বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

'গল্পের মতো ইস্কুল বাড়ি...'

ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা, শুধু একটা স্কুল নয়! একটা আস্ত জীবন।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

'গল্পের মতো ইস্কুল বাড়ি...'
|ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা

নীল হাফ প্যান্ট আর সাদা জামার গন্ধটা এখনও লেগে আছে। এখনও সেই সবুজ ডায়েরির ভয়টা মাঝেমধ্যেই নস্টালজিক করে তোলে। এখনও সেই কৃষ্ণচূড়া আর শিব মন্দিরের সামনে নীলডাউন হয়ে থাকার দিনগুলো মনে পড়লেই ভাবি, কেন যে দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেলো কে জানে ? আমার সাজানোগোছানো স্কুল জীবনটা আসলে একটা আস্ত বাড়ি, প্রতিটা তলে এক একটা নতুন গল্প, নতুন ভালবাসা। ক্লাস ফাইভে ফুটবল টিমে ক্যাপ্টেন হয়ে সাত গোল খেয়ে গোহারা হারার পর আর একবারের জন্যও কোনওদিন স্কুল টিমে চ্যান্স পাইনি। মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয়েছিল টানা পাঁচবছর। সেই দুঃখ কোনওদিনই ভোলার নয়। সেদিন আমার বিপরীত টিমের গোলরক্ষক ছিল সোহম জোয়ারদার বলে একটি ছিপছিপে ছেলে। তার প্রবল ক্ষমতায় আমরা একটা গোলও দিতে পারিনি উপরন্তু আমরা সাত গোল খেয়ে মাঠ ছেড়েছিলাম! আর আমার কপালে জুটেছিল প্রবল দুর্যোগ। এখনও ঘটনাটা মনে পড়লে ভাবি, ইসসস! কেন যে ক্যাপ্টেন হতে গিয়েছিলাম কে জানে!

স্কুলের দুই প্রাচীন শিব মন্দির
স্কুলের দুই প্রাচীন শিব মন্দির

ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা, শুধু একটা স্কুল নয়! একটা আস্ত জীবন। একটা কঠোর অনুশাসন আর অধ্যাবসায়। একটা বিরাট সময় আর স্মৃতি। অনেকটা আনন্দ আর ভালবাসা। তখন ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালার সুনাম সারা রাজ্য জুড়ে। শুনেছি কল্যাণী থেকে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের মধ্যে এক নম্বর স্কুলের তকমা ছিল। শুধু তাই নয়, এই স্কুলের এতো কঠোর অনুশাসন ছিল যে অনেকেই এই স্কুলে ভর্তি হতে ভয় পেতো। শুধু ভয় নয়, যে অ্যাডমিশন টেস্টটি হতো সেটা নাকি পাশ করা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য ছিল যে ক্লাস ফাইভে এই স্কুলের মেরিট লিস্টে আদিত্য ঘোষের নাম জ্বলজ্বল করছিল। সেই শুরু এই স্কুলে আমার পথচলা। একজন সাদামাটা ছাত্র হয়ে এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কেমন জানি একটা ভয় কাজ করত! পারব তো ? ওখানে তো শুনেছি সব ভালভাল ছাত্ররা পড়াশুনা করে! তার মাঝে আমি বড্ড ফ্যাকাশে হয়ে যাবো না তো? এইসব চিন্তাভাবনা প্রায়ই মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াত। তার যদিও দুটো কারণ, এক আমার কপাল কোনওদিনই আমার সঙ্গ দেয়নি এবং দ্বিতীয়ত আমি কাজে বিশ্বাস করি। কারণ কাজটাই আসল, ওটাই থেকে যাবে। বাকি সব উবে যাবে, উড়ে যাবে সময়ের তালে। সেটাই যদিও হয়েছে। আমার স্কুল জীবন শুধুমাত্র ওই কয়েকটা বছরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কোনওদিন এমন কিছু করতে করতে পারিনি যে স্কুল কিংবা শিক্ষক কিংবা বন্ধুরা আমাকে আমার কাজের মাধ্যমে মনে রাখতে পারে! তবে এখনও সময় আছে, এখনও অনেক পথচলা বাকি! আর পথ চলার পাথেয় হলো আমার স্কুলজীবন। প্রচুর কিছু শিখেছি, তখন মনে হয়েছিল এত কঠোর নিয়ম থেকে যে কবে মুক্তি পাবো! আর যেদিন মুক্তি পেলাম, সেদিন মনে হল জীবনের একটা অধ্যায় কেন এত তাড়াতাড়ি শেষ হল ?

শিক্ষকগণ
শিক্ষকগণ

উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার ভাটপাড়ার ইতিহাস অনেকরেই জানা আর যারা জানেন না তাঁরা একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই জানতে পারবেন ভাটপাড়া আসলে শিক্ষার পীঠস্থান। ভাষার মন্দির এবং জীবনের মার্গদর্শনের জায়গা। সেই জায়গায় ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালা (উচ্চ মাধ্যমিক) শুধু একটা বিদ্যালয় নয়, জীবনের মন্দির। যে মন্দিরের কঠোর অনুশাসন একটা সময়ের মাথা ব্যথার কারণ হলেও আজ বুঝি সেদিনের শিক্ষাটা আমার সাড়া জীবনের পাথেয়। একটা বিদ্যালয় যে একটা মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে সেটা অমরকৃষ্ণ পাঠশালায় ভর্তি না হলে বুঝতে পারতাম না। অমরকৃষ্ণের গণ্ডিতে প্রবেশ না করলে বুঝতে পারতাম না, একটা ইস্কুল প্রায় একটা মন্দিরের সমান হতে পারে। যেখানে বসে দিনরাত প্রার্থনা করা যায়। যেখানে বসে দিনরাত এক হয়ে যায়। তখন আমি সদ্য ক্লাস ফোর পাস। বাবা মায়ের কঠিন ইচ্ছে আমাকে ভাল স্কুলে ভর্তি করতেই হবে। ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালার সুনাম তখন রাজ্য জুড়ে। শুনেছিলাম কল্যাণী থেকে ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের মধ্যে এক নম্বর স্কুলের তকমা ছিল একটা সময়। শুধু তাই নয়, এই স্কুলে এতো কঠোর অনুশাসন ছিল যে অনেকেই এই স্কুলে ভর্তি হতে ভয় পেতো। যে অ্যাডমিশন টেস্টটি হতো সেটা নাকি পাশ করা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমার সৌভাগ্য ছিল যে ক্লাস ফাইভে এই স্কুলের মেরিট লিস্টে আদিত্য ঘোষের নাম জ্বলজ্বল করছিল। সেই শুরু এই স্কুলে আমার পথচলা। একজন সাদামাটা ছাত্র হয়ে এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কেমন জানি একটা ভয় কাজ করত! পারব তো ? ওখানে তো শুনেছি সব ভালভাল ছাত্ররা পড়াশুনা করে! তার মাঝে আমি বড্ড ফ্যাকাশে হয়ে যাবো না তো? এইসব চিন্তাভাবনা প্রায়ই মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াত।

রচনার অলঙ্করণ ছবি
রচনার অলঙ্করণ ছবি

আমাদের স্কুলের প্রায় প্রতিটা ক্লাসরুম থেকেই গঙ্গা দেখা যেত। মাঝেমধ্যে গঙ্গার হাওয়া খেতে খেতে যে কোথায় হারিয়ে যেতাম কে জানে! আমাদের স্কুলে দুটো প্রাচীন শিবমন্দির ছিল। এখনও আছে। আর একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। এই দুটো নিদর্শন আমার স্কুল জীবনকে আরও আকৃষ্ট করেছিল। একদম গঙ্গার পাড়ে আমাদের স্কুল হওয়ায় আমরা প্রতিদিন একমনে গঙ্গা দেখতাম। এখনও মনে আছে, আমি যখন ক্লাস ফাইভে তখন গঙ্গার মাঝ বরাবর একটা সরু চর পড়ছিল। যেদিন মাধ্যমিক পাশ করে এই স্কুল থেকে চলে গিয়েছিলাম সেদিন ওই চরটাও বেশ পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অল্পবিস্তর জঙ্গলও গজিয়েছিল। সময় তো নদীর মতোই বয়ে যায়। এটাই তো নিয়তি।ক্লাস ফাইভে আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন বিধান স্যার। উনি আমাদের অঙ্ক করাতেন! আবার ফুটবল খেলাও শেখাতেন। ওনার গলার একটা অদ্ভুত আওয়াজ ছিল। বেশ গম্ভীর অথচ মসৃণ। উনি প্রায়ই একটা নীল শার্ট গুঁজে পরে আসতেন। বেশ গাম্ভীর্য ছিল ওনার মধ্যে। একবার অঙ্ক ভুল করার জন্য ওনার কাজে বড্ড বকা খেয়েছিলাম। আমাদের স্কুলে বেশ কতগুলো নিয়ম ছিল। প্রতিদিন গুঁজে জামাকাপড় পড়তে হবে। জামকাপড় যেন পরিস্কার থাকে। পায়ে জুতো থাকা আবশ্যক, নয়ত স্কুলের গেট থেকে সোজা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে। চুল যেন ছোট করে কাটা থাকে, নয়ত স্কুলেই তার চুল কেটে দেওয়া হবে এমন ভয় দেখানো হতো অথবা গার্জেন কল মাস্ট! নখ না কাটলে স্কেল দিয়ে হাতে মারাও হতো। আর সকালে একবার স্কুলে ঢুকে যাওয়া মানে বিকেলের আগে ওই গেটের কাছে গেলেই ধোলাই শুরু হয়ে যেত। স্কুলের করিডর দিয়ে যদি কেউ দৌড়ে যেত, তাহলে তার পিঠে উত্তম-মধ্যম পড়ত। জল ভরার জন্য কেউ ভিড় করলে অথবা বাথরুমে গিয়ে গল্প করলে স্কুলের মাঠে নীল ডাউন করিয়ে দেওয়া হত সারাদিন। আর পড়া না পারলে কিংবা পরীক্ষায় খারাপ নম্বর পেলে আমাদের ওই সবুজ ডায়েরির সাদা পাতায় বড় বড় লিখে দেওয়া হতো, ‘’ আপনি এসে দেখা করুন আপনার ছেলে একদম বিগড়ে গিয়েছে!’’ এখানেই শেষ নয়, এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হতো অথবা খেলাধুলার সঙ্গে। সে এক বিরাট ফিরিস্তি! আর কারুর মুখ দিয়ে যদি একটাও বাজে শব্দ বেড়িয়ে যেত, তাহলে তো তার অন্নপ্রাশনের ভাত অবধি হজম হয়ে যেত। মনে হচ্ছে তো জেলখানা ? আসলে এতদিন এই নিয়ম মেনেছি বলেই আজ অনন্ত কিছু শিখেছি। ও আমাদের স্কুলে ঘড়ি পরা বারণ ছিল, শুধু মাত্র পরীক্ষার দিন বাদে আর মোবাইল ফোন ? হা হা হা! ওসব তখন অতীত!

আমাদের সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন সুনীল জোয়ারদার মহাশয়। ওনার মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার ছিল। যেমন গাম্ভীর্য তেমনি আদুরে। তখন যদিও ওনার গাম্ভীর্যটুকুই দেখেছি। আসলে এই মানুষটার কাছে আমি ঋণী, শুধু আমিই নয়। আমার মতো আরও অনেকে। ওনার অনুশাসনে ছিলাম বলেই তো আজও গর্ব হয়। খুব মেপে কথা বলতেন, আসলে ওনার কথা বলার প্রয়োজনই হতো না। উনি একবার এসে দাঁড়ালে পুরো স্কুল চুপ হয়ে যেত। আর যদি কাউকে বকতেন তাহলে তো তার চোখ দিয়ে জল বেড়িয়ে যেত। খুব কম মারতেন, যদিও আমার তেমন একটা মনে পড়ে না! তবে যখন মারতেন তখন সেই মারের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত শোনা যেত। আর সহ প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোহনলাল স্যার। উনি সাদা জামা আর একটা সাদা প্যান্ট পরে আসতেন। ওটাই ছিল ওনার আজীবনকালের পোশাক। একটা ভিন্ন সুরে কথা বলতেন, প্রতিটা শব্দের শেষে অনিচ্ছাকৃত একটা ‘স’ বসে যেত। উনি জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। ওনার কাছে একটা লম্বা স্কেল থাকত, একটু বেগতিক দেখলেই ওটা চলত। সে যা আওয়াজ! ওনার ওই স্কেলের বাড়ি আমি একবার খেয়ছিলাম! উরে বাবা রে......

সহ প্রধান শিক্ষক( বাম দিকে) এবং প্রধান শিক্ষক (ডান দিকে)
সহ প্রধান শিক্ষক( বাম দিকে) এবং প্রধান শিক্ষক (ডান দিকে)

আমাদের স্কুলে একটা ছোট্ট আর্ট গ্যালারি ছিল! ওই গ্যালারির দেওয়ালে একটা খুব সুন্দর ছবি ছিল! সম্ভবত কোনও পৌরাণিক। আমাদের শিক্ষক সুনীল স্যারের আঁকা। শুধু ওই ছবিটাই নয় আরও আরও অনেক ছবি এবং আরও অনেক নিদর্শন ছিল ওই ঘরটাই। উনি আমাদের আঁকার ক্লাস নিতেন। কিন্তু আমরা কেউই গুরুত্ব দিতাম না। আসলে তখন তো সবাই ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবে! স্যারও ক্লাস করাতে এসে খুব মনমরা থাকত। একদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম ওই আর্ট গ্যালিরাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, শুধু তাই নয় সুনীল স্যারকে না জানিয়ে এই কাজটা করা হয়েছিল। তারপর থেকে দেখেছি স্যার খুব অন্যমনস্ক থাকতেন, ক্লাস করাতে আসতেন না। যদিও অনেক পরে শুনেছি উনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শিল্পী ছিল। কিন্তু স্কুল কোনওদিনই গুরুত্ব দেয়নি, আমরাও...

আর্ট গ্যালারিতে সুনীল স্যার
আর্ট গ্যালারিতে সুনীল স্যার

আমার স্কুল জীবনে দুজন বন্ধুর ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কৌশিক আর অয়নের সঙ্গে প্রচুর এমন মুহূর্ত কাটিয়েছি যে যেগুলো কোনওদিনই ভোলার নয়। এমন কতগুলো স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বলে যেগুলো মনে করলেই ভাবি, বন্ধুত্বটা ফুরিয়ে গেলো বুঝি? সেই দিনগুলোর বার্তা হয়ত পাল্টে গিয়েছে। সেই স্কুল ফেরত প্রাইভেট টিউশন পড়ে বাড়ি ফেরার স্মৃতি, কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে কালী মন্দিরে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা তোদের মধুর প্রেমের স্মৃতি, সবই তো এখনও আমার নখদর্পণে। আর তার চেয়েও সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের গানের দল অথবা ব্যান্ড যার নাম ছিল ওয়েসিস- দ্য কালচারাল রক। অয়ন তখন গিটার বাজাত আর কৌশিক তবলা! আর আমি গান! কম্বিনেশনটা কিন্তু মারাত্মক। আর তিনজনেই গান লিখতাম! মূলত কৌশিক আর অয়ন সুর দিত। সেই থেকেই আমার লেখার শুরু। তখন একে অন্যের বাড়িতে রিহার্সাল থেকে খাওয়াদাওয়া কিছুতেই থ্রী মাস্কেটিয়াস! লোকে তখন আমাদের ওয়েসিস বলে ডাকত! উফফ, সেই দিনগুলো বড্ড ভাল ছিল।

আমাদের বাংলা পড়াতেন সুলেখ স্যার। সাদা চুলওয়ালা ওই ভদ্রলোকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। উনি যখন পড়াতেন, মনে হত কোথায় যেন একটা হারিয়ে যাচ্ছি। উনি বেশ গল্পের ছলে পড়াতেন। ছোট ছোট ঘটনা বলতেন পড়ানোর মধ্যে। বেশ ভাল লাগত। উনি ভাটপাড়াই বাসিন্দা। আর ভাটপাড়া সবসময় পণ্ডিতদের জায়গা ছিল এবং এখনও আছে। এই ভাটপাড়ার অলিতে-গলিতে আমরা অবসরে ঘুরে বেড়িয়েছি। প্রাইভেট টিউশন শেষ করে প্রায় প্রত্যেকদিন আমাকে পাহাড়দারের কাজ করত হতো! বন্ধুরা প্রেম করত আর আমি দূরে দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিতাম। সে এক মহান কাজ ছিল কিন্তু। আসলে স্কুল শেষ হওয়ার পরে ঠিক আমাদের স্কুলের পাশেই কোনও না কোনও বাড়িতে আমরা পড়তে যেতাম। সোমাবার অমুক বাড়ি তো মঙ্গলবার তমুক বাড়ি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় ন’টা বেজে যেত। মানে সকাল ন’টায় বেরোতাম আর রাত ন’টায় ফিরতাম। একদম অফিস ডিউটি।সমীর স্যার ছিলেন আমাদের অঙ্কের গুরু! শুনেছি উনি ওনার সময়ে উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে দুশোয় দুশো পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, দুর্দান্ত ফুটবলও খেলতেন। তবে একটায় সমস্যা ছিল, স্কুলের কোনও পরীক্ষায় যদি উনি প্রশ্ন করতেন আর খাতা দেখতেন তাহলে নম্বরগুলো এমন আসত, ‘’ ০, ১, ০, ২, ১, ০, ১০, ৮, ৪......’’ যদিও এই নম্বরগুলো ৫০ নম্বরের মধ্যে পাওয়া অঙ্কের নম্বর! আর কেউ যদি অঙ্ক না পারে তাহলে বলতেন, ‘’ এই গরু, এদিকে আয়!’’ শুধু উনি নয়, আলোক স্যারও ছিলেন পণ্ডিত লোক। সলীল স্যারও একবার অঙ্ক পরীক্ষা নিয়েছিলেন, সেখানেও আমরা কুপোকাত হয়ে গিয়েছিলাম। সমর স্যারকেও মনে পড়ে মাঝে মাঝে। উনি আমাদের ভৌতবিজ্ঞান পড়াতেন। তবে ওনার বিশেষত্ব ছিল যে উনি সবকিছু শেষের আগে একটা গল্প বলতেন। একই গল্প। কোনও এক জঙ্গলে ওনার ছেলে একটা বাঘ দেখে ওনাকে বলেছিলেন, ‘’ বাবা ওই দেখো বাঘ!’’ উনি প্রত্যুতরে বলেছিলেন, ‘’ চুপ!’’ একটা অদ্ভুত সুরে কিন্তু বলতেন। বেশ ভাল লাগত যদিও। তবে কেউ যদি ওনার ক্লাসে অমনোযোগী হতো, তাহলে তার পিঠে পুরস্কার জুটত! সেই ‘ ধম’ করে একটা আওয়াজ সারা ক্লাসের মনসংযোগ ফিরিতে আনত। উদয় শঙ্কর কবিরাজ স্যার ছিলেন এক আশ্চর্য ব্যক্তি। উনি ছিলেন সব বিষয়েই পারদর্শী! যে কোনও বিষয় ওনাকে পড়াতে দিলে উনি একদম সেই বিষয়ের মূলে চলে যেতেন। উনি ছিলেন অলরাউন্ডডার!

আমাদের তখন জীবন বিজ্ঞান পড়াতেন অমিতাভ স্যার! ওনার হাতের লেখা ছিল মুক্তের মতো সুন্দর, ঠিক তেমনি সুন্দর পড়াতেন। ইচ্ছে ছিল ওনার কাছে প্রাইভেটে জীবন বিজ্ঞান পড়ার কিন্তু সে সুযোগ হয়নি। একদম পণ্ডিত মানুষ ছিলেন তিনি।আমরা যখন ওই ক্লাস নাইট কিংবা টেন, তখন তো আমাদের পাখনা গজিয়েছে! মানে স্যারেরা ওরকম বলত। তখন বেশ কিছু ক্লাসে ইচ্ছে করে গল্প করতাম, যাতে স্যার ক্লাসের বাইরে বেড়িয়ে করে দেয়! একদিন কোনও এক অঙ্ক ক্লাসে, ইচ্ছে করে গল্প করতে গিয়ে স্যারের চোখে পড়ে গিয়েছিয়ালাম। তারপর স্যার বলল, ‘’ যাও বাইরে বেড়িয়ে যাও!’’ তারপর আমরা বাইরে গিয়েও গল্প করছিলাম। সেটা দেখতে পেয়ে স্যার বলল, ‘’ যাও, মাঠে গিয়ে নীল-ডাউন হয়ে যাও!’’ সেদিন যা লজ্জা লেগেছিল, সেটা আর ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতাটুকু নেই। একবার তো আরও একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল, এইরকমই কোনও এক অঙ্ক ক্লাসে কয়েকজন ছাত্রকে স্যার বাইরে বের করে দিয়েছিলেন। ওই ক্লাস ঘরের জানলার পাশেই ছিল ব্ল্যাক বোর্ড। যদি কেউ ওই জানলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে এই ঘর থেকে সেটা স্পট দেখা যেত না। দরজা দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে দেখতে হতো। স্যার তখন একবার করে বোর্ডে অঙ্ক করাচ্ছেন আর ছাত্রদের দিকে ঘুরে সেই অঙ্ক বোঝাচ্ছেন। আর ওই জানলা দিয়ে ব্ল্যাক বোর্ডে অনায়াসে হাত যেত! এই সুযোগ নিয়ে একটি অক্কালপক্ক ছেলে একটা করে লাইন মুছে দিচ্ছিল। স্যার ভাবছিলেন, এটা কি ভৌতিক কাণ্ড ? অবশেষে তিনি সবটা বুঝতে পেরে যা করেছিলেন সেটা আর নাইবা বললাম! তবে এই দুষ্টুমির স্মৃতিগুলো বড্ড তরতাজা।

সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় ছিল দুপুরে টিফিনের পরের ক্লাসগুলো। জানলা দিয়ে একটা মনোরম হাওয়া আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত। বিশেষত গরমকালের দুপুরগুলোয় ওই হাওয়া আমাদের কাছে স্বর্গের মতো ছিল, তবে অনেকেই সেই হাওয়ার দাপটে ঘুমিয়েও পড়ত! আর সেটা যদি একবার স্যারের চোখে পড়ে যেত তাহলে তার অন্নপ্রাশনের ভাত অবধি হজম হয়ে যেত। এই স্কুল জীবনেই আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটিকে পেয়েছি! সেই গোলকিপার সোহম জোয়ারদার। আমরা ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টুয়েলভ অবধি পাশাপাশি বসে পরীক্ষা দিয়েছি, শুধুমাত্র মাধ্যমিক এবং টুয়েলভ-এর টেস্ট পরীক্ষা ছাড়া। একবার কোনও এক ইংরেজি পরীক্ষায় চিঠি লিখতে দিয়েছিল! এখনও মনে আছে, সোহম আমার থেকে কিছুটা দেখে চিঠিটা মাছি মারা কেরানির মতো কপি করেছিল এবং চিঠির শেষেও ইওর ফেথফুলি আদিত্য ঘোষ লিখে এসেছিল! হায় রে কপাল। এই ঘটনাটা মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। তবে আমাদের বন্ধুত্বটা শুধুমাত্র ওইটুকুকে থেমে থাকেনি, আসলে আমাদের বন্ধুত্বটা এই সব গণ্ডির বাইরে।

স্কুলের সিঁড়ি
স্কুলের সিঁড়ি

অমরকৃষ্ণর কথা মনে পড়লেই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে সুশান্ত গুপ্ত-এর কথা! ওনার একটা ছবি এখনও আমার মানিব্যাগে থাকে। কেন চলে গেলেন স্যার? আপনিই তো আমার প্রথম পথপ্রদর্শক। আপনি জীবনে এতকিছু দেখেছেন যা হয়ত আমি আমার গোটা জীবনে দেখতে পারব না! আপনি পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে সবই পড়িয়েছেন, এই সমাজটাকে চিনিয়েছেন। নিজেকে চিনতে শিখিয়েছেন। সব ন্যাকামির বাইরে গিয়ে একটা চাঁচাছোলা স্বভাব আমাকে এখনও ভাবায়! যার সঙ্গে আগের দিন রাতেও একসঙ্গে রিক্সা করে বাড়ি ফিরলাম, সে পরের দিন সকালে আর নেই। সবই করেছিলেন শুধুমাত্র নিজের খেয়াল রাখা ছাড়া। এককালের দাপুটে রাজনৈতিক নেতা তথা শিক্ষক এতো খামখেয়ালি হতে পারে? ভাগ্যিস আজ আপনি নেই, নয়ত এই ক্ষয়ে যাওয়া রাজনীতি আপনাকে দেখতে হতো। আপনি কি জানেন, আমার প্রথম বক্তব্য কোন মঞ্চে ? আপনার স্মরণ সভায়। আপনার সেই দিনের ছাত্রটা আজও আপনারাই দেখানো পথে চলে। যেখানেই আছেন, ভাল থাকবেন স্যার!

সুশান্ত গুপ্ত
সুশান্ত গুপ্ত

আজও যখন রাস্তায় কোনও অপরিচিত ব্যক্তি বলে উঠে, ‘’ তুমি কি অমরকৃষ্ণ পাঠশালায় পড়তে ?’’ তখন বুঝি ওই স্কুলের মূল্যটা কী ছিল। এখন কোনও সিনিয়র অপরিচিত ব্যক্তি বলে ‘’আমিও তো ওই স্কুলেরই ছাত্র ছিলাম!’’ তখন আমাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভাষার আদানপ্রদান হয়ে যায়। যেটা লিখে বোঝাতে পারব না। তখনও যারা যারা শুনত আমি ওই স্কুলের ছাত্র, তখন তারা কেমন একটা সম্মানের দৃষ্টিতে তাকাত! এটাই ছিল স্কুলের প্রধান ‘’ইউএসপি!’’ বিদেশে চাকরি পেলেই স্কুলের নাম হয় না, নাম হয় ছাত্রদের ব্যবহারে। যেটা আমাদের মধ্যে ছিল এবং আজও আছে। প্রত্যেকটা গোধূলির মতো, আজও স্কুলের প্রতিটা দিন কেমন নস্টালজিক করে তোলে। লালা-সাদা বাড়িটা আজও আমার অবসরে।

কৌশক আর অয়নের সঙ্গে দেখা না হলে জীবনের প্রথম গানের দলটা হয়ত করাই হত না। কৌশিক আর অয়নের সঙ্গে প্রচুর এমন মুহূর্ত কাটিয়েছি যে যেগুলো কোনওদিনই ভোলার নয়। এমন কতগুলো স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বলে যেগুলো মনে করলেই ভাবি, বন্ধুত্বটা ফুরিয়ে গেলো বুঝি? সেই দিনগুলোর বার্তা হয়ত পাল্টে গিয়েছে। সেই স্কুল ফেরত প্রাইভেট টিউশন পড়ে বাড়ি ফেরার স্মৃতি, কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে কালী মন্দিরে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা তোদের মধুর প্রেমের স্মৃতি, সবই তো এখনও আমার নখদর্পণে। আর তার চেয়েও সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের গানের দল অথবা ব্যান্ড যার নাম ছিল ওয়েসিস- দ্য কালচারাল রক। অয়ন তখন গিটার বাজাত আর কৌশিক তবলা! আর আমি গান! কম্বিনেশনটা কিন্তু মারাত্মক। আর তিনজনেই গান লিখতাম! মূলত কৌশিক আর অয়ন সুর দিত। সেই থেকেই আমার লেখার শুরু। তখন একে অন্যের বাড়িতে রিহার্সাল থেকে খাওয়াদাওয়া কিছুতেই থ্রী মাস্কেটিয়াস! লোকে তখন আমাদের ওয়েসিস বলে ডাকত! উফফ, সেই দিনগুলো বড্ড ভাল ছিল। এছাড়াও আরও বাকিদের গল্প করতে গেলে একটা আস্ত উপন্যাস হয়ে যাবে। আসলে অমরকৃষ্ণের প্রতিটা দিন এক একটা উপন্যাসের পাতা। হয়ত লিখে গেলেও শেষ হবে। তবুও তো থামতে হয়, থামতে হবে। যদি জীবনে একবার সুযোগ হয়, তাহলে চাইব স্কুলের ওই দিনগুলোয় ফিরে যেতে। একদিনের জন্য, প্রতিদিনের জন্য।এখন সরস্বতী পুজোর দিনে শুধুমাত্র স্কুলে যায়! স্যারেরা পিঠ চাপড়ে বলে, ‘’ কী রে কেমন আছিস?’’ তখন একটা দমকা হাওয়ার মতো সেই প্রতিটা দিন কেমন ভেসে উঠে। মুকুদদা আমাদের স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজাত। ছুটি, এখনও মনে হয় ওই দরজা দিয়ে বেড়িয়ে, গলিটা পেরোলেই একটা অদ্ভুত শান্তি পাবো। কিন্তু আজও মনটা ওই স্কুলের দরজা দিয়ে আবার ভিতরে ঢোকার জন্য ছটফট করে।।

ট্যাগসূচী:#BhatparaAmarkrishnaPathshala#SchoolLife#Friends#Life#Teachers
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev