বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

লিটিল থিংস

দমকা হাওয়ার মতো সাবালক হতে চেয়েও পারেনি। তুমি এই দেশেই, এই শহরে তবুও তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

লিটিল থিংস
|লিটিল থিংস

ইদানীং পাশের বাড়ির ছাদে মেয়েটাকে অনেকদিন দেখিনি। আগে রোদ পোয়াতে আসত ছাদে। তখন ঝরা বসন্তের মরসুম। মেয়েটার মধ্যে মায়া ছিল বড্ড। মেয়েটা কুকুর ভালবাসত। তোমার মতোই ভিজে চুল এলিয়ে বসত রোদে। দেখতে দেখতে একটা বছর পেরিয়ে গেল। তোমার হয়ত মনে নেই। মনে থাকারও কথা নয়। আমি সবসময় আঁকড়ে ধরে বসে থাকি। এককালে উমা বলত। সেই স্বভাব এখনও ছাড়তে পারেনি। তোমাকে বহুদিন দেখিনি। তোমার জন্য অফিস ফেরত চুপচাপ গান শুনতে শুনতে দু'লাইন লিখেও মুছে ফেলেছি। বুকের ভেতরটা কুঁকড়ে উঠেছে। কষ্ট হয়েছে এই ভ্যাপসা গরমের মতো। ট্রেনের জানলার পাশে সিটটায় বসে মনে হয়েছে তোমাকে নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লিখে ফেলি। লিখতে গিয়েও থমকে গিয়েছি। দমকা হাওয়ার মতো সাবালক হতে চেয়েও পারেনি। তুমি এই দেশেই, এই শহরে তবুও তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। কত মেঘ করে এলো সন্ধেতে, ঢেকে দিল আমাদের চেনা পথ। তবুও তোমাকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি। এই ক্যাবলা দেশ তোমার জন্য নয় দেবী। তোমার জন্য বিদেশের ঝরা পাতাই ঠিক আছে। গুয়ে ভরা রাস্তা তোমার জন্য নয়। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা গলির মোড়ে আলো আমাদের জন্য নয়। মনে পড়ে তারক স্যারের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে যেতাম। তারক স্যার আমাদের অমরকৃষ্ণ পাঠশালার গণিতের শিক্ষক। আমার সঙ্গে খুব একটা সখ্যতা না থাকলেও মুখোমুখি হলে অবশ্যই স্যারের পায়ে হাত দিয়ে পেন্নান ঠুকি। এইটুকু আমার ধাতে আছে। মনে পড়ে দেবী, তুমি জানুয়ারীর শেষে দেশে ফিরলে। প্রথম দিন দেখে মনে হয়েছিল হয়ত কোনও যুদ্ধ শেষে ফিরলে। একদম ক্লান্ত এবং রুগ্ন। সেই জেল্লা নেই, নেই অহংকার নেই। সেই হাজার পাঁচেকের দামী পারফিউম ব্যবহার করা মেয়েটা আজ শুধু বাঁচতে চাই। আমার মাথায় নয়ত চুল গজায়নি। সদ্য পিতৃ বিয়োগের যন্ত্রনা সামলে কঠিন হয়ে উঠেছি। আমরা হঠাৎ মুখোমুখি হলাম। যদিও হঠাৎ নয়। বিশেষ সূত্রে খবর পেয়েই একটা নাটকীয় প্লটের মতো আমিও আমাদের সেই ক্যাফেতে হাজির হলাম। সঙ্গে বেশ কয়েকজন কুচো রাজনৈতিক কর্মী। মুখোমুখি হলাম। তুমি একদম অচেনা একজনের মতো এড়িয়ে গেলে। দেখে মনে হলো আমি নিতান্তই তুচ্ছ, তাচ্ছিল্যে ভরা একজন। সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। তুমি বোঝোনি। হয়ত বোঝার কথাও নয়। তুমি এই বিষয়ে খুবই স্বার্থপর। হয়ত এটাই ঠিক। তবুও তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল তুমি অন্যের কষ্টটা বোঝো। এইটুকু মানবিকতা আছে তোমার।

কিন্তু সে আশায় এক বালতি জল ঢেলে দিব্যি উড়ে গেল। নিমেষে গায়েব হয়ে গেলে। সবসময় তোমার ঘেঁটে থাকাটা সবার থেকে বড় হয়ে উঠেছে। তোমার খারাপ থাকাটা সবার চেয়ে বেশী হয়ে উঠেছে। তোমার বিবাহিত জীবন নাকি বরাবরই ঘেঁটে যাওয়া। তোমার মুখ থেকেই শুনেছি সেই গল্প। তবুও সেই গল্প কোনওদিন বুঝতে চাইনি। শুধু তোমার ভাল থাকাটা প্রাধান্য পেয়েছে। তুমি ওই দেশে চলে যাওয়ার পরে তোমার তথাকথিত প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে কথা হতো। যদিও তাঁর সঙ্গে একটা সময় প্রচন্ড কথাকাটাকাটি, ঝামেলা অবধি জল গড়িয়েছিল। তোমার কথামতোই তাঁর সঙ্গে আগে যোগাযোগ করে তারপর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। সেই ছিল তোমার অলিখিত গার্জেন। ইদানীং তোমার বাড়ির রাস্তা দিয়ে ফিরি। তবুও একবারও তোমার দেখা পাইনি। কেন ফিরি জানি না, ইচ্ছে হয়। এইসবের জন্য পার্থের কাছে প্রচন্ড গালমন্দ খেয়েছি। তবুও ওই ছুটে যাওয়ার নেশা ছাড়তে পারেনি। কী ছিল তোমার মধ্যে যা আজও আমাকে দৌড়ে নিয়ে বেড়ায়?সেই দামি পারফিউমের গন্ধ নাকি অন্য কোনও নেশা? দেবী ঠিক গত বছর এই সময় আমরা নিয়ম করে দেখা করছি। মনে থাকার নয় যদিও তবুও লিখছি। তোমাকে অনেকগুলো বই দিয়েছিলাম। যে বইগুলো তুমি কোনও অজানা বাক্সে রেখে বলেছিলে সব তোমার সঙ্গে করে বরফের দেশে নিয়ে গিয়েছো। সেই দিনও বেশ খারাপ লেগেছিল। একটা ছোট্ট মিথ্যে কতটা কষ্ট দিতে পারে, তুমি বুঝবে না। তোমার জন্য তোমার পাশে পথের যাত্রী তোমার কাছে অস্তিত্বহীন। তুমি যে পথে হাঁটো সেই পথকেও নিজের করে দাও, শুধুমাত্র ওইটুকু সময়ের জন্য। তারপর আর খোঁজ রাখো না। অসম্ভব জটিল তুমি। কতবার বোঝার চেষ্টা করেও পারেনি।

সেদিন বাবাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে ফিরছি। রাস্তা ফাঁকা। কত কাছের রাস্তাটা বাবা অ্যাম্বুলেন্স করে ফিরছে। আমি বাবার পাশে বসে। তখন একবার বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো তোমার মুখটা ভাসছিল। তখন তোমার ওখানে সকাল। সদ্য রোদের আলো এসে পড়েছে। সেই রোদের আলো বাবার আর দেখা হলো না। দিব্যি শুয়ে কাটিয়ে দিল। এখন প্রতিদিন শুতে যাওয়ার আগে সেদিনের পুরো ঘটনাটা ফিরে ফিরে আসে। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এখনও বিশ্বাস হয়না বাবা নেই। কতকিছু নিয়ে কত ভাবি, কত লেখালেখি করি তবুও বাবা যে এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারে সেটা কল্পনায় আসেনি। সত্যি বলছি দেবী, তোমাকে ছুঁয়ে বলছি। এই যা, তোমাকে তো আর ছুঁতে পারব না। সেই অধিকার, সুযোগ কোনটাই নেই। তুমি বরাবর একটা লক্ষণ রেখা সাজিয়ে রেখেছো। হয়ত আমিই সেই রেখা ভাঙতে চেয়েছি। তোমার বিবাহিত জীবন যেন আরও ঝলমলে হয়ে উঠুক সেটাই চেয়েছি। তোমার হাতের প্লাটিনামের আংটিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, এইটুকুই চেয়েছি।

বাবার শরীরটা কয়েক ঘন্টার পাথর হয়ে গিয়েছিল। সেদিন বাবাকে দাহ করার অবধি একবারের জন্যও বুকের মধ্যে দপদপ হয়নি। তোমার মনে আছে যেদিন আমার সঙ্গে দ্বিতীয়বারের জন্য দেখা করতে এসেছিল সেদিন তোমার মধ্যে উদ্বেগ জেগেছিল। ঘনঘন ফোন দেখছিলে পা নাচাচ্চিলে। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় পাচ্ছিলে। সেদিন তোমার মধ্যে এই রোগটার প্রথম খোঁজ পাই। তারপর কেটে গিয়েছে একবছর। এখনও আমাকে মুখোমুখি দেখল হয়ত ঘাবড়ে যাবে। কী করবে বুঝতে পারবে না। একজন ধর্ষকে দেখলে জনসাধারণ যেমন করে তুমিও আজকাল সেইরকম করে ওঠো। সেদিন আমি আর পার্থ ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে। তোমার প্রিয় বন্ধু আমাকে দেখে দোকানে না ঢুকে অন্য জায়গায় চলে গেল। আশ্চর্য হয়েছিলাম। আসলে তুমি কিংবা তোমার প্রিয় বন্ধু দুজনেই একই গোত্রীয়। সেইদিন থেকে আমার কপাল ভাল। সোহমের মতো জান কবুল বন্ধু পেয়েছি। যে সাত পাঁচ না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কৌশকের মতো দূর পথে যাওয়ার জন্য সারথী পেয়েছি। সামনে কী আছে ওইসব না ভেবে পাশে চলবে। ছোটবেলায় আমরা এই কাঠফাটা রোদে দশ বারো কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে জাস্ট ঘুরতে গিয়েছি। এমনিই। নতুন পথের খোঁজে। এই বন্ধুগুলো ছিল বলেই তো নির্দ্বিধায় এখনও স্বপ্ন দেখতে পারি। দিনের পর দিন কৃতিকে দিয়ে তোমাকে মেসেজ পাঠিয়েছি। কৃতির ভাল মেয়ের মতো আমার সব বাঁদরামি সহ্য করে নিয়েছে। কৌশিকের বউ না হলে হয়ত এতদিনে আমার আর মুখ দেখত না। যদিও এই নিয়ে কৌশিক কতটা নাক সিটকায় সেটা আমার অজানা। তোমাকে নিয়ে লিখছি শুনে পার্থ হুমকি দিয়েছে ব্লক করে দেবে!

বুঝতে পারছো মানুষগুলোর গুরুত্ব কতটা। তবুও লিখছি দেবী। অঞ্জলি দেওয়ার মতো একটা ফুরফুরে দিনে তুমি রবিবার সাজয়েছো। ফুল তুলেছো। গান বেঁধেছো। আর ব্লক করার মতো তুচ্ছ ব্যাপারে ভয় দেখিয়ে একটা সুন্দর মুহূর্ত ভোলার চেষ্টা করেছো। আমাকে বহুবার হুমকি দিয়ে শেষে ব্লক করে দিয়েছো, এমনকী লিঙ্কইন্ড-এও ব্লক করে রেখেছো। কতটা ঘেঁটে যাওয়া হলে এমন হয়। তোমার জন্য মাঝেমধ্যে কষ্ট হয়। তোমার চেয়ে অনেক অনেক কম টাকার একটা ছোট্ট চাকরি করি। সদ্য দেড় মাস হয়েছে। ট্রেনেই চেপে যাওয়া আসি করি। তোমার জন্য দুই তিনটে গাড়ি নেই। আমি বরাবরই ছাপোষা। তোমার মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা বা অর্থ কোনটাই নেই। অত পড়াশুনাও নেই। শেষ মনে হয় ক্লাস এইট। তারপরে আর পড়াশুনা হয়নি। এই লেখাটা তোমার জন্য। হয়ত বন্ধু হিসেবে কিংবা বন্ধুর চেয়ে একটু বেশী কিছু। তবুও বিষয়টা আমার কাছে খুব সহজ। তোমাকে ভালবেসেছি। ব্যস এইটুকু জানি। এর বাইরে কিছু নয়। ভালবাসা মানে তোমাকে পাওয়া নয়। ভালবাসা মানে তোমাকে কেড়ে নেওয়া নয়। ভালবাসা মানে ভালথাকা। ব্যস এইটুকু। তোমার জীবনে ঝড় হয়ে নয় বই হিসেবে থাকতে চেয়েছি। তখন নভম্বরের শেষ। ঘড়িতে রাত একটা। জীবনে গঙ্গায় ঢুব না দেওয়া আমি প্রচন্ড কাঁপতে কাঁপতে বাবার অস্থি ভাসিয়ে ফিরছি। জীবনটা কয়েক ঘন্টায় এলোমেলো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল কত ভুলের শাস্তি পাচ্ছি। একটা জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে বাবা না থাকার পরে বুঝেছি। একটা সময়, ঘড়ির বদলে যাওয়া। কপালে রোদের ঝলকানিতে পুড়ে যাওয়া। তোমার কয়েকটা পারফিউমের বোতলের সমান মাইনের জন্য সল্টলেকে দৌড়ে যাওয়া। গল্পটা শেষ হয়ে গিয়েছে। তবুও রেশ রয়ে গিয়েছে। তোমার জন্য মন থেকে আর কিছু আসে না। জীবনের সবচেয়ে চরম শত্রুও তোমার থেকে ভাল। তোমার চেয়ে স্নেহময়। তবুও যদি কোনওদিন আবার একটা চিঠি পেয়ে হেসে ওঠো, চিঠির সংকেত শুধু তুমি বুঝতে পারো। যদি আবার একটা রোদ দেখে আমার কথা মনে আসে, বুঝবে আমাদের মুহূর্তরা বেঁচে আছে। যার নাম লিটিল থিংস।

ট্যাগসূচী:#love#life
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev