রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

দেবীর দেশ, পর্ব ৭

ছাদের একপ্রান্ত ছুঁয়ে আছে একটা আম গাছ। সেই আম গাছের পাতায় হাত রেখে রাতুল ফিরতে চাইল শৈশবে। মাথার মধ্যে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে গেল শৈশবের মজলিস।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

২৫ অক্টোবর, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ

দেবীর দেশ, পর্ব ৭
|দেবীর দেশ

ঢাকিরা ফিরে গিয়েছে। ওই দূরের বাড়িটা থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে মাইক। গলির মোড়ে একটা হ্যাজাক আলো লাগানো হয়েছিল, সেটাও ওরা এসে খুলে নিয়ে গেল কিছুক্ষণ আগে। হঠাৎ করে কেমন একটা শূন্যতা পাক বেয়ে উঠে এল। আফিম খাওয়া বালকের মতো রাতুল আবার এসে দাঁড়াল সেই ছাদে। ছাদের একপ্রান্ত ছুঁয়ে আছে একটা আম গাছ। সেই আম গাছের পাতায় হাত রেখে রাতুল ফিরতে চাইল শৈশবে। মাথার মধ্যে বিদ্যুতের গতিতে ছুটে গেল শৈশবের মজলিস। মনে পড়ে গেল শিমুরালির কথা। রাতুলের মামারবাড়ির কথা।যে বাড়ি রাতুলকে স্থবিরতা দিয়েছিল। রাতুলের জীবনে আলাদিনের প্রদীপের মতো মামারবাড়ির স্মৃতি। নদীয়া জেলায় অবস্থিত শিমুরালি। শিয়ালদহ রানাঘাট শাখার মেন লাইনে একটি ছোট্ট স্টেশন, শিমুরালি। রাতুলের কাছে মন কেমনের স্টেশন। রাতুলের শৈশবের ভিত্তি হয়েছে এই রেল স্টেশনের নির্জনতা। ছোটবেলায় বাবা মায়ের হাত ধরে শিমুরালি যাওয়া রাতুলের কাছে ছিল আদুরে সম্ভাষণ। সে জানত মামারবাড়ি গেলেই তার সমস্ত দুঃখ হু হু করে পালিয়ে যাবে। তার ঘিরে ধরবে এক অদ্ভুত ভাললাগা। ছোট্ট স্টেশন থেকে নেমেই মাটির রাস্তা। কয়েকটা ভ্যান সারিবদ্ধ ভাবে চেয়ে থাকে যাত্রীদের দিকে। ভ্যানের লাগোয়া একটা মিষ্টির দোকান। সেখানে তৈরি হয় বিখ্যাত কালাকাঁদ। দোকানে কালাকাঁদ ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। দোকানটিও অপরিচ্ছন্ন। সামনে খুলে আসা নীল রঙের সাইনবোর্ড। অপরিষ্কার কাঁচের ওপারে সাদা সাদা কালাকাঁদ। সেই দোকান থেকে মিষ্টি কিনে বাবা মায়ের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়া মামারবাড়ির দিকে।

বাঁ হাতে একটা চায়ের দোকানে মোটা চশমা পরে বসে থাকবেন মেজ মামা। রাতুল ছোট থেকে দেখে এসেছে রোগা, বেঁটে, কালো মানুষটাকে। মুখে সর্বদা হাসি। রাতুলকে দেখা মাত্রই কর্কশ গলায় বলে উঠবে, ‘ কী রে?’ তারপর আর একটু এগোলেই বেশ কয়েকটা সাইকেল গ্যারেজ। সেই গ্যারেজের পাশ দিয়েই মামারবাড়ি ঢোকার রাস্তা। প্রবেশপথ সরু হলেও, জীবনের দরজাটা সেখানে বিস্তর। সেই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলেই কয়েকটা সিঁড়ির ধাপ, সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠে ছোট্ট বারান্দা। বারান্দা পেরোলেই লাল মেঝে। জীবনের চিত্রপঠে সে এক আশ্চর্য অনুভূতি। রাতুলের শৈশব জুড়ে সেইসব দিনগুলো এখনও মনখারাপের ওষুধ হয়ে ওঠে। তিন মামা আর সাত মাসির সংসারের আদর যে কী মলিন হতে পারে, রাতুল তা এখন বুঝতে পারে। যে শৈশব সে হারিয়ে এসেছে শিমুরালির গোচরে, তা আর কোনওদিন ফিরবে না। হুশ করে ছুটে যাওয়া ট্রেনের মতো সেসব কোথায় যেন উড়ে গিয়েছে। হঠাৎ দেখা হওয়া এক যাত্রীর মতো তারা কোথায় যেন মিলিয়ে গিয়েছে। আমাদের জীবনে এখন কত কারোর সঙ্গে প্রথম এবং শেষবারের মতো আলাপ হয়,আমরা জানি তাদের সঙ্গে আর কোনওদিন দেখা হবে না। তবুও সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত ভাললাগার জন্ম হয়। যে ভাললাগা অজস্র অর্থ দিয়েও কেনা যায় না। রাতুলের মামারা জমিদারের বংশ। পুকুর, বাগান, দোকানের মালিক। অফুরন্ত জীবন। তবুও মাটির কাছাকাছি থাকার প্রয়াস। তবুও একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার প্রয়াস। রাতুল জীবনের আত্মীয়তাকে চিনেছিল মামারবাড়ির গণ্ডি থেকে। একটা জন্ম, মৃত্যু, খুশির দিনে কী করে একে অন্যের পাশে থাকতে হয়, সেই সব কিছু রাতুল শিখেছিল এই শিমুরালি থেকে। যে শিক্ষা রাতুলের জীবনে বারবার কাজে লেগেছে।

শিমুরালি সবুজে সবুজে পরিপূর্ণ। চারিদিকে পুকুর, ডোবা, মাছের ভেরি। এককালে শিমুরালি লাগোয়া মদনপুরে ছিল বড় বড় পানের ব্যারেজ। ধু ধু বিস্তৃত ধান ক্ষেত। রাতুল চোখ বন্ধ করলেই সেইসব ছবিগুলো ভেসে ওঠে। রাতুলের মায়ের কাছে গল্পে শোনা ব্রহ্মদৈত্য এসে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। মধ্যরাতে পুকুরের জলে গলদা চিংড়ি ধরার গল্প এখনও তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় কোনও দূর দেশে। বড় বড় আম গাছ, জাম গাছ, তাল গাছের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে বেড়ায় অন্য এক রাজকুমার। তাকে দূর থেকে ভয় দেখায় কোনও এক স্কন্ধকাটা, ব্রহ্মদৈত্যের শৈশব। রাতুল এইভাবে বড় হয়ে উঠেছে। খুঁজে নিয়েছে নিজের দেশ। নিজের ভাল থাকা। সেই দেশে অসময়ে এসে পড়ল একটা মেয়ে। একটু একটু করে চিনে নিল রাতুলের শৈশব। একটু একটু করে দেখে নিল রাতুলদের ছিন্নখিন্ন বাড়ি। রাতুলের মুখে শুনল কিছু কবিতা আর গল্প। রাতুল জানে দেবীর আঙুলে অন্য কারোর হীরে চকচক করছে তবুও সে ঢুকে পড়ল সেই দেশে। যে দেশের পথে প্রান্তরে ছুঁয়ে আছে নৈহাটি। একটা ছোট্ট শহর। ভাগীরথীর তীরে গড়ে ওঠা একটা প্রাণহীন জনপদ। এককালে এই অঞ্চলে দেখা গিয়েছিল প্রচুর দুরারোগ্য ব্যাধি। সেই সঙ্গে কলেরা এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগ। গঙ্গার তীরবর্তী হওয়ায় সেই রোগ হু হু করে ছড়িয়ে পড়তে থাকল চারিদিকে। তখন বঙ্কিমচন্দ্রের আমল। তিনি নৈহাটি পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সেই সময় তিনি নৈহাটির স্বাস্থ্য ফেরানোর দায়িত্ব দেন মক্কেশ্বর সিংহ নামে একজন অ্যালোপ্যাথি ডাক্তারকে।যার নামে পরবর্তী কালে নৈহাটি একটি গঙ্গার ঘাটের নাম হয় মক্কেশ্বর সিংহ। শোনা যায়, তিনি নৈহাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে যথাসাধ্য করেছিলেন। সেই সময় নৈহাটি জুড়ে এক অদ্ভুত জ্বরের প্রকোপ দেখা যায়। সেই জ্বরকে আয়ত্ত করতে তিনি বেশ কিছুটা সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে তন্ত্রের প্রয়োগও শুরু হয়েছিল গোটা নৈহাটি জুড়ে। সেই তন্ত্রের প্রয়োগ চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাঁধ সেধেছিল। এইসব ইতিহাস কি কোনওদিন তোমাকে ছুঁয়ে গিয়েছে দেবী? রাতুলের বারবার মনে হয়েছে এই মেয়ের জন্ম তো ইতিহাসকে লালন করার জন্য।

ওদের মধ্যে প্রতিদিন যে খুচরো কথা হত, সেই কথা ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছিল দেবীর সমস্ত কষ্ট। একটা বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল দেবী। সেই সঙ্গে নতুন বাসা বাঁধা কিছু জটিল রোগ। রাতুল তখন উন্মুক্ত বিহঙ্গ। চাইলেই সে শুষে নিতে পারে দেবীর সকল দুঃখ। তখন সে উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ। দেবী জানত, এই সম্পর্ক থেকে একদিন বেরোতে হবে। জীবনে এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রাতুল তো মেঠো বাগানের অভিযাত্রী, সে তো চেয়েছিল দেবীর সঙ্গে বাকিটা হাঁটতে। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে যেত তারক স্যারের বাড়ির পাশ ধরে। দেবীকে সবসময় বাঁ পাশে রেখে হাঁটত রাতুল। দেবী ভালবাসত রাতুলের বাঁ পাশে থাকতে। কিন্তু একটা সাময়িক সময়ের জন্য। রাতুল যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে ঘুঁটে, গোবরের গন্ধ। সেখানে জড়িয়ে জাপটে আছে শিমুরালির মতো এক শান্ত, নিবিড় দেশ। গাঁজা, বাংলা মদের গন্ধ। গরিফার আঁশটে সংস্কৃতি। সন্ধের আকাশে কালপুরুষ। সারমেয়র ডাক। নিরালা কয়েকজন বন্ধু। এইসব নিয়েই তো রাতুলের বড় হওয়া। দেবীর দেশ তো অন্য ধাতুতে গড়া। যে দেশে প্রখর বিলাসিতা আর সুখের ফোয়ারা ওঠে সারাদিন। তবুও তো ওরা হেঁটে গিয়েছিল কিছুকাল। হেঁটে যাওয়ার জন্যই ওদের হেঁটে যাওয়া। নৈহাটির বুক ছিঁড়ে ওদের এগিয়ে যাওয়া। কে জানত দেবী চলে যাওয়ার পরে রাতুল খুঁজতে বেরোবে নৈহাটির ইতিহাস।
(পরবর্তী পর্ব আগামী রবিবার)

ট্যাগসূচী:#history#naihati#love
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev