মাথার উপরে অজস্র মরুজ্যোতি, রামধেনু রাঙা পেঁজা তুলোর মতো আলো। বরফের আচ্ছাদনের উপরে দাঁড়িয়ে তুমি চেয়ে আছো আকাশের দিকে। রাতের আকাশে ছিঁড়ে এসেছে এক টুকরো নৈহাটি। রাতের মায়াময় আকাশে ভেসে উঠেছে তোমার মেয়েবেলা। টোল পড়া গালে ফিনকি দিয়ে উঠেছে সুখ। চোখের কোণে নিদারুণ বাধ্যতা। তোমার চিরকাল দুটো আকাশ ছিল। একটা ফিনল্যান্ডের এবং অন্যটা নৈহাটির। যখন তোমার এক আকাশে সূর্য ওঠে তখন অন্য আকাশে চাঁদ থাকে। যখন এক আকাশ জুড়ে অরোরা বোরিয়ালিস, তখন অন্য আকাশ জুড়ে কালপুরুষ। তোমার জীবনের মানচিত্র বুঝতে পেরেছিল সান্তার দেশ। তোমার শীতপোশাকে ঢাকা দেহের উষ্ণতা পেয়েছিল লাপাল্যান্ড। হাইড্রেনজিয়ার গন্ধ পেয়েছিল নৈহাটি। ভাগীরথীর পূর্বে গড়ে উঠেছিল একটা নগরী। যে নগরী তোমার শিকড়কে চিনিয়েছিল। তোমার একটা জানলা আছে, যে জানলার ওপারে সবুজ আর সবুজ। যে সবুজের বুক চিরে তুমি হাঁটতে যেতে রোজ। টেবিলের এক কোণায় রাখা থাকত ফেলুদা, ব্যোমকেশ, রোজাবেল লাইন, দেবদত্ত পট্টনায়েক। তার পাশে একটা ডায়েরী। সেই ডায়েরীর পাশে দুটো ফটোফ্রেম। একটা ফটোফ্রেমে তোমার সাদা ধবধবে পোষ্যের ছবি এবং অন্যপাশে ভালবাসার মানুষের। তোমার সাজানো জীবনের প্রতিটি বাঁকে হলুদ টুনি জ্বলে। হাওয়ার তালে দুলে দুলে তোমার জীবন চলে। শান্ত, স্নিগ্ধ, ঝুটঝমেলাহীন একটা পৃথিবী আছে তোমার। যে পৃথিবীর অর্ধেকাংশ জুড়ে একটা ছিন্ন নৈহাটির প্রতিচ্ছবি এবং বাকিটা জুড়ে ফিনল্যান্ডের ফিনিক্স পাখি।
তোমাকে বারবার মনে হয়েছে এক নিদারুণ অভিযাত্রী। যে হেঁটে গিয়েছে হিসেব কষে, রোদ মেখে। জীবনের খুচরো প্রেমকে তুমি কোনওদিনই পাত্তা দাওনি। তবুও সেই সব প্রেমেরা তোমার কাঁধেই হাত রেখে হেঁটে গিয়েছে বহুদূর। জয় গোঁসাইয়ের 'পাগলী তোমার সঙ্গে' পড়ে বলেছে, তুমিই তো সেই পাগলী, যার সঙ্গে নিত্যদিন ঠোকাঠুকি লাগে আবার মধ্যরাতে জুড়ে যায় দুটি খাট। প্রেমের মতো পবিত্র পুজোর ফুল ছড়িয়ে দিয়ে অবিরাম, হেঁটে গিয়েছো আলোর পথে। জড়িয়ে নিয়েছ রামধনু মাখা জীবন। তোমাকে খুব হিংসে হতো। এখনও হয়। হয়ত সারাজীবনই এই হিংসেটা বেঁচে থাকবে। হয়ত সারাজীবন তোমাকে না পাওয়ার ব্যর্থটা বেঁচে থাকবে। বুদ্ধদেব গুহ ঘনিষ্ঠ মহলে বারবার বলেছেন, ব্যর্থ প্রেমেই তো প্রেমটা বেঁচে থাকে। সেই প্রেম পরিণতি পেলে ভালবাসা মরে যায়। সত্যি কি তাই? তোমার সঙ্গে একটা স্মৃতির সহবাসে দিন কেটে যায়। তুমি টেরও পাও না। এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ছুটে যাওয়া গাড়ির গতি হু হু করে উড়িয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির অতলে, ছিটকে আসে দু'ফালি রোদ আর প্রিয় গান। গলার কাছে পাকিয়ে ওঠে না বলা কথা।ফিরে আসে প্রথম স্পর্শ। ফিরে আসে চুম্বন। তোমাকে অসম্ভব ভাবে ভালবেসে যায় আজও রাতুল। তুমি জানতে পারো না। রাতুলের ভিতরে একটা পৃথিবী বেঁচে থাকে। যে পৃথিবীর সবটা জুড়ে তুমি। সেই তোমাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেও, দিনের শেষে তোমার কাছেই ফিরে আসতে হয়।
তোমাকে ভুলে এগিয়ে যায়নি সে, ম্যারম্যারে জীবনের চৌহদ্দিতে তুমি রয়ে গিয়েছো। বারবার ফিরে গিয়েছে তোমার বাড়ির পথে। থমকে গিয়েছে তোমার বারান্দায়। ধু ধু শূন্যতা ছাড়া সেখানে কিছুই নেই আর। যে মিত্রপাড়ার বুক জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নৈহাটির ইতিহাস, সেই মিত্র পাড়ার বারবার তোমাকে খুঁজতে গিয়েছে রাতুল। একটা মেয়ে তাকে যে এইভাবে বদলে দেবে, সে কখনও ভাবেনি। তখন বসন্তের মাতাল সমীরণে সে শুধু তাঁত বুনে গিয়েছে।একই ভাবে, একই সময় সে ছুটে গিয়েছে সেই সবুজ আলো জ্বলা ক্যাফেতে। কখনও দেখা পেয়েছে। কখনও দেখা পায়নি। যখন পায়নি তখন শুধু মনে মনে নতজানু হয়েছে তোমাকে ভেবে। তোমার টোল পড়া গালে ফুটে উঠেছে জনহীন একটা জনপদ। যে জনপদে একসময় গড়ে উঠেছিল প্রথম উদ্বাস্তু কলোনী। নৈহাটির বিজয়নগর সারা বাংলার প্রথম উদ্বাস্তু কলোনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কখনও সেই ইতিহাস তোমাকে ছুঁয়ে যায়নি। তুমি বারবার নিজের এক দেশ গড়ে তুলেছো। তোমার হলুদ বারান্দায় উদাসী হয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছ সেই দেশকে, যে দেশকে রাতুল নাম দিয়েছে দেবীর দেশ।

