স্ট্রেট ড্রাইভের মতো তোমার জীবন ছিল। একদম নিখুঁত। একদম সোজাসাপটা। নির্ভেজাল একটা জীবনে অভ্যস্ত, নিরলস সন্ধে কাটাতে সছন্দ। শুধুমাত্র ব্যাটের কোণায় লেগে বলটা স্লিপে ক্যাচ হয়ে গেল। তুমি চলে গেলে। ক্রিকেট প্রিয় মানুষের মতো মাথা নীচু করে মাঠ ছাড়লে। হয়ত দর্শকেরা বলছিল 'এ দিল মাগে মোর'। একটা ভুল শর্ট। সেঞ্চুরি ফসকালো। ঊনসত্তরে শেষ হয়ে গেল এই যাত্রা। বিরাট কিছু করে যাওনি, খুব বড় নাম নেই। খুব বড় কোনও যোগাযোগ ছিল না। রাজনীতির থেকে শতহস্ত দূরে। ঝুটঝামেলা থেকে কয়েক মাইল দূরে। তবুও সাধারণ থেকেও অসাধারণ হয়ে রইলে। বুঝতেও পারলাম না। জানতেও পারলাম না। নির্ঝড়ের স্বপ্নভঙ্গ হলো। থমকে গেল ছিটকে আসা আলো। তোমার রোদ ঝলমলে খাটটা ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। আজকাল সকাল হলে একটা দমকা হাওয়া ভেসে আসে। ভেসে আসে উত্তরের উত্তরাধিকার। সাদা ফুলের টব থেকে ফুল ঝরে পড়ে। ঝরে পড়ে শুকনো পাতা। করিবর্গার দেওয়াল জুড়ে নেমে আসে স্মৃতি। নেমে আসে স্বপ্ন। শুধু তুমি নেই। হঠাৎ চারজন থেকে তিনজনে এসে ঠেকেছে। হঠাৎ সুখের ঘুমটা দুঃস্বপ্নের হয়ে গিয়েছে।
তোমার রোজনামচা একদম সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত। তোমার রোজকার রোজনামচার খেয়াল রাখলে আর ঘড়ি দেখার প্রয়োজন হতো না। নিয়ম করে কাগজ পড়ার অভ্যেস ছিল তোমার। এককালে প্রতিদিন বাংলা এবং ইংরেজি কাগজ আসত বাড়িতে। ইংরেজির প্রতি তোমার প্রেম ছিল চূড়ান্ত। বিশেষত প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দচয়নে তুমি ছিলে শুকতারা। আজ আমার ইংরেজি ভাষার প্রতি যেটুকু ভালবাসা সেটার কারণ তুমিই। তোমার মতো এত নিয়মমাফিক মানুষ খুবই কম দেখেছি। ঠিক সকাল সাতটায় বিছানা ছাড়তে। তারপর আবর্জনায় গাড়ি হর্ণ বাজালে নিয়ম করে সেই আবর্জনা ফেলে এসে চা নিয়ে বসা। তখনও আমাদের কারুই চোখ খোলেনি। তখন তুমি দিব্যি দেশ বিদেশের খবর দেখছো। বিগত দশ বছর ধরে এটাই তোমার রোজনামচা ছিল। তারপর ধীরে ধীরে রোদ যত প্রখর হতো তুমিও বাজারের ব্যাগ হাতে দিব্যি সাইকেল চালিয়ে মিশে যেতে ভিড়ে। তুমি ভালবাসতে বাজার করতে। এটা একটা নেশা ছিল তোমার। অদ্ভুত একটা নেশা। সারাজীবন তোমাকে একটা সিগারেট টানতে দেখিনি। তবে কলেজে জীবনে শুনেছি চুটিয়ে সিগারেট খেয়েছো। দু'একবার মদ খেতে দেখেছি তবুও সেটা পারিবারিক ট্যুরে গেলে। তাও সেটা আজ থেকে বছর বারোর আগের ঘটনা বলছি। আবার কোনওদিন তোমাকে নিয়ম করে ব্যায়াম করতে দেখিনি। প্রতিদিন সন্ধে হলে সিঙ্গারা, চপে টিফিন সারতে দেখেছি। সকাল হলে কচুরি আর জিলিপি সহযোগে জলযোগ করতে দেখেছি। তবুও কোলেস্টেরল তোমাকে ছুঁতে পারেনি। ছুঁতে পারেনি সুগার। প্রায়ই মিষ্টি খেতে দেখেছি। দেখেছি জীবনকে উপভোগ করতে। ছিমছাম একটা সরকারী চাকরি করে গেলে ৩৯ বছর। মোটা মাইনে থেকে মোটা পেনশন। দিব্যি একটা ভাত ঘুম দেওয়া যায়। দিব্যি