বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

"এইটা তোমার গান...."

আজকে আবার বহুবছর আগের সেই দিনটা বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে উঠছে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

"এইটা তোমার গান...."

প্রিয় বৈঠকখানা আর তুই,

আজকে আবার বহুবছর আগের সেই দিনটা বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে উঠছে। তখন আনন্দবাজারে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে সদ্য কর্মজীবন শুরু করেছি। কাজের ঠেলায় জীবন থেকে আনন্দগুলো নিরানন্দে পরিণত হচ্ছে। এমনিই কোনও এক দিনে কলেজস্ট্রীটের পথ ধরে শিয়ালদহে ফিরছি। চাঁদনী চক থেকে মেট্রো ধরে মহাত্মা গান্ধী মেট্রো স্টেশনে নেমে অটো ধরে শিয়ালদহে ফিরতাম। কারণ অফিসে যুদ্ধ করার পরে দমদম স্টেশন থেকে যুদ্ধ করে ট্রেনে ওঠার মতো মানসিক অবস্থায় থাকতাম না। সেদিন তোর বিয়ের দিন। আমার তখন মর্নিং শিফট। তখনও সাদা বাড়ির আদব কায়দার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। আমার আর দেবুদার সেদিন মর্নিং শিফট ছিল। যথারীতি অফিসে ঢুকে খবরের খোঁজ করছি। চায়ে এক কাপ চুমুক দিয়ে খবরের ঘন্ট পাকাচ্ছি। আমার এক খুব কাছের বাল্যবন্ধু বলেছিল, " তুই ওখানে কী করতিস? টাইপিং-এর কাজ ?" হ্যাঁ তাই বটে। টাইপিং করতে করতে হাতের আঙ্গুলগুলোর বারোটা দশ বেজে গিয়েছে ততদিনে।

আমার ডেস্কের সামনে একটা টিভি থাকত। আর সবসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখত হতো। অন্তত আমার কাছে এমনই নির্দেশ ছিল। আজকাল অনেক অফিসেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। তবে খবরের অফিসে সেসবের বালাই নেই। বরং উল্টো। ঠিক যেমন রাতে সবাই অফিস করে বাড়ি গিয়ে ঘুমোত তখন আমাদের অফিসে কাজ শুরু হতো। এটাই তো খবরের কাগজের নিয়ম। তবে আমি ডিজিটাল টিমে ছিলাম তাই রাত জাগার হিড়িক ছিল না। সেদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ দেখি তোর ছবি। সদ্য আপলোড হয়েছে। হলুদ শাড়িতে তোকে বাঁধভাঙা রোদ্দুরের মতো লাগছিল। বিয়ের সকালের কোনও রীতিনীতি চলছিল তখন। হাতে দেখলাম শাঁখা। টোল পড়া গালে মুচকি হাসি। এক মিনিটের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠেছিল। পিছন থেকে দেবুদা ধমক না দিলে হয়ত আরও কিছুক্ষণ আটকে থাকতাম ওখানে। সবটাই কেমন মায়াময় লাগছিল। ভেতর থেকে একটা আওয়াজ আসছিল। মনে হচ্ছিল গল্পটা একটু অন্য হতো পারত।

তখন দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারী নামী কলেজে ভর্তি হয়েছি। বিষয় মিডিয়া সায়েন্স। চারিদিকে জৌলুস, আভিজাত্য আর টাকার গন্ধ। আঁতলামির কোনও জায়গা নেই। হয়ত আঁতলামি আর অর্থনীতি একে অন্যের বিপরীত। জীবনে প্রথম বেসরকারী কাঠামোর উপলদ্ধি হলো। তার আগে পর্যন্ত সবই সরকারী ধাঁচে চলে এসেছিল। তাই একটু একটু অসুবিধা হচ্ছিল বৈকি তবে সেটা বেশীদিন টেকেনি। তেলে জলে মিশে গিয়েছিল সবটুকু। মনের মতো কিছু মানুষ পেয়েছিলাম। যারা আজকেও মনের খুব কাছাকাছি আছে। সেই মানুষদের তালিকায় তুইও একজন। প্রথমদিন তোকে দেখেছিলাম একদম লাস্ট বেঞ্চে। চুপচাপ একটা সাদা সালোয়ার পরে বসে ছিলিস। তোর মধ্যে একটা বাচালপনা ছিল। ওটাই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। তোর চোখ কথা বলত। হয়ত এখনও বলে। একবার বলতে শুরু করলে সে আর থামে না। কতকথা ছিল তোর মধ্যে। হয়ত আজও আছে। আমার সঙ্গে তোর আলাপটা ঠিক কীসের সূত্রে সেটা এখন মনে নেই। তবে এক বন্ধু সেইসময় বলেছিল,"ওইদিকে তাকাবি না। ওই মেয়েটা আমার।" একদম নির্লপ্ত স্বরে। কোনও ধমকানো চমকানোর ব্যাপার নেই। কলেজের শুরুতে এইসব একটু আধটু হয়। যদিও তার আগের একবছর আমার জীবনে কলেজের অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে। কলকাতার নামী এক সরকারী কলেজ ছেড়ে এসেছি। তবে এখন মনে হয় বেশ করেছিলাম ছেড়ে এসে। নয়ত জীবনের রঙগুলো গায়ে মাখতে পারতাম না। তুই যখনই হাসতিস তখনই গালে টোল পরে যেত। অদ্ভুত একটা উজ্জ্বলতা ছিল তোর মধ্যে। একদম ভোরের প্রথম রোদের মতো। একটু কোমল অথচ ম্লান হওয়ার মতো আবেশ, অনাবিল আনন্দ যা নিমেষে শুষে নিতে পারে সব দুঃখ।

তখন সম্ভবত প্রথম বর্ষ। আমাদের তখনও খুব একটা কথাবার্তা হতো না। তবে চোখাচোখি হতো। আমি তখন বেশ মোটা। তার মধ্যে একটা মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। এমনিতেই উহ্য হয়ে থেকে গিয়েছি। তোকেও এই লেখায় উহ্য রাখছি। যেমন এতকাল রেখে এসেছি। একবারেও জন্যও ভালবাসার কথা ব্যক্ত করিনি। একবারের জন্যও পাশাপাশি হেঁটে যাওয়ার কথা বলে দেখিনি। তবুও বৈঠকখানা লেনে তোর বাড়ির অবধি কতবার গিয়েছি। বাড়ির দরজা থেকে আসছি বলে চুপটি করে চলে এসেছি। বারবার একটা দূরত্ব বজায় রেখেছি। একটা সংযম মেনে এসেছি। পুরোনো কলকাতার রেখাচিত্র তোর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তোর বাড়ির সামনে ছাপাখানায় ঘন্টার পর ঘন্টা প্রুফ রিডিং করেছি। তুই আমার জন্য চা' এনে দিয়েছিস। তখন বড্ড চা'খোর ছিলাম। এক হাতে চা আর অন্য হাত সিগারেট না হলে নিজেকে ঠিক সম্পাদক হিসেবে মনে হতো না।

একটু অতীতের বৈতরণী বেয়ে চলে আসি আমার স্কুল জীবনের শেষ এবং কলেজ জীবনের শুরুর দিকে। তখন আমি একটি লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতাম, নাম ছিল অবশেষে। মূলত আমি, শঙ্খনীলম দাশগুপ্ত, নির্মাণ তালুকদার এবং সাত্ত্বিক ব্যানার্জী। আমরাই ওই পত্রিকার জন্য নিজেদের জমানো অর্থ থেকে টাকা দিতাম। আমরাই ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতাম। যতটুকু টাকা উঠত সেই টাকা জমিয়ে রাখতাম পরের সংখ্যার জন্য। উজ্জ্বলদা আমাকে অর্থনৈতিক এবং মানসিক দিক থেকে খুব সাহায্য করত। এবার প্রশ্ন হলো কে উজ্জ্বলদা? সেটা এই পর্বে থাক। মান-অভিমান বিশ্বাস ভাঙার অনেক গল্প আছে লুকিয়ে। আমার পত্রিকার নাম ছিল অবশেষে। একজন খুব অভিজ্ঞ বয়স্ক লোকের চক্করে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে হয়। অনেক নোংরা ছিটকে আসে। আসে হুমকি। মাথা নীচু করে মেনে নিই। কিন্তু মনে মনে জেদ চাপে, আরও শক্ত হয়ে ফিরব। স্বমহিমায় এবং সসম্মানে ফিরব। তারপরে অনেক জল বয়ে যায়। কিন্তু জেদটা একই ছিল। সেই জেদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে আটপৌরেতে। আটপৌরে একটি ম্যাগাজিন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমার প্ল্যান ছিল আটপৌরেকে একটি নিউজ পোর্টাল হিসেবে গড়ে তোলা। প্রাথমিক স্তরে একটি ওয়েবসাইট ডিজাইন সহ গড়ে তোলা এবং সেটিকে চালানোর মতো পয়সা আমাদের কাছে ছিল না। তাই সেটি ব্লগ হিসেবে শুরু হয়। আজ সেই ব্লগের পাঠক সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ। এই পথটা খুব একটা সোজা ছিল না। আমি যে মানুষগুলোর সামনে নির্দ্ধিধায় বলেছিলাম আমার দুঃখের কথা, আমার বিশ্বাস ভাঙার গল্প এবং জেদের জিহাদ তার মধ্যে তুই ছিলিস। অনয়, অনিমিখ, অভিষেক, অমিতাভ, শঙ্খ এই মানুষগুলো না থাকলে আমি ফিরতে পারতাম না। এই মানুষগুলো আমার জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছিল। তুইও আমার ভরসা হয়ে উঠেছিলিস। বলেছিলিস পাশে আছি। পাশে ছিলিসও, যেটুকু সময় ছিলিস।

আটপৌরে এলো ঝড়ের বেগে। ঠিক করা হলো অবশেষের সঙ্গে আটপৌরের কোনও সম্পর্ক থাকবে না। এমনকি প্রকাশনীর দপ্তরও পাল্টে ফেলা হবে। তোর দৌলতে আমাদের কাজটা সহজ হয়ে গিয়েছিল। বইপাড়ার প্রতি হয়ত তোর জন্যই প্রেমটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। তোর বাড়ির সামনে সবুজ রঙের একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। তোর বাড়ির ঠিক বিপরীতে একটা ছাপাখানা। সারাদিন কাগজ কাটার শব্দ। সরু রাস্তা, পুরোনো বাড়ি, বাড়ির বারান্দা, সরু গলি, হাতে টানা রিকশা, স্ট্রীট লাইট আর তুই! এইটুকুই তো পেয়েছিলাম।

তখন আমাদের দ্বিতীয় বর্ষ, তোর সঙ্গে মেলামেশা বেশ বেড়েছে। লোকে আমাদের নিয়ে কানাঘুষো কীসব বলছে। তবে ওইসবে আমরা কান দিইনি। ওই যে বললাম, সবসময় একটা দূরত্ব বজায় ছিল। তুই খুব সিগারেট খেতিস। একটা ছেলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যতটা খাওয়া যেতে পারে। আমার প্রবল বারণ সত্ত্বেও কমাসনি।
ততদিনে যদিও আমাদের মধ্যে একটা সমীকরণ তৈরি হচ্ছিল। যে সমীকরণ বলে দিয়েছিল, আকাশে মেঘ ঘনাচ্ছে। যখন তখন বৃষ্টি হতে পারে। আটপৌরে যেদিন ম্যাগাজিন হিসেবে প্রকাশ পাবে সেদিন আমরা একটা অনুষ্ঠানের কথা ভাবলাম। কলেজ স্কোয়ারের খোলা জায়গায় সেই অনুষ্ঠান করতে আমাদের হাড়হিম হয়ে গিয়েছিল। একে চিঠি লেখো তো তাকে বলো এইসব করতে করতে জুতোর শোল খুলে গিয়েছিল। অমুক সরকারী অফিস থেকে তমুক সরকারী বাবু, কাউকেও বাদ রাখেনি। সবার কাছে যেতে হয়েছিল। সেদিন দেখেছিলাম কলকাতার দুই দোর্দণ্ড প্রতাপ নেতাকে, অধুনা সেই দুজনই এখন শাসক দলের মন্ত্ৰী তথা মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ট। সময়টা সম্ভবত অগস্ট মাসের শেষের দিক। কলকাতা ভেসে গিয়েছে। আমি সকাল এগারোটা থেকে কলকাতা কর্পোরেশনে অপেক্ষা করছি। আজকেই পারসমিশনটা করতে হবে নয়ত আমাদের অনুষ্ঠান হবে না। মাথায় একরাশ চিন্তা ঘুরছে। তবুও কারুর দেখা নেই। সেদিন আমি একাই ছিলাম। অনয়, অনিমিখ, আর অভিষেক কলেজেই ছিল। কোনও একটা কারণ বশত ওরা কলেজে ছেড়ে আসতে পারেনি। আর তুই সেদিন কলেজে আসেসনি। তোর সঙ্গে সেদিন মেসেজ চালাচালি হচ্ছিল কর্পোরেশনের করিডরে দাঁড়িয়ে। বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে। তুই আমাকে ভরসা দিচ্ছিলিস অবিরাম। কর্পোরেশনের এক কর্মী বললেন, " এখন কাউকে পাবে না। ওনারা দুপুর তিনটের সময় আসবেন। এখন চলে যাও।" সেদিন কোথাও যাওয়ার ছিল না। ওখানেই অপেক্ষা করছিলাম। একবার করে সিগারেট খাচ্ছি আর বসছি। শুধু মনে হচ্ছিল ওনারা কি সত্যিই তিনটের সময় আসবেন নাকি? তবে প্রথম সেই দেখেছিলাম কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি একদম ঘড়ি ধরে অফিসে ঢোকেন। তিনটে মানে তিনটে। এক মিনিটও এদিক-ওদিক না। যদিও তিনি ঘড়ি ধরে ঢোকাতে আমার এমন কোনও কাজ হয়নি, উনি আমাকে আমহার্স্ট স্ট্রীট থানায় পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকে আমহার্স্ট স্ট্রীট থানায় গিয়েছিলাম এক হাঁটু জল পেরিয়ে। এককালে লোক মুখে শুনেছিলাম বর্ষায় নাকি শিয়ালদহ চত্ত্বরে খুব জল জমে। সেটা দেখাও হয়ে গেল এই সুযোগে। এক হাঁটু জল পেরিয়ে থানায় ঢুকলাম। থানায় ঢোকার আগে অন্তত এক কিলোমিটার জলকেলি করে এসেছি। এক হাতে জুতো জোড়া অন্য হাতে ছাতা। দুরুদুরু বুকে ওই জল পেরিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল এই জলে যদি সাপ থাকে কিংবা বিদ্যুতের তার খুলে পড়ে আছে। যদিও তেমন কিছু হয়নি, দিব্যি সেসব পেড়িয়ে এসেছিলাম। যদিও কাজের কাজ হয়নি। কিন্তু সেই বিশ্ৰী দিনের শেষে তুই এসেছিলিস। কলেজ স্ট্রীটের এক ঐতিহাসিক চায়ের দোকানে আমরা বসেছিলাম। অনেক কথা হয়েছিল, বৃষ্টিতে ভেজার পর ঠিক রোদ ওঠার মতো। একশো পেরোনো সেই চায়ের দোকানে আমরা অনিমেষ মাধবীলতার মতো সময় কাটিয়েছিলাম।

আটপৌরের প্রথম ম্যাগাজিনে তোর একটা লেখা ছিল। লেখার শিরোনাম 'ভাসান ড্যান্স', যদিও তোর খুব একটা লেখার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমার ইচ্ছে ফেলতে পারিসনি। হয়ত ওটাই তোর প্রথম এবং শেষ প্রকাশিত লেখা। আটপৌরের প্রথম অনুষ্ঠানের জন্য একটি পথ নাট্য লিখেছিলাম। তোরা অভিনয়ের জন্য রাজিও হয়েছিলিস। নিয়ম করে রিহার্সাল করতাম কলেজে। তোরা বেশ আমাকে সঙ্গ দিচ্ছিলিস। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাটকটি তোরা করিসনি। কিন্তু অনুষ্ঠানটা ধুমধাম করে হয়েছিল। তোর সূত্র ধরেই বাংলা ব্যান্ডের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাপ এবং তখনকার এক উঠতি বাংলা ব্যান্ড (বড্ড সফলভাবে এখন জায়গা করে নিয়েছে) যারা আমাদের মুক্ত মঞ্চের অনুষ্ঠানে এসে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সবটাই সম্ভব হয়েছিল তোর জন্য। তোকে আজকের দিনে দাঁড়িয়েও কুর্নিশ করি। সত্যি তুই না থাকলে এতটা সফলভাবে প্রচার পেতাম না।

আজকাল মাঝেমধ্যে তোকে টিভি সিরিয়ালের পর্দায় দেখতে পাই। খুব ছোট চরিত্র হলেও তোকেই চোখে পড়ে বারবার। জীবন এখন অন্য পথে বয়ে চলেছে। অনেকগুলো বয়স পেড়িয়ে গিয়েছে রূপকথারা। আটপৌরে বুড়ো হয়েছে। আটপৌরের সম্পাদক এখন একটু স্থিতধী। আজকাল খুব একটা কারুর সঙ্গে আড্ডা দিতে বসি না। কাছের বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। ইচ্ছে করেই একটা দূরত্ব রেখেছি। একটা সংযম রেখেছি। নিজের কাছে নিজের গুরুত্বটা বোঝাতে শিখেছি। বেশীভাগ সময়টা এখন বই পড়ে নয়ত ব্যায়াম করে কাটায়। আর চাতকের মতো অপেক্ষা করি কবে চাকরির ডাক আসবে। কবে আবার উড়ো চিঠির খোঁজ আসবে। প্রসেস,সত্যায়নের পথে এগোচ্ছি। একটু একটু করে। তাই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছি নিজের ভিতরে।

তোর মনে পড়ে তোর বাড়ি যেতাম তোকে টিউশনি দিতে। হাতে গুনে তিনজন এই খবরটা জানত। তাও আবার 'থিয়েটার' পড়াতে। দ্বিতীয় বর্ষের শেষ সেমিস্টারে ওইটি আমাদের পাঠ্য ছিল। আমি তখন চুটিয়ে নাটক করছি। তোর পড়ানোর চক্করে আমি একটু নিজেকে মহান ভাবতে শুরু করেছিলাম, ল্যাজ মোটা হচ্ছিল। বুক চওড়া হচ্ছিল। ততদিনে আটপৌরে একটু নাম করেছে। আমিও নিজেকে অবতার ভাবতে শুরু করেছিলাম। তবে তোকে পড়ানোর চেয়ে তোর বাড়ি যাওয়াতে আমি বেশী উৎসাহিত ছিলাম। আসলে তোর বাজে বকাগুলো বড্ড উপভোগ করতাম। একবার চিকেন চাউমিন বানিয়েছিলিস আমার জন্য। এত লবণ দিয়েছিলিস যে সেটা মুখে তুলতে পারছিলাম না। কিন্তু তবুও হাসিমুখে ওইটুকু স্বীকার করেছিলাম।

কিন্তু আকাশে ঘন মেঘ জড়ো হয়েছিল। বৈঠকখানা লেন থেকে আমার দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছিল। প্রতিনিয়ত আটপৌরে নিয়ে মিটিং এবং কাজের খতিয়ান দেখতে দেখতে নিজেকে কেমন একটা হনু মনে হতে শুরু হয়েছিল। রাগের হদিশ থাকত না। কাকে কী বলতাম, কত অপমান, কত অভিযোগ ছুঁড়ে দিয়েছি তোর দিকেও। একদম কর্পোরেট সম্পাদকের মতো ব্যবহার শুরু করেছিলাম। আজ নন্দন তো কাল কলেজ স্ট্রীট, আজ অমুক তো সেদিন তমুক! মিটিং চলছে, অথচ উপার্জন হচ্ছে না। যাকেতাকে গালাগাল দিচ্ছি, কুকথা বলছি! তুইও বাদ যাসনি। দেখতে দেখতে তৃতীয় বর্ষে উঠলাম। আমাদের ক্লাসে তখন কিছু অলিখিত রাজনীতি শুরু হলো। কাদের কথায় ক্লাস চলবে সেই নিয়ে লবিও ঠিক হলো। আমার খুব কাছের বন্ধুরা একটা লবিতে আর তুই তখন অন্যদিকে। চাইলে আমিও রাজনীতি দেখাতে পারতাম তবে নিজেকে পরোক্ষভাবে লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমিও মদত দিতাম তবে সামনে থাকতাম না। তোর সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল। কলেজ থেকে আমাদের এক্সকারশনে নিয়ে যাওয়া হলো উত্তরবঙ্গ। মূলত দুই লবির লোকই ছিল। আমাদের লবির জোর বেশী ছিল সবসময়। কিন্তু এই গোটা পাঁচদিন ঘুরতে যাওয়ায় আগে ভেবেছিলাম আমাদের দূরত্ব ঘুচবে কিন্তু সেটা হয়নি। তুইও দূরত্ব বজায় রেখেছিলিস, আমিও সংযত ছিলাম। মনে পড়ে অপর লবির নেত্রী ছুড়ি নিয়ে দৌড়ে এসেছিল আমাকে মারার জন্য? সেসব সোনালি দিন আজকেও অকারণে হাসিয়ে দিয়ে যায়!

কেন জানি না ইদানীং তোর কথা মনে পড়ছে। কলেজে ছাড়ার পর আর একবারের জন্যও তোর সঙ্গে কথা হয়নি। দু' একবার মেসেজ করেছিলাম কিন্তু উত্তর আসেনি। যদিও কোনওদিন আর ফোন করার সাহস হয়নি, হয়ত হবেও না। ঝরা পাতার দল আমাদের একসঙ্গে আর ভোর দেখাবে না কোনওদিন। একসঙ্গে নেশা করা হবে না। সেদিন যখন অফিস থেকে ফিরছিলাম তখন তোর বিয়ে প্রায় শেষ লগ্নে। কত কাছে থেকেও থাকা হল না। আফসোস হয় আজকে। কতবার তোর বাড়ির পথ ধরে ফিরেছি তবুও তোর সঙ্গে আর কখনও দেখা হয়নি। তোর মনে আছে একটা গান তুই আমাকে রেকর্ড করে পাঠিয়েছিলিস। 'এইটা তোমার গান', এখনও আমার ল্যাপটপে সযত্নে তোলা রয়েছে।তবে ল্যাপটপটা বিগড়েছে কিন্তু স্মৃতিটা নয়। এখনও শুনি, বেশ লাগে শুনতে। লোকমুখে শুনেছি তুই এখন কলকাতায় থাকিস। বিয়ের কিছু বছরের মধ্যেই নাকি সেই সম্পর্কে ইতি টেনেছিস। সত্যি মিথ্যে জানি না। তবে সোশ্যাল মিডিয়া দেখে আমরাও তাই মনে হয়। কেমন আছিস রে? যাবি আবার কফি হাউসে? বাচালপনাটা এখনও বাঁচিয়ে রাখিস, ওটাই তোর ভাল থাকার রাস্তা।মনে পড়ে তোকে নিয়ে লিখেছিলাম, তুলি পাহাড়ে পালিয়ে যাস, এই শহরটা ভালবাসতে ভুলে গিয়েছি। তখন খুব চলেছিল এই লাইনটা। শেয়ার হয়েছিল খুব।

যদি কোনওদিন সেই চেনা পথে দেখা হয়, চিনতে পারবি? আবার হেসে উঠবি অনাবিল আনন্দে? সিগারেট ছেড়েছি এক বছর হতে চলল। এখন আর নেশা করি না। ভদ্র হয়েছি। অদৃশ্য সেই ল্যাজটা ভ্যানিশ হয়েছে। এখন একাই থাকি। দূরত্ব রাখি অনেকটা। কৃষ্ণচূড়ার দল আজকেও ভিড় করে, ভিড় করে চেনা পাখির সারি। বইপাড়ায় কোলাহলে আজও তুই দিব্যি আছিস, থাকবি। ভাল থাকিস তুলি।
ইতি সম্পাদক।

ট্যাগসূচী:#love#life#college#office
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev