বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

শেষ প্রহরের চিঠি

আমরা কেন তাদেরকেই ভালবেসে যাই, যারা কোনওদিন আমাদের ছিল না। আমাদের হবেও না।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১৪ আগস্ট, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

শেষ প্রহরের চিঠি
|প্রতীকী ছবি

ভাল রহো , বিরহ

তোমাকে নিয়ে সমস্ত লেখা প্রথম সারির সম্পাদকরা ফিরিয়ে দিয়েছেন।দ্বিতীয় সারির সম্পাদকরা ঐ লেখা দেখার পর আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি। তৃতীয় সারির সম্পাদকরা ঐ লেখাটা ছাপাতে অর্থ চেয়েছেন। তোমার শুনে খুশি হওয়ার কথা।তুমি বারবার বলতে তোমাকে নিয়ে যেন না লিখি। কিন্তু আমি তোমাকে নিয়েই লিখে গিয়েছি। একবার, দুবার, বারবার...! তোমার বাড়ির পথ ধরে প্রায় নিয়মিত ঘুরে এসেছি। দু'চোখ ভরে দেখেছি তোমার হলদে গ্রিল দেওয়া বারান্দা। তোমার সাজানো বাগানে ফুটে ছিল হাইড্রেনজিয়া। ফুটে ছিল সাদা সাদা ফুল। আমি প্রায় গিয়েছি। কখনও সকালে, কখনও বিকেলে। কখনও একা, কখনও কারোর সঙ্গে। অদ্ভুত সে অভিজ্ঞতা। তোমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই তিন বছর। তোমার সঙ্গে মতের মিল নেই তিন বছর। তোমার সঙ্গে দেখা হয় না তিন বছর। তবুও কী এমন আছে, কী এমন ছিল- যার অভিঘাতে আজও ছুটে যায়? কতবার উত্তর খুঁজেছি, তবুও পাইনি। আজও সন্ধে হলেই মনে হয়, একবার ছুটে যায় তোমার বাড়ির পথে। দোতলার ঘরে আলো জ্বলে না। অন্ধকার হয়ে থাকে মনের ভিতরটা। অজস্র ব্যাকুলতা মনের ভিতর লালন করেছি। পালন করেছি গভীর নীরবতা। তুমি ফিরে আসোনি। আসেনি তোমার মনকেমন করা ম্যাসেজ। কোনও এক বসন্তে তোমার জন্মদিন। তোমার জন্মদিনে পলাশ ফোটে। আমার বাড়ি থেকে ঐ দূরে পলাশ গাছটার দিকে তাকাতেই বুকের ভিতরে হাহাকার ওঠে। তুমি নেই। আকাশের দিকে তাকাতেই হু হু করে ওঠে, প্লেন উড়ে যায়। মনে পড়ে যায় আমাদের দিনরাত্রি। তখন আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ। মনের ভিতরে চরকা কাটা বুড়ি স্মৃতি বুনেছে চুপিসারে। কেমন আছো? কেমন আছে তোমার হাইড্রেনজিয়া? এই জংলা দেশে কেন ফিরে এলে? তোমার সেই জাদুর জানলা ছেড়ে এই কংক্রিটের জঙ্গলে কেন ফিরলে?

তোমার জন্মদিন উপলক্ষে দিয়ে যাওয়া কেকটা যদি না খেতাম তাহলে আজ তোমার সঙ্গে দেখাই হত না। দেড় বছর বাদে ব্লগ লিখছি। তোমার জন্য। নিজের জন্য। আমাদের জন্য। আমাদের বলে কি আদৌ কি কিছু ছিল? নিঝুম সন্ধে, শাঁখের আওয়াজ, দৌড়ে যাওয়া কাঠবিড়ালি, দু'মুঠো মেঘ, কয়েকটা প্লেন, দুরুদুরু বুকে ছুটে আসা কুকুর- এইসবই তো ছিল। আর ছিল একটা গভীর হাওয়ার ভোর, শিশির ছুঁয়ে আসা বেশ কিছুটা পথ। সেই প্রথম সোহমের বাইকের পিছনে বসে তোমার বাড়ি আবিষ্কার। তুমি তখন আলোআঁধারির মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলে, সেই হলদে গ্রিল ঘেরা বারান্দায়।আমাকে দেখে ঘরের ভিতরে চলে গিয়েছিলে। তারপর বহুবার ঐ একই পথ ধরে ছুটে গিয়েছি। কেন গিয়েছি, জানি না। তবে তোমার মধ্যে একটা অমোঘ আকর্ষণ ছিল, সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এখনও নয়। তোমার চলে যাওয়ার পরেও কত সম্পর্কে জড়িয়েছি, কতকিছু লিখেছি, তবুও তোমার মতো কেউ ছিল না। এই পৃথিবীতে আদর্শ বলে কিছু হয় না। ছিলও না কোনওদিন, তাই সঠিক ভাবে বলত পারব না আমাদের যাপন কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, তবে যেটুকু ছিল সেইটুকুই নিয়েই একটা উপন্যাস হয়ে যাবে। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, উপন্যাসটা লিখে ফেলেছি। তুমি বলেছিলে কোনওদিন যদি আমার কোনও উপন্যাস প্রকাশ হয়, তুমি সেই উপন্যাস ঠিক পড়বে। কিন্তু কবে প্রকাশ হবে জানি না। তবে হবে। মিরচা এলিয়াদ এবং মৈত্রেয়ী দেবীর মতো আমাদের জীবনটা যেন অহেতুক শূন্যতায় না কাটে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে যেন একে অন্যকে নিয়ে লেখা না পড়তে হয়, এইটুকুই প্রার্থনা।

তোমার মনে আছে, তোমাকে বলতাম শঙ্খের সঙ্গে বিগত আট বছর দেখা হয়নি। অথচ এই কলকাতাতেই ওর স্থায়ী ঠিকানা। তখন তুমি অন্য দেশে, অন্য বারন্দায়। সেই বারান্দার চোদ্দতলা থেকে জীবনটা উপভোগ করছো। বড্ড মন খারাপ হত এই ভেবে যে তুমি আবার কবে আসবে এই দেশে, এই কংক্রিটের শহরে। শঙ্খের ঘটনাটা বলে নিজেকে সান্তনা দিতাম। নিজেকে বোঝাতাম এই বলে যে, শঙ্খের সঙ্গেই দেখা হয় না আর তুমি তো তখন অন্য গ্রহের চাঁদ। কিন্তু কে জানত সেই তুমি মাত্র পাঁচ মাস বাদে আবার এই শহরের ফিরে আসবে! তোমাকে দেখে চমকে যাব। বুকের মধ্যের ধিকধিক বেড়ে যাবে। কিন্তু তুমি কথা বলবে না। তখন সদ্য বাবাকে হারিয়েছি। মাত্র মাস দুয়েক হয়েছে। তুমি সবটাই জানো। বহুবার বহু মারফৎ চেষ্টা করেছিলাম তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করার, তুমি সেই প্রস্তাবে কান দাওনি, যোগাযোগ করোনি। বুকে পাথর রেখে এগিয়ে গিয়েছিলাম। সময় ঘুরেছিল। আমরা একই শহরে সমান্তরালে বুড়ো হচ্ছিলাম। তারপর একদিন কলকাতায় গিয়ে আস্তানা বাঁধলে। বহুজাতিক সংস্থার কাঁচের ঘরে চাকরি পেলে। তারপরেও বহুবার তোমার খোঁজ করেছি। দারুণ শূন্যতায় গা ভাসিয়েছি। প্রতিটা দিনের শেষে মনে হয়েছে, তুমি কোথায়? কেমন আছো? কেন আমাদের মধ্যে এত দূরত্ব? অথচ আমরা তো এখন সহনাগরিক! তবুও ভুল করেও আমাদের দেখা হয়নি। তিন বছর কেটে গেল। তিনটে দুর্গা পুজো পেরিয়ে গেল। তবুও ঝরা পাতার মতো নিশ্চুপ হয়ে রইলাম। বুকের ভিতরটা মাঝমধ্যেই হু হু করে ওঠে।

আমরা কেন তাদেরকেই ভালবেসে যাই, যারা কোনওদিন আমাদের ছিল না। আমাদের হবেও না। কেউই হয়ত উত্তর জানে না। তবুও তারা আমার মতোই অথবা আমি তাদের মতোই সেই পথেই হেঁটে যায়। সেই বিভ্রান্তিকর পথ, সেই ঘোলাটে পথ। বুকের ভিতরে হু হু করে ওঠে তোমার কথা মনে পড়লেই।আমাদের উষ্ণতা ছড়ানো বিকেলগুলো হুস করে মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল কালপুরুষের দল। তুমি যখন রাগ করে থাকতে, তোমাকে অদ্ভুত লাগত দেখতে। গালগুলো লাল হয়ে যেত। সদ্য ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়ার মতো রঙিন হয়ে উঠতে।সেইসব দিনগুলো হারিয়ে গিয়েছে। আমাদের মতো করে আমরা পথ খুঁজে নিয়েছি। ভাল থাকার অভ্যেস করেছি।আমি জানি না তুমি কেমন আছো? কিন্তু ইচ্ছে করে একবার তোমার মুখোমুখি বসি। এই শহরটা সাক্ষী থাকবে শুধু। কিন্তু আবার পরমুহূর্তে মনে হয় থাক! হয়ত একসঙ্গে থাকাটা আমাদের কপালে নেই। তুমি বলতে সবাই যা চাই, সেইসবটা যদি পেয়ে যায় তাহলে তো অপূর্ণ বলে কিছু থাকবে না। ব্যর্থ বলে কিছু থাকবে না। বুদ্ধদেব গুহ বলতেন ব্যর্থ প্রেমেই আসল প্রেমটা বেঁচে থাকে। তাহলে কি আমাদের সেই প্রেমটা বেঁচে আছে? আমাদের প্রথম দেখা হওয়া সেই ক্যাফে, বৃষ্টি, আলো - সবই কি এখনও বেঁচে আছে?

আজ তোমার জন্মদিন। আজ বসন্তের জন্মদিন। আমি সেই মেয়েটাকে ভালবেসেছিলাম, যে ভ্যান গঘের ভক্ত, যে শাহরুখ খানের ফ্যান। যে মেয়েটা কাঠফাটা রোদ্দুরে ফড়িং ধরতে গিয়েছিল। যে মেয়েটা ভালবাসত জোনাকিকে। আমি সেই মেয়েটাকে ভালবেসেছিলাম। এখনও বাসি। নীল আকাশের দিকে তাকাতেই তোমার কথা মনে পড়ে। একরাশ শূন্যতা ঘিরে ধরে।ছিটকে আসে আদরের দাগ। আমরা একই শহরে, তবুও আমাদের সময়টা আলদা, আমাদের রাস্তাটা আলাদা। একসঙ্গে থাকাটাই কি সব? একসঙ্গে পথ চলা মানেই কি বিবাহ? তোমার সঙ্গে কোনওদিন থাকতে পারব না জেনেও তো পাগলের মতো ভালবেসেছিলাম। এই ভালবাসাটা কি সব নয়? তোমার জন্য আজও যখন বুকটা দুরুদুরু করে ওঠে, এই দুরুদুরু করে ওঠাটা প্রেম নয়? দেবী, কেমন আছো? বারবার একটাই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হয়। আমার দেওয়া ' পাগলী তোমার সঙ্গে' বইটা কি পড়ো এখনও? এখনও রোদের মধ্যে দৌড়ে যাও সব ভুলে? অ্যালার্ম সেট করে ঝগড়া করো? কেমন আছো দেবী? বারবার, অকারণে, হাইওয়ে ধরে ছুটে গেলেই বারবার তোমাকেই, তোমাকেই মনে পড়েছে। অজস্র নক্ষত্রের রাতে এক বুক কষ্ট নিয়ে তোমাকেই মনে পড়েছে। উপন্যাসটার নাম দিয়েছি ' ভাগীরথীর পূর্বে'। উপন্যাসটি একটা জায়গায় পাঠিয়েছি। যদি সেটা ধারাবাহিক ভাবে ছাপতে শুরু করে তাহলে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না। নাও বা ছাপে, তাহলেও কোনও কষ্ট থাকবে না। এই উপন্যাস একদিন লোকে পড়বেই। পড়তেই হবে। মিলিয়ে রেখো। আমাদের সময়টা লোকে জানবেই। মোহগ্রস্ত হবে। হবেই।

আমার জীবনে দুটো জন্মদিনের তারিখ কখনও ভুলব না। ১৪ ই এপ্রিল এবং ১৮ জুলাই। কিন্তু এই দুই মানুষের প্রয়োজন আমার ফুরিয়েছে জীবনে। পথ বেঁকে গিয়েছে অন্যদিকে। কিন্তু তোমার জন্মদিনের তারিখ হয়ত সারাজীবনও ভুলতে পারব না। ২৫ শে ফেব্রুয়ারি। চাইলেও ভুলতে পারব না। কেমন আছো দেবী? এই রাজনীতির পরিবর্তনের শহরে কেমন আছো? এখনও লিটিং থিঙ্কসের গানটা শোনো? এখনও শোনো মেঘদল ব্যান্ডের গান? আমাদের মাত্র কয়েকটা মাসের আলাপ দীর্ঘজীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী হয়ে থাকবে। দেবী, ভাল থেকো। সুখে থেকো। এই আলো, বাতাস, রোদ সবকিছুই তোমার সঙ্গে থাক, জড়িয়ে থাক। আমাদের আবার দেখা হবে। হবেই। ভাল থেকো।

ইতি

তোমার মেয়েধরা

ট্যাগসূচী:#Love#Life#Letter
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev