এক সন্ধেবেলা দেখা হল দু'জনের। তখন মার্চের শুরু। বিদায়ের পথে বসন্ত তবুও দেবীর দেশে তখন বসন্তের প্রাক লগ্ন। তুমি এলে চুড়িদার পরে। চোখের নীচে ঘুম না হওয়া রাতের দাগ। মুখে আতঙ্কের ছাপ।
আদিত্য ঘোষ
৩ অক্টোবর, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ
|দেবীর দেশ
মধ্যরাতে গোঙানির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছে মেয়েটার। চোখের নীচে পলি জমেছে। ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে উঠেছে একটা জনপদ। যে জনপদের অলিগলি দেখেছে তোমার মেয়েবেলা।দেখেছে ফ্রক পরা জীবন। শুষে নিয়েছে ক্লান্ত কঠিন ব্যথার হাহাকার। তোমার বাড়ির জানলা থেকে দেখা যায় তরুণ সংঘের ক্লাব। লাল সাইনবোর্ড জ্বলজ্বল করে সারাদিন। তারপাশে একটা পানা ভর্তি পুকুর। সেই পুকুরকে স্থানীয়রা বলে ভূত পুকুর। তোমার গ্রিল ঘেরা বারান্দা থেকে এই পুকুরটা স্পষ্ট দেখা যায়। দেখা যায় তরুণ সংঘ ক্লাবের উপরিভাগ। মোজাইকের মেঝে দিয়ে ঘেরা বারান্দা থেকে তুমি চেয়েছিলে খিন্ন নৈহাটির ইতিহাসের দিকে। যে ক্লাব এককালে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের গুপ্ত ঠিকানা, সেই ক্লাব দীর্ঘদিনের বহমানতায় হয়ে উঠেছে বেমানান। তুমি কি জানতে এই ক্লাবেই একটা সময় ইংরেজদের প্রতিহত করার কত কারসাজি করা হয়েছে? এই ক্লাবের রাস্তা ধরে একদিন তোমাকে খুঁজতে এসে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে রাতুল। দেখেছে মিত্রপাড়ার ব্যাকুলতাকে। তবুও তোমার খোঁজ সে ছাড়েনি। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে সে এসেছে ভাগীরথীর পূর্বে। সে খুঁজে পেয়েছে একটা ফড়িং পোষা মেয়ের দিনলিপি।
' একদিন দেখা হতে পারে?' তখন সদ্য দু'একটা কথা শুরু হয়েছে। আপনি থেকে তুমিতে এসেছে সম্বোধন। সন্ধে নেমেছে। শাঁখ বেজেছে ক্লান্ত নৈহাটির বুকে। উত্তর এল,'দেখা যাবে।' রাতুল খুশিতে মশগুল হয়ে উঠল। তার রোগা শরীরে তখন উড়ন্ত তারাদের ছায়া। কে জানত সেই ছায়া আরও দীর্ঘতর হবে। আরও ব্যাপ্তি নিয়ে রাতের আকাশে ভেসে উঠবে এক অদ্ভুত মরুজ্যোতি। যে মরুজ্যোতির রাতুলকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে এক দিকশুন্যপুরে। রাতের আকাশে রাতুলের ছাদ থেকে দেখা যায় অন্ধকারছন্ন জীর্ণ বাড়িগুলো। আমগাছের উপর এসে পড়ে লাইটপোস্টের আলো। বাংলা মদের গন্ধ ভেসে আসে। আকাশের দিকে তাকালে ভেসে উঠে রাতুলের ছোটবেলার দিনগুলো। ভেসে ওঠে সবুজ কালপুরুষ। দেবীও এই আকাশের দিকে তাকিয়ে শৈশব কাটিয়েছে। তারা খসা দেখতে দেখতে প্রার্থনা করেছে, সবটুকু যেন ভাল হয়। তবুও দেবীর চোখের তলায় পলি জমেছে। বুক দুরুদুরু করে উঠেছে মধ্যরাতে। কোলবালিশকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছ বারবার। তুমি কি জানতে রাতুল তোমার জীবনে আলো হয়ে আসবে একদিন? তোমার চলে যাওয়ার পরেও সেই আলো অমলিন হয়ে থাকবে। তোমাকে দিয়ে যাবে এক টুকরো জয় গোস্বামী। যে বইয়ের শুরুতে রাতুল লিখে দেবে,'আরও ভাল থাকার জন্য।'
নিজস্ব ছবি
তোমার বইয়ের তাকে জায়গা পেয়েছে শিবরাম। শরদিন্দু। সত্যজিৎ। এর বাইরে তুমি কি বাংলা বই পড়েছ? তোমার বইয়ের সম্ভারে বিদেশি লেখকদের ভিড়। বিদেশের ইতিহাস তোমাকে বারবার টেনে নিয়ে গিয়েছে নগ্ন নির্জনতায়। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে তুমি দেখতে গিয়েছো অরোরা বোরিয়ালিস। ল্যাপাল্যান্ডে ভিড় করেছো তারা জ্বলা রাতে। হ্রদের দেশে ডুব দিয়েছো ইতিহাসের নেশায়। জাপটে ধরেছো উড়ন্ত গাঙচিলের এক পা। অন্যদিকে রাতুল দেখেছে রাজনীতির আঁশতে গন্ধে ভরা নৈহাটিকে। দেখেছে বাংলা বিহারী দ্বন্দ্ব। রাত জেগে শুনেছে মশার আওয়াজ। বস্তির মারপিঠ দেখেছে। কলতলায় এক বালতি জলের জন্য হাহাকার দেখেছে। তোমার আর রাতুলের জীবন অনেকটা ম্যারম্যারে বাংলা সিনেমার প্লট। তবুও জীবন তো। যে জীবনে গল্প আসে বাস্তব থেকেই। সেই বাস্তবের এক চিলতে কোণে তোমাকে দেখে মোহিত হয়ে গিয়েছিল রাতুল। তারপর নানা ছুতোয়, ক্যাফের মালকিনের সহায়তায় তুমি যখনই ক্যাফেতে পৌঁছাতে, তখনই সে ছুটে চলে আসত ক্যাফেতে। তুমি কখনও তাকে আড়চোখে দেখেছ? তোমার পলিমাটির চোখ কি দেখতে পেয়েছিল পূর্বরাগের মরশুম?
নাইকির দামী জুতো, কালো চকচকে ট্র্যাক শুটের প্যান্ট আর বিদেশি সংস্থার ফুরফুরে গেঞ্জি পরে তুমি হাঁটতে যেতে বিকেলে। মিত্রপাড়া ধরে সোজা এগিয়ে ডান দিকে বাঁক নিতে। তারপর বঙ্কিম লাইব্রেরিকে বাঁ হাতে রেখে এগিয়ে যেতে। ততদিনে বিদেশের গন্ধ উধাও হয়েছে। ঘুরে নিয়েছ আট দশটা দেশ। ফিনল্যান্ড হয়ে আমেরিকা, তারপরে কানাডায় গিয়ে সংসার। চোদ্দতলার বারান্দা থেকে তাকিয়ে থেকেছো, অদূর ভবিষ্যতের দিকে। যে ভবিষ্যৎ তোমাকে এনে ফেলবে আবার তোমার নৈহাটির রাস্তায়। মনের রোগকে সারিয়ে তুলতে, ডাক্তারি পরামর্শ মতো তুমি হাঁটতে যাবে রোজ। সেই রোজের তালিকায় হুট করে ঢুকে পড়বে একটা ছেলে। ফর্সা, রোগা, হতদরিদ্র এবং উচ্ছাকাঙ্খী। যে ছেলেটা তোমার মতো বহুতল বিলাসীর বাসিন্দা নয়, তবুও সে এসে পড়ল তোমার দেশে। দেবীর দেশে। যে দেশে সময়, এগিয়ে থাকে সবসময়।
এক সন্ধেবেলা দেখা হল দু'জনের। তখন মার্চের শুরু। বিদায়ের পথে বসন্ত তবুও দেবীর দেশে তখন বসন্তের প্রাক লগ্ন। তুমি এলে চুড়িদার পরে। চোখের নীচে ঘুম না হওয়া রাতের দাগ। মুখে আতঙ্কের ছাপ। হাঁটাচলায় কেমন একটা উদাসীনতা। তোমাকে বোঝার ক্ষমতা নেই রাতুলের। সে কোনওদিন তোমাকে বুঝতেও চায়নি। ভালবাসতে চেয়েছে। খুঁজতে চেয়েছে নৈহাটির আদি লগ্নকে। কিন্তু তুমি তো নৈহাটির বাসিন্দা মাত্র। এরচেয়ে বেশি কিছু নও। মুখোমুখি বসল দু'জনে। রাতুল দুটো পুরনো বই নিয়ে গিয়েছিল দেবীর জন্য। এরচেয়ে বেশি তাকে দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না তার। তার আলমারিতে রাখা দুটো বই নিয়ে সে পৌঁছে গিয়েছিল সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফেতে। একমুখ হাসি নিয়ে সে বলেছিল, ' জন্মদিন চলে গেছে জানি, তবুও হ্যাপি বার্থডে।' দেবী হেসেছিল। ক্যাফের কাউন্টারে বসে সেই মহিলাও চুপিচুপি দেখেছিল সবটা। হয়ত তিনিও বলেছিলেন, 'সবটা ভাল হোক।' এক কাপ গ্রীন টি নিয়ে দু'জন চেয়েছিল একে অন্যের দিকে। এক পসলা বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। উড়ে এসেছিল মনকেমনের হাওয়া। জড়িয়ে ধরেছিল নেশাতুর সন্ধের উদাসীনতা। সেই শুরু। একটা প্রেমের। একটা ইতিহাসের। যে ইতিহাস একদিন মিলিয়ে দেবে নৈহাটি এবং ফিনল্যান্ডকে। (পরবর্তী পর্ব আগামি রবিবার)
ট্যাগসূচী:#Love#Naihati#History#Finland
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ
লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার
পাঠকের মন্তব্য (0)
মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev
Modern Full-Stack Architecture • React & Next.js Ecosystem