তোমাকে এই ধুলোধোঁয়াময় শহরের রাস্তায় দেখে সেদিন থমকে গিয়েছিলাম। তখন চুড়িদার পরে হেঁটে আসছো। শরীরের ভঙ্গিতে বেশ অস্পষ্টতা! কিছু একটা যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। সেই আগের মতোই। তখন এখানে ঝরা বসন্ত। সেদিন তোমার হাতে প্ল্যাটিনামের আংটি ছিল। আজ নেই। আশ্চর্য লাগে। সেই ফিরলে শীতের সকালে। তখন পিতৃবিয়োগের শোক লেগে কপালে। ভেবেছিলাম দৌড়ে এসে শুষে নেবে শোক, ঠোঁট ছোঁয়াবে কপালে। আমার আশা একেবারে জলে ধুয়ে গিয়েছে। আমাদের দেখা হওয়ার ক্যাফেটেরিয়া এখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু আমাদের আর মুখোমুখি বসা হয়নি। জড়িয়ে ধরা হয়নি বৃষ্টির সন্ধে। ইদানীং ব্যাগ ঝুলিয়ে অফিসে যায়। বাবার আর দেখা হল না। ভাবলেই একটা অসম্ভব কান্না জাপটে ধরে তার পরেই একটা অদেখা শক্তি সেই কান্নাকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সল্টলেকে। যে সল্টলেক থেকে চিরকাল পালাতে চেয়েছি। বিধাননগর কলেজে পড়ার সময় থেকেই সল্টলেকের সঙ্গে আমার জমে না। নিঝুম, নিস্তব্ধ তবুও আমার মন ভরে না।
যে সংবাদমাধ্যমের জন্য কাজ করি, সেই মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও আবার নতুন থেকেই শুরু করেছি। তাই সংবাদ লিখতে গিয়ে সাহিত্যের দফারফা হয়ে গিয়েছে। আমাদের ছোট কোম্পানি। তাই আমরা তাল গাছ অবধিই আমাদের চোখ দিই, এর বেশী দেখা আমাদের জন্য অপরাধ। মালিক মহাশয় সর্বদা সাইট নিয়ে চিন্তিত থাকেন। একটা কালো জামা আর কালো ছোট প্যান্ট পরে সারাদিন চা আর সিগারেট খেয়ে যান। কাশি বেশী হলে একটু অক্সিজেন টেনে নেন। আজব লোক! তবে সময় মতো টাকা দেওয়াতে তাঁর বড় আপত্তি! একটা অমায়িক হাসি হেঁসে বলেন, " এখনও টাকা আসেনি!" কী আর করা যাবে। তোমার মতো বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি জোটেনি। তাই বেয়ারা হয়েই দিন কাটছে। আমাদের অফিসের সামনে একটা মাঠ আছে। খুব সুন্দর ঘেরা একটা মাঠ। বসার জায়গা আছে বেশ কয়েকটা। বিকেলের দিকে ওইদিকে গিয়ে বসি। চুপচাপ ভাবি, কী করছি। মাঝেমধ্যে তোমার কথা মনে পড়ে। আজ কানাডার সঙ্গে ভারতের বিশ ওভারের বিশ্বকাপের খেলা। তুমি আজ কোন দিকে ?
ইদানীং সময়টা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। কত কিছু করব বলেও ভাবি অথচ করা হয় না। গায়ে গতরে একটু চর্বি গজিয়েছি। মোটাসোটা হয়েছি। তবুও তোমার পাশে হাঁটার জন্য এখনও পরিণত হয়নি। সেদিন এক হিতৈষী আমার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকার সময় বলে উঠল, " তোমার গায়ে ঘামের গন্ধ।" বেশ নরম স্বরে। তখন মনে পড়ল তোমার সেই পাঁচ হাজারের সুগন্ধির কথা। আমি তো আড়াই শো' টাকার সুগন্ধি ব্যবহার করে অভ্যস্ত। মাঝেমধ্যে ভাবি, এক জায়গায় দৌড়াচ্ছি। সেই একই বৃত্ত। সেই নিত্যনৈমিত্তিক লোকাল ট্রেন। ভিড়ে ঠাসা জীবন। অটোর জন্য হুড়োহুড়ি। অফিসে ঢুকে গড়ে বাঁধা লেখা তারপর আবার বাড়ি ফেরার জন্য তাড়া। ধুস। বিরক্তি লাগছে।

