রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

দেবীর দেশ, পর্ব ৬

ইতিহাসে উল্লেখ আছে, শাজাহানের এবং মমতাজ হুগলী বন্দরে পরিভ্রমণের সময় পর্তুগিজরা মমতাজকে লাঞ্ছিত করেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের নৌকায় আক্রমণও করা হয়।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ

দেবীর দেশ, পর্ব ৬
|দেবীর দেশ

পুজো এলেই তোমার কথা মনে পড়ে। রাতুল এখনও অবসরে হেঁটে আসে তোমার বাড়ির পথ ধরে। মায়া জড়ানো সেই পথে, বিষণ্ণতা ছাড়া আর কিছুই নেই। বহুকাল আগে স্বামী বিবেকানন্দর ভাই নৈহাটি এসেছিলেন। এসেই তিনি আবদার জুড়েছিলেন এই পবিত্র নৈহাটির মাটিতে রয়েছে চার ধাম, সেই চার ধামের মাটি তিনি সঙ্গে নিয়ে যাবেন। এই মাটিতে জন্মেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, কেশব সেন এবং বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের মতো মহাপুরুষ যে মাটিতে জন্মায়, সেই স্থানের মাটি তো পবিত্র। কথিত আছে, এই চার ধামের মাটি তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই পবিত্র মাটিতে বড় হয়ে উঠেছে রাতুল এবং দেবী।দুটো আলাদা জীবন তবুও তারা একই মাটির সন্তান।

তাদের ক্রমাগত দেখা হতে শুরু করল সেই সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফেতে। বসন্তের শেষ প্রহরে তাদের জীবনে ফিরে এল প্রাক বসন্তের ছোঁয়া। দেবী ছিল নীরবতার পূজারি। ফুল ভালবাসত মেয়েটা। যে ফুলের নাম জানত না রাতুল, তবুও তারই প্রেমে পড়ল সে। জীবনের পটভূমি হয়ত এইভাবেই লেখা হয়। হয়ত এইভাবেই আমরা একে অন্যের জীবনে এসে পড়ি। দেবীর শুকিয়ে ওঠা শরীরে শুধুই না পাওয়ার গল্প। চোখের তলায় পলি। ঠোঁটে খিন্ন বিবাহিত জীবনের দিনলিপি। তবুও মেয়েটা ভালবেসে ফেলল এক ক্ষুদ্র লেখককে। যার জীবন তখন অস্থিরতায় ভরা। সম্বল নেই কিছুই। নেই শক্ত কাঁধ, দৃঢ় হাত। তবুও ওরা একে অন্যের জন্য চেয়ে রইল। দেবীর হাসিটা রাতে ঘুমের ওষুধ হয়ে উঠল ছেলেটার। অন্যদিকে রাতুলের গলায় শোনা বাংলা কবিতার কিছু লাইন ছুঁয়ে গেল দেবীর গোপনীয় সব। তার বিবাহিত জীবনের প্রলেপ হয়ে উঠল ছেলেটা। দেবীর যে হাসি হারিয়ে গিয়েছিল ফিনল্যান্ডের গভীর অরণ্যে, রাতুল সেই হাসি ফিরিয়ে দিল নৈহাটির পথে।

ভাগীরথীর তীরে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নদীচরে বসতে শুরু করছিল এক হাট। যে হাটকে বলা হত নতুন হাট। আবার এই হাটেই নাকি কেনাবেচা হতে শুরু করল রমণীদের, যার থেকে এই হাটের নাম হয়ে গেল নটিহাটি যা থেকে কালক্রমে নৈহাটি। যদিও এই নিয়ে তর্ক আছে বিস্তর।কথিত আছে ওপারে সাতগাঁ বন্দরে বানিজ্য করতে আসা পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা ফাঁকা বন্দরের খোঁজে এসে পড়ল নতুন হাটে। নোঙর ফেলল। ততদিনে এই হাটে সুন্দরী মেয়েদের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। মূলত সেই টানেই ভিড় বাড়তে শুরু করল তাদের। তাদের আমলেই শুরু হয় ক্রীতদাসী কেনাবেচা। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, শাজাহানের এবং মমতাজ হুগলী বন্দরে পরিভ্রমণের সময় পর্তুগিজরা মমতাজকে লাঞ্ছিত করেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের নৌকায় আক্রমণও করা হয়। মমতাজের সঙ্গে থাকা অনেক দাসীদের তারা বন্দি করে এই নটিহাটিতে পাঠিয়ে দেয়। যে নটিহাটি ধীরে ধীরে আজকের নৈহাটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরনো ইতিহাসকে মুছে নতুন ইতিহাস লেখার তাগিদে সে এগিয়ে গিয়েছে। ঠিক যেভাবে রাতুল এবং দেবী এগিয়ে গিয়েছে নতুন ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে। শরতের আদুরে রোদকে গায়ে মেখে দু'জন দুটি দেশে খুঁজে নিয়েছে সুখ।

ওরা জানত, এই প্রেমের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। এখানে শুধু দূরত্ব, বিষণ্ণ মেঘ আর হাহাকার। তবুও ওরা জাপটে ধরেছিল অবসরে। সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফের ভিতর প্রায় প্রতিদিন ওদের আসর বসত। দু'কাপ গ্রিন টি ছিল ওদের দোসর।ওদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা সাহিত্য আর বিদেশের দিকশুন্যপুর। রোগা, খিন্ন মেয়েটার মুখে যে হাসির ঝিলিক দেখেছিল রাতুল, সেটাই ছিল রাতুলের ভাল থাকার ঠিকানা। সে জানত, একদিন দেবী হারিয়ে যাবে তবুও এই মুহূর্তের জন্য, এই মায়ার জন্য বেঁচে থাকা। ওই ক্যাফের ভিতরে ছিল একটা ছোট্ট সাউন্ড বক্স, সেখানে বাজত বিভিন্ন গান। খদ্দেরকে আকর্ষণ করতে যা যা বাজানো হতে পারে। সেই সুন্দরী মহিলা, যিনি ধ্যানরত হয়ে বসে থাকতেন, তিনিই সুন্দর সুন্দর গান বাজাতেন। সেই মহিলার সঙ্গে ফন্দি করে রাতুল দেবীর ভাল লাগার গানগুলো বাজাতে শুরু করল ক্যাফেতে। দেবী আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল। যে ব্যাকুলতা ভুলিয়ে দিল তাদের বয়সের ভেদাভেদ। ভুলিয়ে দিল সামাজিক বাধ্যবাধকতা। রাতুল দেবীর ওই হিরে বসানো প্ল্যাটিনামের আংটির দিকে তাকিয়ে থাকত। কোথাও কোথাও জন্ম নিত অহংকার। যদি সে সেই আংটির মালিক হতে পারত তাহলে কেমন হত? কিন্তু রাতুল তখন নিরুপায়। অর্থনৈতিক সম্বলহীন পুরুষের মূল্য নেই কোথাও। কোনওদিনই ছিল না। রাতুলকে আবার ফিরতে হত সেই গরিফায়। সে গরিফার ছোট্ট গলিতে বসত গাঁজার আসর, দেশি মদের ফোয়ারা। বাড়ি ঢুকলেই কলতলার অশান্তি। রাতুলের জীবনের থেকে অনেকটা সহজ ছিল দেবীর জীবন। আসলে আমরা যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে অন্যদের দেখি, তখন মনে হয় তারা হয়ত আমাদের চেয়ে ভাল আছে। এই যেমন আজ দুর্গা পুজোর নীলচে আকাশ, পেঁজা তুলোর মেঘ, গলি ধরে ছুট্টে যাওয়া ছোট্ট মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে ও বেশ ভাল আছে। হয়ত আছে কিংবা নেই। কে জানে, দেবী এখন কোন দেশে! এখন কি তার হাতের সেই আংটিটা জ্বলজ্বল করে? আদৌ সেই আংটিটা সে হাতে রেখেছে? নাকি মুক্তি নিয়েছে একটা অসফল বিবাহিত জীবন থেকে?

গরিফাকে বলা হত ছোট বিলেত। কারণ এই গরিফার বহু গুনী বিলেতে পড়াশুনা করে, চাকরি করে। যেমন দেবীর স্বামী, সেও গরিফার সন্তান। রাতুলের পাশের পাড়ার বাসিন্দা। কিন্তু রাতুলের ভাগ্যে হয়ত বিলেত নেই।তার জীবনের গণ্ডিটা বেশ ছোট। সেই গণ্ডিতে বেঁচে আছে শুধু ভাল থাকার রদস। যে জীবনটা ফড়িঙএর , দোয়েলের, সেই জীবনের বাসিন্দা হতে চাওয়াই এখন রাতুলের একমাত্র লক্ষ্য। রাতুলের জীবনে প্রেম এসেছে বহুবার কিন্তু দেবী রাতুলকে চিনিয়েছিল ভাল থাকতে। একটা অসম্পূর্ণ প্রেম, রাতুলকে টেনে তুলে এনেছিল গরিফার চৌহদ্দি থেকে বাইরে। শোনা যায়, চাঁদসদাগরের পুত্র শ্রীমন্ত সদাগর সপ্তডিঙ্গা নিয়ে বানিজ্য করতে যাওয়ার পথে একবার প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে আশ্রয় নেয় এই গৌরিভা ঘাটে। যে গৌড়িভা ঘাট কালক্রমে হয়ে ওঠে গরিফা। জনশ্রুতি অনুসারে, শ্রীমন্ত এই ঘাটে আশ্রয় নেয়। তিনি অন্নপূর্ণার ভক্ত ছিলেন। তাই সেই গভীর জঙ্গলে দিক হারিয়ে তিনি মা অন্নপূর্ণাকে স্মরণ করেন। মা অন্নপূর্ণা তাঁর ডাকে সারা দেন। এই গভীর জঙ্গলে তিনি রূপময়ী হয়ে আসেন এবং অন্ন রান্না করেন। তাঁর আশীর্বাদে ঝড় থেমে যায়, ডিঙ্গা আবার ঠিক হয়ে যায়। ইতিহাসের মানচিত্রে এই স্থানের উল্লেখ সেইভাবে পাওয়া যায় না। কিন্তু এই স্থান ইতিহাস, মহাকাব্য, কত কত জীবনকে মিলিয়ে দেয়। দেবী জানতেও না, এই স্থানের সামান্য দূরে সে বড় হয়ে উঠেছে, হয়ত সেই স্থানের উপর দিয়ে হেঁটে সে চলে গিয়েছে ভাগীরথীর পারে। উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে একটা উদাস জীবন। রাতুল সকাল হলেই গিয়ে দাঁড়ায় সেই পুরনো ছাদে। দূর থেকে দেখা যায় জুটমিলের উঁচু চিমনি। ওই দূরে নীল আকাশ,পেঁজা তুলোর মেঘ। পাশে একটা বড় মাইক। সেই মাইকে বাজছে পুরনো বাংলা গান। ঘোষ পাড়ার পুজোর গান। একটা ছোট্ট প্যান্ডেল। ছিমছাম পুজো। যে পুজোয় এককালে সাদা পাঞ্জাবি পরে অঞ্জলি দিত রাতুল। সেইসব দিন এখন হারিয়ে গিয়েছে। আবার এক শীত আসছ। কোনও এক শীতের শেষেই তো দেবী এসেছিল। ঝরা পাতার দিন তো আসছে আবার। দেবী কি ফিরবে আবার তার চেনা মাটিতে? যে মাটিতে রয়েছে ইতিহাসের বীজ।

( পরবর্তী পর্ব আগামী রবিবার)
ট্যাগসূচী:#সাহিত্য#গল্প
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev