বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

দেবীর দেশ

তোমাকে বারবার মনে হয়েছে এক নিদারুণ অভিযাত্রী। যে হেঁটে গিয়েছে হিসেব কষে, রোদ মেখে।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৫ মিনিট পাঠ

দেবীর দেশ
|দেবীর দেশ

মাথার উপরে অজস্র মরুজ্যোতি, রামধেনু রাঙা পেঁজা তুলোর মতো আলো। বরফের আচ্ছাদনের উপরে দাঁড়িয়ে তুমি চেয়ে আছো আকাশের দিকে। রাতের আকাশে ছিঁড়ে এসেছে এক টুকরো নৈহাটি। রাতের মায়াময় আকাশে ভেসে উঠেছে তোমার মেয়েবেলা। টোল পড়া গালে ফিনকি দিয়ে উঠেছে সুখ। চোখের কোণে নিদারুণ বাধ্যতা। তোমার চিরকাল দুটো আকাশ ছিল। একটা ফিনল্যান্ডের এবং অন্যটা নৈহাটির। যখন তোমার এক আকাশে সূর্য ওঠে তখন অন্য আকাশে চাঁদ থাকে। যখন এক আকাশ জুড়ে অরোরা বোরিয়ালিস, তখন অন্য আকাশ জুড়ে কালপুরুষ। তোমার জীবনের মানচিত্র বুঝতে পেরেছিল সান্তার দেশ। তোমার শীতপোশাকে ঢাকা দেহের উষ্ণতা পেয়েছিল লাপাল্যান্ড। হাইড্রেনজিয়ার গন্ধ পেয়েছিল নৈহাটি। ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে উঠেছিল একটা নগরী। যে নগরী তোমার শিকড়কে চিনিয়েছিল। তোমার একটা জানলা আছে, যে জানলার ওপারে সবুজ আর সবুজ। যে সবুজের বুক চিরে তুমি হাঁটতে যেতে রোজ। টেবিলের এক কোণায় রাখা থাকত ফেলুদা, ব্যোমকেশ, রোজাবেল লাইন, দেবদত্ত পট্টনায়েক। তার পাশে একটা ডায়েরী। সেই ডায়েরীর পাশে দুটো ফটোফ্রেম। একটা ফটোফ্রেমে তোমার সাদা ধবধবে পোষ্যের ছবি এবং অন্যপাশে ভালবাসার মানুষের। তোমার সাজানো জীবনের প্রতিটি বাঁকে হলুদ টুনি জ্বলে। হাওয়ার তালে দুলে দুলে তোমার জীবন চলে। শান্ত, স্নিগ্ধ, ঝুটঝমেলাহীন একটা পৃথিবী আছে তোমার। যে পৃথিবীর অর্ধেকাংশ জুড়ে একটা ছিন্ন নৈহাটির প্রতিচ্ছবি এবং বাকিটা জুড়ে ফিনল্যান্ডের ফিনিক্স পাখি।

তোমাকে বারবার মনে হয়েছে এক নিদারুণ অভিযাত্রী। যে হেঁটে গিয়েছে হিসেব কষে, রোদ মেখে। জীবনের খুচরো প্রেমকে তুমি কোনওদিনই পাত্তা দাওনি। তবুও সেই সব প্রেমেরা তোমার কাঁধেই হাত রেখে হেঁটে গিয়েছে বহুদূর। জয় গোঁসাইয়ের 'পাগলী তোমার সঙ্গে' পড়ে বলেছে, তুমিই তো সেই পাগলী, যার সঙ্গে নিত্যদিন ঠোকাঠুকি লাগে আবার মধ্যরাতে জুড়ে যায় দুটি খাট। প্রেমের মতো পবিত্র পুজোর ফুল ছড়িয়ে দিয়ে অবিরাম, হেঁটে গিয়েছো আলোর পথে। জড়িয়ে নিয়েছ রামধনু মাখা জীবন। তোমাকে খুব হিংসে হতো। এখনও হয়। হয়ত সারাজীবনই এই হিংসেটা বেঁচে থাকবে। হয়ত সারাজীবন তোমাকে না পাওয়ার ব্যর্থটা বেঁচে থাকবে। বুদ্ধদেব গুহ ঘনিষ্ঠ মহলে বারবার বলেছেন, ব্যর্থ প্রেমেই তো প্রেমটা বেঁচে থাকে। সেই প্রেম পরিণতি পেলে ভালবাসা মরে যায়। সত্যি কি তাই? তোমার সঙ্গে একটা স্মৃতির সহবাসে দিন কেটে যায়। তুমি টেরও পাও না। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুটে যাওয়া গাড়ির গতি হু হু করে উড়িয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির অতলে, ছিটকে আসে দু'ফালি রোদ আর প্রিয় গান। গলার কাছে পাকিয়ে ওঠে না বলা কথা।ফিরে আসে প্রথম স্পর্শ। ফিরে আসে চুম্বন। তোমাকে অসম্ভব ভাবে ভালবেসে যায় আজও রাতুল। তুমি জানতে পারো না। রাতুলের ভিতরে একটা পৃথিবী বেঁচে থাকে। যে পৃথিবীর সবটা জুড়ে তুমি। সেই তোমাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেও, দিনের শেষে তোমার কাছেই ফিরে আসতে হয়।

তোমাকে ভুলে এগিয়ে যায়নি সে, ম্যারম্যারে জীবনের চৌহদ্দিতে তুমি রয়ে গিয়েছো। বারবার ফিরে গিয়েছে তোমার বাড়ির পথে। থমকে গিয়েছে তোমার বারান্দায়। ধু ধু শূন্যতা ছাড়া সেখানে কিছুই নেই আর। যে মিত্রপাড়ার বুক জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নৈহাটির ইতিহাস, সেই মিত্র পাড়ার বারবার তোমাকে খুঁজতে গিয়েছে রাতুল। একটা মেয়ে তাকে যে এইভাবে বদলে দেবে, সে কখনও ভাবেনি। তখন বসন্তের মাতাল সমীরণে সে শুধু তাঁত বুনে গিয়েছে।একই ভাবে, একই সময় সে ছুটে গিয়েছে সেই সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফেতে। কখনও দেখা পেয়েছে। কখনও দেখা পায়নি। যখন পায়নি তখন শুধু মনে মনে নতজানু হয়েছে তোমাকে ভেবে। তোমার টোল পড়া গালে ফুটে উঠেছে জনহীন একটা জনপদ। যে জনপদে একসময় গড়ে উঠেছিল প্রথম উদ্বাস্তু কলোনী। নৈহাটির বিজয়নগর সারা বাংলার প্রথম উদ্বাস্তু কলোনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কখনও সেই ইতিহাস তোমাকে ছুঁয়ে যায়নি। তুমি বারবার নিজের এক দেশ গড়ে তুলেছো। তোমার হলুদ বারান্দায় উদাসী হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছ সেই দেশকে, যে দেশকে রাতুল নাম দিয়েছে দেবীর দেশ।

ফিনল্যান্ডে অরোরা বোরিয়ালিস
ফিনল্যান্ডে অরোরা বোরিয়ালিস

প্রতিটি বসন্তের সন্ধে ধীরে ধীরে ওই ক্যাফে হয়ে উঠল রাতুলের আস্তানা। মেয়েটি এসে বসত নীরবে। তারপর আইফোনে এক নাগাড়ে অনেক্ষণ। মোবাইলের আলো ছিটকে আসত শ্যামলা মুখে। সেই আলো এসে পড়ত হীরে বসানো প্ল্যাটিনামের আংটিতে।মনে হত, একফালি রোদ এসে পড়েছে লাল কৃষ্ণচূড়ার উপর। রাতুল তাকিয়ে থাকত ঘাড় উঁচু করা পাখির মতো। কী ছিল তোমার মধ্যে, সেই প্রশ্ন আজও রাতুলকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে সে এখন শখের প্রত্নতাত্ত্বিক হয়ে উঠেছে। তবুও তোমার মনের খোঁজ সে এখনও পায়নি। তবুও তার হেঁটে চলা এই নৈহাটির পথ বেয়ে। যে পথ বেয়ে একদিন সে খুঁজতে গিয়েছিল তোমাকে। একটু একটু করে প্রায়ই ওই মেয়েটির জন্য রাতুল অধীর আগ্রহে বসে থাকত। একটিবার দেখার জন্য, সে চেয়ে থাকত উদাস হয়ে। মিত্র পাড়ার সেই গলিতে উঁচু উঁচু শৌখিন বাড়ির সারি। নিঝুম বাড়িগুলো থেকে শুধুমাত্র শঙ্খের আওয়াজ আসে। রাতুল সেই আওয়াজের ওম নিয়ে চুপচাপ চেয়ে ছিল অনন্ত মহাশূন্যের দিকে। প্রেমের কোনও জাত হয় না। প্রেমের কোনও বয়স হয় না। প্রেম তো পলকের। প্রেম তো ভাললাগার। প্রেমের জন্ম তো পরিনতির জন্য নয়, প্রেম পরীক্ষার ফলাফল নয়। আমরা এক জীবনে কেউ কারোর হতে পারি না। বিয়ের আগেও নয়, বিয়ের পরেও নয়। প্রেমেও নয়, অপ্রেমও না। রাতুল জানত এই জীবনে সে শুধু হেঁটে যাবে। গরিফার অলিগলি বেয়ে, মিলের ধোঁয়া ওঠা ক্লান্ত বিকেলে গা এলিয়ে সে ঠিক খুঁজে পাবে নিজের জীবনের মানে। প্রথম পর্ব

একদিন রাতুল ক্যাফেতে বসে। সঙ্গে কিছু রাজনীতির যুব নেতা। হঠাৎ এগিয়ে এলেন সেই সুন্দরী মহিলা। কয়েকটা দামী কেকের টুকরো দিয়ে গেলেন। রাতুল জিজ্ঞাসা করে উঠল কারণ। তিনি হেসে বললেন, ' আজ একজনের জন্মদিন ছিল, সে দিয়ে গিয়েছে।' 'কে?' রাতুল প্রশ্ন করল। মহিলা হেসে বললেন, ' তুমি যাকে অবাক হয়ে দেখো, আজ তার জন্মদিন ছিল। ' রাতুলের ভিতরে একে একে পাথরগুলো সরে যেতে লাগল। হাওয়া বয়ে এলো অবিরাম। রাতুল থমকে গেল। সেই মেয়েটা, আজ তার জন্মদিন? আজ তো ২৫শে ফেব্রুয়ারি। আজ তো মাতাল বসন্ত। রাতুল মহিলার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বলল, ' কী নাম মেয়েটার?' মহিলা মেয়েটির নাম বলল। রাতুল সে নাম শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। মোবাইলের আলো জ্বলা সেই মুখটা ভেসে উঠল। ভেসে উঠল টোল পড়া গাল। মুখের সামনে এলিয়ে পড়া চুল। সোনার চেন, সোনার দুল। সেই মেয়েটার নাম এখন জানে রাতুল।এবার তার দেশে পাড়ি দেওয়ার পালা, এবার তার দেবীর দেশ দেখার পালা। দেবীর দেশ, নৈহাটির ইতিহাস খুঁড়ে বয়ে চলা এ এক দেশ, দেবীর দেশ।
( পরবর্তী পর্ব আগামি রবিবার)

ট্যাগসূচী:#Naihati#Love#History#Letters
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev