি হতে শুরু করে গুড়। সেই গুড়ের বিক্রির জন্য বসতে লাগল হাট। তখন এই হাটের জন্য এই জনপদকে গুড়ের হাট বলা হত। যদিও সেই হাটের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হট্টবিলাসিনীরা। কালক্রমে সেই জনপদের নাম হয়ে উঠল নটিহাটি এবং পরে সেই থেকে নৈহাটি। সেই নৈহাটির বুকে একের পর এক কত ইতিহাস গেঁথে থাকে, কত প্রেম, কত উড়োচিঠি বয়ে গিয়েছে ভাগীরথীর পথ বেয়ে। সেই সব উড়োচিঠিকে বুকে নিয়ে সেই কালো জামা পরা ছেলেটির বড় হওয়া। ছেলেটির ডাক নাম রাতুল। বাড়ি, মামারবাড়ি সব জায়গায় সে রাতুল নামে পরিচিত। তবুও তার একটি ভাল নাম আছে। যে নামে তৈরি হয়েছে তার পরিচয়পত্র। তবুও তার ডাকনাম বেশি প্রিয়।

