ইদানীং পাশের বাড়ির ছাদে মেয়েটাকে অনেকদিন দেখিনি। আগে রোদ পোয়াতে আসত ছাদে। তখন ঝরা বসন্তের মরসুম। মেয়েটার মধ্যে মায়া ছিল বড্ড। মেয়েটা কুকুর ভালবাসত। তোমার মতোই ভিজে চুল এলিয়ে বসত রোদে। দেখতে দেখতে একটা বছর পেরিয়ে গেল। তোমার হয়ত মনে নেই। মনে থাকারও কথা নয়। আমি সবসময় আঁকড়ে ধরে বসে থাকি। এককালে উমা বলত। সেই স্বভাব এখনও ছাড়তে পারেনি। তোমাকে বহুদিন দেখিনি। তোমার জন্য অফিস ফেরত চুপচাপ গান শুনতে শুনতে দু'লাইন লিখেও মুছে ফেলেছি। বুকের ভেতরটা কুঁকড়ে উঠেছে। কষ্ট হয়েছে এই ভ্যাপসা গরমের মতো। ট্রেনের জানলার পাশে সিটটায় বসে মনে হয়েছে তোমাকে নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লিখে ফেলি। লিখতে গিয়েও থমকে গিয়েছি। দমকা হাওয়ার মতো সাবালক হতে চেয়েও পারেনি। তুমি এই দেশেই, এই শহরে তবুও তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। কত মেঘ করে এলো সন্ধেতে, ঢেকে দিল আমাদের চেনা পথ। তবুও তোমাকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি। এই ক্যাবলা দেশ তোমার জন্য নয় দেবী। তোমার জন্য বিদেশের ঝরা পাতাই ঠিক আছে। গুয়ে ভরা রাস্তা তোমার জন্য নয়। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা গলির মোড়ে আলো আমাদের জন্য নয়। মনে পড়ে তারক স্যারের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে যেতাম। তারক স্যার আমাদের অমরকৃষ্ণ পাঠশালার গণিতের শিক্ষক। আমার সঙ্গে খুব একটা সখ্যতা না থাকলেও মুখোমুখি হলে অবশ্যই স্যারের পায়ে হাত দিয়ে পেন্নান ঠুকি। এইটুকু আমার ধাতে আছে। মনে পড়ে দেবী, তুমি জানুয়ারীর শেষে দেশে ফিরলে। প্রথম দিন দেখে মনে হয়েছিল হয়ত কোনও যুদ্ধ শেষে ফিরলে। একদম ক্লান্ত এবং রুগ্ন। সেই জেল্লা নেই, নেই অহংকার নেই। সেই হাজার পাঁচেকের দামী পারফিউম ব্যবহার করা মেয়েটা আজ শুধু বাঁচতে চাই। আমার মাথায় নয়ত চুল গজায়নি। সদ্য পিতৃ বিয়োগের যন্ত্রনা সামলে কঠিন হয়ে উঠেছি। আমরা হঠাৎ মুখোমুখি হলাম। যদিও হঠাৎ নয়। বিশেষ সূত্রে খবর পেয়েই একটা নাটকীয় প্লটের মতো আমিও আমাদের সেই ক্যাফেতে হাজির হলাম। সঙ্গে বেশ কয়েকজন কুচো রাজনৈতিক কর্মী। মুখোমুখি হলাম। তুমি একদম অচেনা একজনের মতো এড়িয়ে গেলে। দেখে মনে হলো আমি নিতান্তই তুচ্ছ, তাচ্ছিল্যে ভরা একজন। সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। তুমি বোঝোনি। হয়ত বোঝার কথাও নয়। তুমি এই বিষয়ে খুবই স্বার্থপর। হয়ত এটাই ঠিক। তবুও তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল তুমি অন্যের কষ্টটা বোঝো। এইটুকু মানবিকতা আছে তোমার।
কিন্তু সে আশায় এক বালতি জল ঢেলে দিব্যি উড়ে গেল। নিমেষে গায়েব হয়ে গেলে। সবসময় তোমার ঘেঁটে থাকাটা সবার থেকে বড় হয়ে উঠেছে। তোমার খারাপ থাকাটা সবার চেয়ে বেশী হয়ে উঠেছে। তোমার বিবাহিত জীবন নাকি বরাবরই ঘেঁটে যাওয়া। তোমার মুখ থেকেই শুনেছি সেই গল্প। তবুও সেই গল্প কোনওদিন বুঝতে চাইনি। শুধু তোমার ভাল থাকাটা প্রাধান্য পেয়েছে। তুমি ওই দেশে চলে যাওয়ার পরে তোমার তথাকথিত প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে কথা হতো। যদিও তাঁর সঙ্গে একটা সময় প্রচন্ড কথাকাটাকাটি, ঝামেলা অবধি জল গড়িয়েছিল। তোমার কথামতোই তাঁর সঙ্গে আগে যোগাযোগ করে তারপর তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। সেই ছিল তোমার অলিখিত গার্জেন। ইদানীং তোমার বাড়ির রাস্তা দিয়ে ফিরি। তবুও একবারও তোমার দেখা পাইনি। কেন ফিরি জানি না, ইচ্ছে হয়। এইসবের জন্য পার্থের কাছে প্রচন্ড গালমন্দ খেয়েছি। তবুও ওই ছুটে যাওয়ার নেশা ছাড়তে পারেনি। কী ছিল তোমার মধ্যে যা আজও আমাকে দৌড়ে নিয়ে বেড়ায়?সেই দামি পারফিউমের গন্ধ নাকি অন্য কোনও নেশা? দেবী ঠিক গত বছর এই সময় আমরা নিয়ম করে দেখা করছি। মনে থাকার নয় যদিও তবুও লিখছি। তোমাকে অনেকগুলো বই দিয়েছিলাম। যে বইগুলো তুমি কোনও অজানা বাক্সে রেখে বলেছিলে সব তোমার সঙ্গে করে বরফের দেশে নিয়ে গিয়েছো। সেই দিনও বেশ খারাপ লেগেছিল। একটা ছোট্ট মিথ্যে কতটা কষ্ট দিতে পারে, তুমি বুঝবে না। তোমার জন্য তোমার পাশে পথের যাত্রী তোমার কাছে অস্তিত্বহীন। তুমি যে পথে হাঁটো সেই পথকেও নিজের করে দাও, শুধুমাত্র ওইটুকু সময়ের জন্য। তারপর আর খোঁজ রাখো না। অসম্ভব জটিল তুমি। কতবার বোঝার চেষ্টা করেও পারেনি।
সেদিন বাবাকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স করে ফিরছি। রাস্তা ফাঁকা। কত কাছের রাস্তাটা বাবা অ্যাম্বুলেন্স করে ফিরছে। আমি বাবার পাশে বসে। তখন একবার বিদ্যুৎ খেলে যাওয়ার মতো তোমার মুখটা ভাসছিল। তখন তোমার ওখানে সকাল। সদ্য রোদের আলো এসে পড়েছে। সেই রোদের আলো বাবার আর দেখা হলো না। দিব্যি শুয়ে কাটিয়ে দিল। এখন প্রতিদিন শুতে যাওয়ার আগে সেদিনের পুরো ঘটনাটা ফিরে ফিরে আসে। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এখনও বিশ্বাস হয়না বাবা নেই। কতকিছু নিয়ে কত ভাবি, কত লেখালেখি করি তবুও বাবা যে এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারে সেটা কল্পনায় আসেনি। সত্যি বলছি দেবী, তোমাকে ছুঁয়ে বলছি। এই যা, তোমাকে তো আর ছুঁতে পারব না। সেই অধিকার, সুযোগ কোনটাই নেই। তুমি বরাবর একটা লক্ষণ রেখা সাজিয়ে রেখেছো। হয়ত আমিই সেই রেখা ভাঙতে চেয়েছি। তোমার বিবাহিত জীবন যেন আরও ঝলমলে হয়ে উঠুক সেটাই চেয়েছি। তোমার হাতের প্লাটিনামের আংটিটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক, এইটুকুই চেয়েছি।


