বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
আদিত্য
আদিত্য
সকল গল্প ও রচনায় ফিরে যান
হিজিবিজি

দেবীর দেশ - পর্ব ৫

দেবীর দেশে অনেক গণ্ডি। সেই গণ্ডির অনেক স্তর। সেই স্তরের অনেক মায়াজাল। যে জাল ভেদ করতে উদ্যত হয়ে উঠেছিল রাতুল। একটা প্রেম, হয়ত আসবে যাবে। অথবা থেকে যাবে। কিন্তু দেবী রাতুলের কাছে এক অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।

আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

১১ অক্টোবর, ২০২৬ • ৫ মিনিট পাঠ

দেবীর দেশ - পর্ব ৫
|দেবীর দেশ

আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ। শরতের মাতাল হাওয়া বয়ে আসছে পশ্চিম দিক থেকে। গরিফা জুটমিলের উঁচু চিমনির উপর থেকে দেখা যাচ্ছে হু হু করে ভেসে ওঠা নীল দিগন্ত। সবুজ পাতার উপর সোনাঝরা আলো খেলা করছে অবিরাম। রাতুলের বয়স বেড়ে গিয়েছে। পুরু চর্বির স্তর গজিয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশে। মুখে দেখা দিতে শুরু করেছে বিভিন্ন রেখা। সময়ের ভাঁজে আমরা এগিয়ে গিয়েছি আরও কয়েকটা কক্ষরেখার পথ ঘুরে। রাতুল আর দেবীর দেখা হওয়া সেই ক্যাফের এখন ভোল বদলে গিয়েছে। এসি বসেছে। কাঁচের দরজা হয়েছে। সবুজ আলো আরও সবুজ হয়েছে। মিত্র পাড়ার গলি দিয়ে এখনও হেঁটে আসে রাতুল। মুখ ঘুরিয়ে দেখে সেই ক্যাফে এখন আরও মখমল করছে। ফড়িং ঘুরছে তার পাশে। রাতুলের মনের ভিতরে বারবার ভেসে ওঠে সেই মেয়ের হাসিমুখটা। টোল পড়া গালে লেগে আছে শেষ বসন্তের শামিয়ানা। রোগা, চোখের নীচে কালি পড়া অবিন্যস্ত মেয়েটার কাঁধে ছিল এক টুকরো ফিনল্যান্ড। যে ফিনল্যান্ডের বরফ মেখে রাতুল স্নান করেছিল গরিফার স্যাঁতসেঁতে বাথরুমে। যে বাথরুমের মাটি ফুঁড়ে বারবার বেরিয়ে আসে জোঁক, কেন্নো, আরশোলা। যে মাটিতে একসময় হেঁটে গিয়েছিলেন কবি বিজয়কৃষ্ণ ঘোষ। যে বিজয়কৃষ্ণ ঘোষের নামাঙ্কিত গরিফা ঘোষপাড়া চিলড্রেন পার্ক এখন শুধু মাত্র দুটো রাস্তা ভাগের নীরব সাক্ষী।

প্রথম পর্ব

নৈহাটি ষ্টেশন থেকে গরিফার দিকে যেতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া গৌরিপুর জুটমিলকে বাঁদিকে রেখে এগিয়ে গেলেই রাস্তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে একটুকরো পার্ক। আগে একটা স্লাইড ছিল। দুটো বসার ছিল। এখন সেখানে দুর্গা মণ্ডপ হয়েছে। নীল সাদা রঙ হয়েছে তবুও বাইরে সাদা ফলকে লেখা বিজয় কৃষ্ণ ঘোষের নামে ধুলো জমেছে। যে ধুলোর পিছুপিছু তুমি ছুটে গিয়েছ এক দূর আজানায়। এঁকে নিয়েছ সীমাহীন এক কক্ষপথ। তোমার কক্ষপথে কোনওদিন কি স্থান পেয়েছে বিজয় কৃষ্ণ ঘোষের মতো নৈহাটির কবিরা? তুমি উইলিইয়াম ওয়ার্ডসওয়ারথ পড়ে বড় হয়েছে। শেলী, কিটস বুকের মাঝে আগলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছ।

দ্বিতীয় পর্ব

দেবীর দেশে অনেক গণ্ডি। সেই গণ্ডির অনেক স্তর। সেই স্তরের অনেক মায়াজাল। যে জাল ভেদ করতে উদ্যত হয়ে উঠেছিল রাতুল। একটা প্রেম, হয়ত আসবে যাবে। অথবা থেকে যাবে। কিন্তু দেবী রাতুলের কাছে এক অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। যে অভ্যেস পাল্টে দিয়েছিল রাতুলের দেশকে। যে অভ্যেসের ভেলায় চেপে রাতুল খুঁজতে গিয়েছিল দেবীর অতীতকে। সেই অতীতই একদিন খুলে দিল নৈহাটির ইতিহাস। সেদিন সন্ধে। তখন বসন্ত বিদায় নেমে শহর থেকে। কান্ত শহরের বুক ছিঁড়ে রাতুল এগিয়ে গিয়েছে। বন্ধুর বাইকের পিছনে বসে দেবীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফিরে পেয়েছে তার ক্লান্ত শৈশব। দেবী সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখত। নিজের সম্পর্কে যতটা কম বলা যায় ততটা কম বলত। নিজের গণ্ডি খুব ছোট করে রেখেছিল সে। দেবী জীবনে স্লো ট্র্যাভেলের গুরুত্বটা বুঝেছিল। বুঝেছিল ধীরে চল। উপভোগ করে নাও জীবনের সমস্ত স্বাদ। জীবনের সবটুকু খুব চুপচাপ আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল দেবী। রাতুল ছিল একেবারে উল্টো। তবুও সে দেবীর দেখানো পথে হাঁটতে চাইল। একদিন বন্ধুর বাইকের পিছনে বসে দেবীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ সে জানতে চাইল তার বাড়ির হদিশ। যদিও ততদিনে তাদের বেশ কয়েকবার দেখা হয়ে গিয়েছে। মেসেজে কথা এগিয়েছে বহুদূর তবুও দেবীর বাড়ির হদিশ তাকে দেয়নি। সেইদিন বাইকের পিছনে বসে সে উদ্যত হয়ে উঠেছিল দেবীর বাড়ির জন্য। দেবীও মুখ ফসকে বলে বসল ওই মেডিকুয়েস্ট প্যাথলজির পাশ দিয়ে যেতে হয়। ওখানে নৈহাটির নাম করা এক কালী পুজোর আসর বসে। লোকে বলে দেবু ঘোষের পুজো। রাতুল সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুকে ইশারায় ওই রাস্তায় ঢুকতে বলল। দেবী তখনও টের পায়নি যে একটা ছেলে তার মনের দরজার এসে আঘাত করবে। যে আঘাতের অভিঘাত ছুঁয়ে যাবে একটা ম্যাড়ম্যাড়ে জীবন।

তৃতীয় পর্ব

তখনও কানে ফোন। ফোনের ওপারে দেবী। দেবু ঘোষের কালী পুজোর মাঠ ছাড়িয়ে বাইক বাঁক নিল মিত্রপাড়ার দিকে। তখনও দেবীকে রাতুল ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছে, তার বাড়ির হদিশ। তবুও দেবী চুপ। হঠাৎ তরুণ সংঘে ক্লাবের বিপরীতে রাতুল দেখতে পেল একটা ভালবাসার বারান্দা। লাইটপোস্টের আলো এসেছে সেই বারান্দায়। হলুদ গ্রিল দিয়ে ঘেরা সেই বারান্দায় একটা মেয়ে মাথা নিচু করে কথা বলছে ফোনে। রাতুলের চিনতে বেশি দেরি হয়নি। সাদা রঙের দোতলা বাড়িটার সামনে বাংলা অক্ষরে বড় বড় করে বাড়িটার নাম। বাড়ির চাতালে দুটো দামী গাড়ি। ভর্তি ফুলগাছ। চতুর্দিকে শৌখিনতার ছোঁয়া। রাতুল থমকে দাঁড়িয়েছে। থমকে দাঁড়িয়েছে সময়। সেই প্রথমবারের মতো রাতুল চিনেছিল দেবীর দেশকে। তারপর বহুবার সেই বাড়ির সামনে দিয়ে সে ঘুরে গিয়েছে। কখনও দেবীর দেখা পেয়েছে আবার কখনও পায়নি। তবুও সে বৃত্তাকারে সেই বাড়ির পথ ধরে খুঁজে পেয়েছে জীবনের অন্য এক পথ। চতুর্থ পর্ব যেখানে রাতুল নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। গাইতে শিখেছে জীবনের গান। জীবনকে আরও সহজ করবে সে।ছোটছোট খুশিগুলোকে নিজের বুকে জড়িয়ে বাঁচতে শিখবে রাতুল। ঝুটঝামেলা থেকে অনেক দূরে চলে যাবে সে। দেবীর প্রেম রাতুলকে এনে ফেলেছিল এক অন্য মহাদেশে। দেবী চলে যাবে। তবুও সেই প্রেমটা থেকে যাবে। যে প্রেমটা রাতুলের শিরায় উপশিরায় বেঁচে থাকবে এক ফুর্তি নিয়ে। এটাই তো প্রেমের সবচেয়ে বড় সুবিধা। প্রেম ছেড়ে গেলেও অন্য একজনের অভ্যাস, দেখানো পথে চলতে থাকা আজীবন। রাতুল নৈহাটির পথ বেয়ে ঠিক এইভাবেই এসে পড়বে নৈহাটির বিলেত গরিফায়।
(পরবর্তী পর্ব আগামি রবিবার)

ট্যাগসূচী:#Naihati#Love#History
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:
আদিত্য ঘোষ

আদিত্য ঘোষ

লিখতে চাওয়ার অঙ্গীকার

পাঠকের মন্তব্য (0)

মন্তব্য করার জন্য আপনার সোশাল অ্যাকাউন্ট বা অতিথি মাধ্যম বেছে নিন:

Anay Biswas
Architected & Engineered byAnay BiswasFull-Stack Dev