যে পথ বেয়ে এক সময় নিগ্রো সৈন্যরা হেঁটে গিয়েছিল নৈহাটির বুক চিরে, সেই পথে তুমি কখনও হেঁটে গিয়েছ? পলাশীর যুদ্ধের জন্য একরাত তাঁবু পড়েছিল নৈহাটির মাটিতে, সেই মাটিতে তুমি বড় হয়েছ। নিজে হাতে গড়ে তুলেছ তোমার ফুলের বাগান। টবে জন্ম দিয়েছ হাইড্রেনজিয়ার। কী অদ্ভুত সেই নাম! তোমার সঙ্গে আলাপ না হলে রাতুল জানতেই পারত না, এই নামে এক ফুল আছে। যে ফুল তোমার প্রিয়। যে ফুল রাতুলের প্রিয়। ভালবাসা একে অন্যের প্রিয় জিনিসগুলোকে কত সহজে মিলিয়ে দিতে পারে। এই জন্যই ভালবাসার মতো অনুঘটক হয়ত আর দুটো নেই। নৈহাটির বুকে বড় হওয়া একটা মেয়ে ছুটে গেল সান্তার দেশে। যে দেশে বরফ পড়ে বারোমাস। শীতে উষ্ণতা থাকে মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি। ওই দেশের লোকেরা প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলে না। সবুজ ঘেরা দেশে কালো পিচের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যায় বহুদূর। দু'পাশে উঁচু উঁচু গাছ, কোথাও কোথাও ম্যাপেল গাছ এঁকে দিয়েছে হলদে রাস্তার খোঁজ। ও দেশে গাড়ির হর্নের আওয়াজ প্রায় শোনা যায় না। চারিদিকে হ্রদ আর সবুজ। নীল আকাশ বারবার প্রতিফলিত হয়ে ওঠে সেই স্বচ্ছ জল আর সবুজে। যে সবুজে তুমি স্নান করেছিলে প্রতিদিন। ভালবেসে বাসা বেঁধেছিলে ফিনল্যান্ডে। সহবাস করেছিলে নগ্ন নির্জনতার সাথে। তখন রাতুল জানেই না এই নামে একটা দেশ আছে। যে দেশ, প্রতিবছর বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশের খেতাব অর্জন করে। যে দেশে হারিয়ে গেলে সহজেই ফিরে পাওয়া যায় ওয়ালেট। যেখানে দোকানে দোকানদার থাকে না অথচ মানুষ জিনিস নিয়ে নির্দিষ্ট দাম মিটিয়েই যায়। কী অদ্ভুত সেই দেশ, যেখানে ফুটে ওঠে অরোরা বোরিয়ালিস।
নৈহাটির আকাশে কালপুরুষ দেখে বড় হয়েছে রাতুল। গরিফার এক কোণে, শতাব্দী প্রাচীন বাড়িতে বড় হওয়া রাতুল জানত, এ জীবনের ভাল থাকা মানে মাসের চারটে রোববার খাসির মাংস খাওয়া। রাতুলের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায় গরিফা মিলের উঁচু চিমনি। সেই চিমনির পাশে একটা পলাশ গাছ। যে গাছে দেবীর জন্মদিনের দিন ফুটে থাকে লাল পলাশ। প্রতি শীতে একই সোয়েটার পরে রাতুল তাকিয়ে থেকেছে ওই গাছটার দিকে। কীসের মোহে নেশার মতো সে চেয়ে থেকেছে বন্ধ হওয়া মিলের উঁচু উঁচু গাছগাছালির দিকে। সরু গলির দিয়ে ঢুকে রাতুলদের প্রাচীন বাড়ি। যে বাড়ির গা ঘেঁষে প্রতিদিন নিয়ম করে বসেছে বাংলা মদের আসর। ধেয়ে এসেছে গাঁজার গন্ধ। দুপুর হলেই বসেছে জুয়ার আড্ডা। রাতুল সবটা মুখ বুঝে দেখেছে। দেখেছে একটা মধ্যবিত্ত জীবনের হালহকিকত। দেখেছে গোবর পেরিয়ে আসা খিস্তিখেউরের দিনলিপি। গরিফার অনেক প্রকোষ্ঠ। যে প্রকোষ্ঠে রয়েছে গৌরিভা থেকে গরিফা হয়ে ওঠার ইতিহাস। নৈহাটির উত্তর প্রান্তে গরিফার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভিন্ন জনজাতির জীবন। এককালে নামকরা গরিফা জুটমিলের জন্য এখানে বিহার, উত্তর প্রদেশ থেকে আসতে শুরু করে অবাঙালিরা। ভাগীরথীর পারে গড়ে তোলে আস্তানা। শুরু হয় মধ্যপন্থার জীবনযাপন। গরিফা জুটমিলের প্রধান ফটকের বাইরে একটা রেললাইন এখনও অপেক্ষায় থাকে তোমার। যে রেললাইন জুড়ে দিয়েছে তোমার ব্যাকুলতা আর রাতুলের শৈশবকে। যে ধুলো পড়া রেললাইন পেরিয়ে একদিন রাতুল দেখতে যাবে দেবীর দেশ।
রাতুল নিজেও কোনওদিন জানত না, সে ছোট্ট গরিফার মানচিত্র ছেড়ে খুঁজে নেবে অন্য একটা জগত, যে জগত দেবীময়। সেই সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফে রাতুলের তখন একমাত্র আশ্রয়। দেবী হাঁটতে যেত রোজ বিকেলে। মিত্র পাড়ার সরু গলি দিয়ে এগিয়ে, তারক স্যারের বাড়ি বাঁ হাতে রেখে সে এগিয়ে চলত রোজ। আর একটু এগোলেই পড়ত বঙ্কিম লাইব্রেরি। যে লাইব্রেরিতে রাতুল কিছু বছর বাদে খুঁজতে যাবে নৈহাটির ইতিহাস। সবকিছুই কি পূর্বনির্ধারিত? সবকিছুই কি আগে লেখা হয়ে গিয়েছে? এই জীবনের কিছু মুহূর্তে মনে হয় সবটাই তো প্রিপ্ল্যান। দেবীর চোখের তলায় তখন না হওয়া ঘুমের ছাপ। মুখে করুণ বিষণ্ণতা। তবুও রাতুলের চোখ আটকে গিয়েছিল ওই বিষণ্ণতায়। প্রতিদিন সে ফন্দি এঁটে পৌঁছে যেত ওই ক্যাফেয়। যদি একবার দেবীর দেখা পাওয়া যায়। দেবীর জন্য তখন প্রাণ উজাড় ছেলেটার। ফিনল্যান্ডের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস দেখে যেমন সবাই হতবাক হয়ে যায়, তেমনি দেবীকে একবার দেখে থমকে যেত রাতুল। উড়ুক্কু চুলগুলোর ওপারে জোনাকি জ্বলা চোখ। চোখের ভিতরে একটা জীবন। একটা জীবনের ভিতরে অনেক অনেক আলো আর ইতিহাসের হাতছানি। দেবীর দেশ: পর্ব ১ ক্যাফের মালকিনের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল দেবী। সেই সুন্দরী মহিলা, যিনি ধ্যানরত হয়ে বসে থাকেন ক্যাফেতে। একটা গাড়ির গ্যারেজকে উনি ক্যাফে বানিয়েছিলেন। নৈহাটিতে তখনও ক্যাফে কালচার গড়ে ওঠেনি। নৈহাটি তখনও নাবালক। বোঝেনা শঙ্খ আর তুলসী মঞ্চের উদাসীনতা। সেই মহিলারও দেবীর মতো গাছের শখ, ফুলের শখ। তাই দেবীর সঙ্গে তার হৃদ্যতা প্রবল। রাতুল জানত দেবীর দেশে ঢুকলে হলে, এই মহিলাই পথ দেখাতে পারেন। রাতুল তার খিন্ন জীবনের ইতিহাস নিয়ে এসে দাঁড়াল সেই মহিলার কাছে। কয়েকটা লিটিল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কবিতা পড়াল। মহিলা হাসলেন। তিনি বললেন, তুমি মেয়েটির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকো কেন? রাতুল একমুঠো বিস্ময় নিয়ে ওনার দিকে তাকাল। মহিলা আবার হেসে বললেন, সবটা বোঝা যায়। মেয়েদের অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা থাকে। সহজাত সেই ক্ষমতা। তারা একটা বয়সের পরে সবটা বুঝতে পারে। জন্ম, বড় হয়ে ওঠা, প্রেম, ব্যথা, বিয়ে, শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি, না হওয়া ইচ্ছে সবটা পাথেয় করেই তো একটা মেয়ের জীবন। সেই জীবনে সব আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে একটি মেয়ের পথচলা। পথ চলতে চলতে একটা সময় থমক লাগে, মনে হয় কী করলাম, কেন করলাম, তারপর একরাশ চিন্তা, মাইগ্রেন। মাইগ্রেন ছিঁড়ে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া নিজের সুখের হিসেব। জীবনের সব গভীরতার, সব রহস্যের সমাধান করার ক্ষমতা আরও সুগভীর হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সবটা বুঝতে পারে। সেই মহিলাও বুঝতে পেরেছিল রাতুলকে। যে দেবীর মোহে পড়েছে।

