তোমার পড়ার টেবিলের পাশে একটা জানালা ছিল, সবুজ পর্দা দিয়ে ঘেরা সেই জানালার বাইরে ছিল গভীর জঙ্গল। কতটা গভীর জানি না, তবে তোমার কথা শুনে মনে হয়েছিল, বড্ড গভীর। তোমার চেয়েও গভীর ছিল সেই জঙ্গলের সবুজ নীরবতা। তুমি রোজ বিকেলে সেখানে হাঁটতে যেতে! অদ্ভুত একটা মায়া ছিল ওই জঙ্গলের প্রতি। তুমি নির্জনতা ভালবাস। ভালবাস সবুজকে। চুপচাপ হেঁটে যাও বহুদূর। একা হয়ে যেতে চাও একা থেকেও! লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এই পৃথিবীর সমস্ত স্বাদটুকু শুষে নাও। এক নিমেষে হয়ে ওঠো সতেজ। ঠিক যেন একটা নতুন উপন্যাসের মতো মনে হয় আমাদের আলাপ, আমাদের কথোপকথন।
আজকেও দিনটা অন্যদিনের মতো বেজায় বেয়াদপ। বড্ড হতচ্ছাড়া। আজকেও বিকেলটা কেটে যাবে তবুও আমাদের দেখা হবে না। আমাদের প্রিয় সেই গলিটা ধরে হেঁটে যাওয়া হবে না। আলো জ্বলবে আমাদের প্রিয় ক্যাফেটেরিয়ায়, তবুও আর তোমার প্রিয় গানটা বাজানো হবে না। ঝগড়ুটে বলে তোমাকে সম্বোধনের পিছনে একটা বিরাট ইতিহাস আছে! নারী জাতির ঝগড়া করাটাও তো একটা অলংকার। তুমি তো রীতিমতো দিনক্ষণ ঠিক করে আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছো! আবার ক্ষনে ক্ষনে অভিমান করে কথাও বলোনি। আমি বুঝতে পারিনি তুমি কেন অভিমান করে আছো! আসলে পুরুষ জাতি চিরকালই নারী কেন অভিমান করে আছে সেটা বুঝতে অপারগ। একজন নারী কী চাইছে সেটা বুঝতে গিয়ে পুরুষ জাতিকে বারবার কাদায় পড়তে হয়েছে এবং হবেও। অনেক রথী-মহারথীরা টক্কর খেয়েছেন ইতিহাসে, আর সেখানে তো আমি নেহাতই শিশু। তুমি একবার আমাকে বলেছিলে, " এসো না আমার জীবনে। আমার জীবনটা মেস হয়ে আছে।" আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, " আমার জীবনটা মেসবাড়ি হয়ে আছে।" লিখতে লিখতে মনে পড়ল, শিবরাম চক্রবর্তীর মেসবাড়িটা নাকি বিক্রি হয়ে গিয়েছে । তোমার তো প্রিয় লেখক শিবরাম বাবু! আমাদের অনেক কিছুই মেলে। ভালবাসা এবং ভালভাষা আমাদের সম্পদ।
আমরা একজীবনে কারুর হতে পারি না। বিয়ের আগেও নয়, বিয়ের পরেও নয়। প্রেমেও নয়, অপ্রেমেও নয়। আমি চিরকাল আমারই থাকব, যেমন ছিলাম রোদ ভেজা শৈশবের দুপুরে। যখন দুপুরগুলো বড্ড মনোরম ছিল। বেঁচে থাকার তাগিদ থাকত বিকেলের জন্য। আলতো রোদ গায়ে মেখে দৌড় দিতাম বহুদূর। যতদূর যাওয়া যেতে পারে। যত অলিগলি পেরিয়ে যাওয়া যেতে পারে তেপান্তরের মাঠে। মেঠো রোদ, প্রেমিক ধুলো, জোকার সুলভ গিটার বাজানো গান এবং আরও যা যা ছেলেমানুষি আছে সেই সবটুকু এক নিমেষে করে ফেলা যেতে পারে। স্রেফ কিচ্ছু না ভেবে। মনে যা যা পাগলামি আসছে, সেই সবটুকু করে ফেলা যেতে পারে। যেখানে বিচার করার কেউ থাকত না। যেখানে বারণ শোনার কেউ থাকত না। সোনা রোদ আর আমি দুজনেই লোফালুফি খেলতাম। সুখ ভাগ করে আড়াআড়ি শুয়ে থাকতাম মেঘের কোলে। আজকাল প্রায়ই বিকেল হলে ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবি, আমাদের দুজনের আকাশে কি একই মেঘ? এই মেঘ আর তোমার দেশের মেঘ কি প্রতিবেশী? যে প্রেমের জন্য জান কবুল ছিল, তোমাকে দেখার জন্য বাইকের তেলের হিসাব কষা ছেলেটাও আমার কথায় রাজি হয়ে দৌড়েছে তোমার বারান্দার তলায়, সেই প্রেমটা এখন বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়েছে। গতকাল দেখলাম তোমার ঘরে আলো জ্বলছে। বারান্দা অবধি সেই আলো কোনওরকমে ছুটে এসেছে। যে বারান্দায় একটা সময় তুমি দাঁড়িয়ে হাসতে। আমাকে দেখার জন্য কি কখনও ছটফট করেছো? ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাকে একটু ছুঁতে ইচ্ছে করেছে কখনও? এই জীবনে একবারও আমার হতে ইচ্ছে করেছে কখনও?
নিজের জীবনটা অনেকটা যাযাবরের মতো হয়ে গিয়েছে। কূল-কিনারা কিছুই নেই। শুধুই ভেসে চলা। ভাসতে ভাসতে তোমার কাছেই যে আসব, কে জানত। কে জানত ঝরা পাতার স্তূপ ঠেলে তোমাকেই পেয়ে যাবো। নতজানু হয়ে বসব, বলব " পৃথিবীর আদিম গানটা শোনাবে?" তুমি স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে বলবে, "না!" ইদানীং পাশের বাড়ির ছাদে মেয়েটাকে অনেকদিন দেখিনি। আগে রোদ পোয়াতে আসত ছাদে। তখন ঝরা বসন্তের মরসুম। মেয়েটার মধ্যে মায়া ছিল বড্ড। মেয়েটা কুকুর ভালবাসত। তোমার মতোই ভিজে চুল এলিয়ে বসত রোদে। দেখতে দেখতে একটা বছর পেরিয়ে গেল। তোমার হয়ত মনে নেই। মনে থাকারও কথা নয়। আমি সবসময় আঁকড়ে ধরে বসে থাকি। তোমার জন্য অফিস ফেরত চুপচাপ গান শুনতে শুনতে দু'লাইন লিখেও মুছে ফেলেছি। বুকের ভেতরটা কুঁকড়ে উঠেছে।