নাকে নস্যি দিয়ে ঘুমানো যায়। কিন্তু তুমি তো প্রচন্ড নিয়মানুবর্তী ছিলে। ষাটের পরেও তিরিশের মতো ছিলে। তোমার মতো উচ্চতা পাইনি। তবে লোকে বলে মুখের মিল হুবহু। তোমার মতো ইংরেজিতে দক্ষও হতে পারেনি। পারিনি স্টেনোগ্রাফার হতে। মাত্র একুশ বছর বয়সে প্রথম হয়ে সরকারী চাকরি পাওয়া। চারশো টাকা মাইনে দিয়ে জীবন শুরু। সেইদিন থেকেই যে বোঝা তুমি কাঁধে নিয়েছিল, এতদিনে সেই বোঝা তুমি নামিয়ে দিলে।
কী সুন্দর ভাবে নিঃশব্দে মায়া কাটিয়ে দিলে। একদম সুস্থ, স্বাভাবিক শরীরটা হঠাৎ যে নিথর হয়ে যাবে কে জানত। কে জানত ওটাই শেষ সান্ধ্যভ্রমন। কে জানত সেই বৃহস্পতিবার তোমার জীবনের শেষ দিন। কী আশ্চর্য, তিরিশ মিনিট আগেও জানতাম ওটাই তোমার সঙ্গে শেষ দেখা। এ জীবনের মতো সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করা। বুঝতে পারছো, আর কোনওদিনই তোমার গলা শুনতে পাব না। কখনই তুমি আর ডাকবে না। কী আশ্চর্য। ভাবলেই একটা গভীরতম হাহাকার ছুটে আসছে। বুঝতে পারছো বাবা, আর কোনওদিন তোমার ছায়া আমাকে আশ্রয় দেবে না। কী বীভৎস ব্যথা, কী ভয়ংকর কষ্ট। লিখে বোঝাতে পারব না। তোমাকে আর জড়িয়ে ধরা হবে না। সেদিন তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা। পুরোহিত বললেন তোমার সারা শরীরে ঘি মাখাতে। নিথর শরীরটা চুপটি করে শুয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এই ঘুম ভাঙবে। এই বুঝি দুপুরের ঘুম ভেঙে উঠে চা খেতে আসবে। তোমার নিথর শরীরে ঘি মাখাতে মাখাতে মনে পড়ছিল, তুমি বেশ তেল মাখতে ভালবাসতে। কেউ তোমাকে তেল মাখিয়ে দিলে খুব খুশি হতে। অত বড় শরীরটায় ঘি মাখিয়ে দিলাম তবুও সেদিন তুমি খুশি হলে না। তখন অল্পস্বল্প ঠান্ডা পড়েছে। সদ্য ভোরে কুশায়ার দেখা মিলছে, ঠিক এমন সময় তুমি নিরুদ্দেশ হলে। নিরুদ্দেশ হলে দিকশুন্যপুরের জন্য। একবারের জন্যও জানতে পারলে না আমি লিখি। লিখতে পারি। ওটাই আমার পেশাদারিত্বের পালক। তোমাকে কতকিছু ফিরিয়ে দেওয়া হলো না। তোমাকে শান্তিতে যেতেও দিতে পারলাম না। কতকিছু বাকি রয়ে গেল। কতকিছু তুমি দেখতে পেলে না।
ছোট থেকে তুমি নাকি খুব বেয়াদপ ছিলে। কিন্তু দাদু তোমাকে একদম বেঁধে রাখত। সবসময় কড়া শাসনে থাকতে থাকতে বড্ড সোজা হয়ে গিয়েছিলে। একদম স্ট্রেট ড্রাইভের মতো। একদম নিখুঁত। শর্টহ্যান্ড থেকে চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলা। সরকারী অফিসের বড়বাবু হয়ে ওঠা তখনকার দিনে কম কথা নয়। তবুও ছাপোষা থেকে গেলে। গুলি ডান্ডা থেকে ওয়ার্ড ফাইল- গরিফা থেকে মোহনপুর। হাড়ু'দা থেকে 'পিএ ডিন পিজি পোস্ট স্টাডিজ' হয়ে ওঠার গল্পও নেহাতই ছাপোষা। তবুও তুমি অনন্য। তবুও তুমি মহান। তোমার জন্যই তো নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারতাম। তোমার জন্যই তো বেমালুম শান্তিতে কেটেছে এতকাল। বাজার করতে আজও শিখিনি। শিখিনি জীবন চালাতে।

